মঙ্গলবার, মে ১৭, ২০২২

যুদ্ধের শুরুতেই কুষ্টিয়ার সিপাহি-জনতার লড়াইয়ে আসে গৌরবের জয়

দীর্ঘদিন শোষণ-নিপীড়নের পর বাঙালিকে স্তব্ধ করে দিতে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’র নামে হত্যাযজ্ঞ চালায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী।

তারপর গোটা দেশকে করায়ত্ব করে রাখার চেষ্টা চালায় পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠী। কিন্তু তাদের এসব অপচেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়েছে বাঙালি।

প্রথম থেকেই তুমুল প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়েছে হানাদার বাহিনীকে। এমনই এক প্রতিরোধের বীরত্বগাথা রচিত হয়েছিল কুষ্টিয়ায়।

যুদ্ধের পাঁচদিনের মাথায় বাঙালি সিপাহি-জনতার আক্রমণের মুখে পাকিস্তানি বাহিনীর মেজর শোয়েবসহ অনেকে প্রাণ হারায়।

কয়েকজন পালানোর চেষ্টা করলেও পরে জনতার হাতে ধরা পড়ে গণপিটুনিতে নিহত হয়।

জীবিত অবস্থায় ধরা পড়ে পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা আতাউল্লাহ শাহ ও আইয়ুবের মতো কয়েকজন।

কুষ্টিয়ার রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের এমন গৌরবদীপ্ত জয়ের তথ্য মিলেছে মুহাম্মদ লুৎফুল হকের ‘যুদ্ধগাথা ১৯৭১: ২৬টি বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধের বয়ান’ বইয়ে।

প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত বইটিতে ‘প্রথম প্রতিরোধ ও শুভ বার্তা’ এবং ‘কুষ্টিয়ায় সিপাহি-জনতার যুদ্ধ’ নামে দুটি পর্ব আছে।

‘কুষ্টিয়ায় সিপাহি-জনতার যুদ্ধ’ অংশে বলা হয়েছে, ‘২৫ মার্চ ১৯৭১। রাত দেড়টায় ২৭ বালুচ রেজিমেন্টের একটি কোম্পানি কুষ্টিয়ায় পৌঁছে।

সব মিলিয়ে হানাদার বাহিনীর সৈন্য ছিল ২০০-এর মতো। কিন্তু সমরাস্ত্রের সংখ্যা বিপুল। কোম্পানিটিকে নেতৃত্ব দিচ্ছে মেজর শোয়েব।

তার সঙ্গে আরও তিন অফিসার। শহরে ঢুকেই মেজর শোয়েব ট্যাংকবিধ্বংসী অস্ত্র আর ভারী মেশিনগানসহ পুলিশ লাইন ও ওয়্যারলেস স্টেশনে পাহারা বসায়।

আরেকটি প্লাটুনসহ সে অবস্থান নেয় জিলা স্কুলসংলগ্ন সার্কিট হাউসে। মেজর শোয়েব সান্ধ্য আইন জারি করে। কুষ্টিয়ায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়লো।’

‘পরদিন ২৬ মার্চ চুয়াডাঙ্গা শহরে অনুষ্ঠিত হলো একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক। বৈঠক ডেকেছেন চুয়াডাঙ্গা ইপিআরের চতুর্থ উইংয়ের কমান্ডার মেজর এম এ ওসমান চৌধুরী।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ক্যাপ্টেন আজম চৌধুরী, ডা. আসহাবুল হক, এসডিও তৌফিক-ই-ইলাহী, এসডিপিও মাহবুব উদ্দিন আহমেদ।

মেজর ওসমান বললেন- এ অন্যায় আমরা মেনে নেবো না। শপথ নিলাম, আমরা এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবো, যুদ্ধ করবো।’

বইয়ে উল্লেখ আছে, ‘মেজর ওসমানের টার্গেট কুষ্টিয়া দখল করা। তার বাহিনীতে সেনাসংখ্যা প্রায় ৬০০। অস্ত্রবহরে আছে ট্যাংকবিধ্বংসী অস্ত্র, মেশিনগান, এলএমজি, তিন ইঞ্চি মর্টার ও চায়নিজ রাইফেল।

মেজর ওসমান নিয়মিত সৈন্যের পাশাপাশি আমজনতাকেও সঙ্গে নিলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন পাকিস্তানি বাহিনীকে আক্রমণ করা হবে তিন দিক থেকে।

ইপিআর বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়বে সরাসরি। আর জনতা পেছন থেকে রক্ত হিম করা গলায় রণহুংকার দেবে। ফলে ওদের মনোবল ভেঙে যাবে।’

‘ঠিক হলো, প্রথম দলটি আসবে প্রাগপুর থেকে। তাদের দায়িত্ব কুষ্টিয়ার উপকণ্ঠে ঘাপটি মেরে থাকা। তারপর সুযোগমতো পুলিশ লাইন ঘাঁটিতে আক্রমণ করা।

ধোপাখালী থেকে আরেকটি দল যাবে। তাদের দায়িত্ব ওয়্যারলেস স্টেশনে থাকা পাকিস্তানি সৈন্যদের আক্রমণ করা। তৃতীয় দলটি আসবে বৈদ্যনাথতলা (অধুনা মুজিবনগর) থেকে।

তাদের টার্গেট জিলা স্কুলের ঘাঁটি। শত্রুপক্ষের ছোটখাটো দলের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে একটি কোম্পানিকে দায়িত্ব দেওয়া হলো।

কুষ্টিয়ার রণক্ষেত্রের তৎকালীন একটি নকশা/সংগৃহীত গ্রাফ

যশোর সেনানিবাস খুব বেশি দূরে নয়। তাই সেই পথে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য অন্য একটি দলকেও প্রস্তুত করা হলো।’

আক্রমণকারী প্রতিটি ইপিআর কোম্পানির পেছনে থাকবে জনতার ঢল। বাঁশের লাঠি হাতে প্রত্যেক দলে পাঁচ হাজার মানুষ। চিকিৎসা, সিগন্যাল যোগাযোগ ও খাবারের দিকটাও ভাবা হলো।

এজন্য ঠিকঠাক মতো দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হলো। তবে গোড়াতেই গলদ ছিল। রাত ৪টার মধ্যে মিশন শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনার জন্য একটি দল পৌঁছাতে দেরি করে ফেলেছে।

অভিযান পরিচালনার সময় পেছানো হলো ২৪ ঘণ্টার জন্য। এত লোককে শান্ত রাখা কঠিন কাজ। যুদ্ধের সার্বিক নির্দেশনার দায়িত্ব ছিল আজম চৌধুরীর ওপর।’

মূল লড়াইয়ের দিনের বর্ণনায় বইটিতে লেখা হয়েছে, ‘৩০ মার্চ রাত ৪টায় অ্যাকশন শুরু হলো। মুক্তিবাহিনী তিন দিক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়লো। পুলিশ লাইন ঘাঁটিতে হামলা চলছিল মহাজনপুর হাজিবাড়ির তৃতীয় তলা থেকে।

আরেকটি কোম্পানি বাঘের মতো হামলে পড়ে জিলা স্কুলের ওপর। আরেক দলের টার্গেট ওয়্যারলেস স্টেশন। সেখানেও ভয়ানক যুদ্ধ শুরু হলো।

উভয়পক্ষের মধ্যে তখন তুমুল গোলাগুলি চলছে। দুপুর পর্যন্ত যুদ্ধ চললো। বেলা দেড়টায় পাকিস্তানি বাহিনীর ট্যাংকবিধ্বংসী ১০৬ মিমি আরআর হাজিবাড়িকে টার্গেট করে।

হাজিবাড়ি উড়িয়ে দেবে তারা। সুবেদার মতিন তখন একটা প্রায় জাদুকরি কাজ করে বসলেন। একইসঙ্গে একটি আরআর, তিনটি এলএমজি এবং দুই ইঞ্চি মর্টারের গোলা ছুড়ে তিনি শত্রুবাহিনীর আক্রমণকে পুরোপুরি ছিন্নভিন্ন করে ফেললেন।’

‘৩০ মার্চ বিকেল নাগাদ শত্রুর দুটি ঘাঁটির পতন হলো। পুলিশ লাইন ও ওয়্যারলেস স্টেশন ঘাঁটি কলাপস করে। এ দুই ঘাঁটির শত্রুসেনাদের বেশির ভাগই প্রাণ হারায়। অন্য দুই ঘাঁটির জীবিত সৈন্যরা জিলা স্কুলে সমবেত হওয়ার চেষ্টা করে। মহাসংকটে পাকিস্তানি বাহিনী।

অতিরিক্ত জনবল ছাড়া এ যুদ্ধে তাদের জয়ের কোনো আশা নেই। এ অবস্থায় যশোর সেনানিবাসের কাছে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে সাহায্য কামনা করে তারা। কিন্তু যশোর থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হলো— সাহায্য করা অসম্ভব। তাদের বার্তাটি মুক্তিবাহিনীর ওয়্যারলেসে ধরা পড়লো।

সেখানে বলা হয়েছে, ‘রিইনফোর্সমেন্ট নট পসিবল। ট্রাই টু লিভ অন ইয়োর ওয়ে।’

উপর্যুপরি আক্রমণের কথা উল্লেখ করে বইটিতে বলা হয়েছে, ‘৩১ মার্চ ভোর। ক্যাপ্টেন আজম চৌধুরী নতুন উদ্যমে জিলা স্কুল আক্রমণ করে বসলেন। আক্রমণের মুখে পাকিস্তানি সৈন্যরা ভারী অস্ত্র দিয়ে জবাব দিতে থাকে।

সারাদিন ধরে যুদ্ধ চলে। একের পর এক পাকিস্তানি সৈন্যদের লাশ পড়তে থাকে। সন্ধ্যা নাগাদ পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের ঝাঁজ অনেক কমে আসে।

অন্ধকার একটু গাঢ় হতেই জিপ আর পিকআপে চেপে পাকিস্তানি অফিসাররা পালাতে শুরু করলো। সব মিলিয়ে জনা পঞ্চাশেক পাকিস্তানি সৈন্য ও অফিসার।’

‘বীর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল তাদের পিছু নিলো। আজম চৌধুরী বিষয়টি আগেই ভেবে রেখেছিলেন। তাই ঝিনাইদহের কাছে গাড়াগঞ্জ ব্রিজে মুক্তিবাহিনীর একটি দলকে দিয়ে অ্যামবুশের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

ব্রিজটিকে ভেঙে ফেলা হয়েছিল। ব্রিজের জায়গায় পেতে রাখা হয়েছিল আলকাতরা মাখানো বাঁশের চাটাই। দূর থেকে দেখলে যাকে পিচঢালা রাস্তা মনে হতো। ভাঙা সেই ব্রিজের ওপর গাড়ি আসতেই সবকটা গাড়ি চোখের পলকে গভীর খাদে পড়ে গেলো।

ওঁত পেতে থাকা মুক্তিবাহিনী ধীরে-সুস্থে হামলা করতে শুরু করে। মেজর শোয়েবসহ অনেক পাকিস্তানি সৈন্য ঘটনাস্থলেই নিহত হলো। কয়েকজন উঠে পালানোর চেষ্টা করেছিল।

গ্রামবাসী তাদের পিটিয়ে মেরে ফেলে। পাকিস্তানি সেনা অফিসার আতাউল্লাহ শাহ আর আইয়ুব গ্রামবাসীর হাতে ধরা পড়ে।’

আপনার জন্য নির্বাচিত খবর

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও পড়ুন

যুক্ত হউন

1,000FansLike
1,000FollowersFollow
100,000SubscribersSubscribe

সর্বশেষ খবর