রবিবার, অক্টোবর ২, ২০২২

ডায়াবেটিসের নতুন কারণ আবিষ্কার করলেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানীরা

ডায়াবেটিসের কারণ হিসেবে এক ধরনের এনজাইমের স্বল্পতার কথা বলছেন বাংলাদেশি গবেষকেরা।

তাঁরা বলছেন, ইন্টেস্টিনাইল অ্যালকালাইন ফসফাটেস (আইএপি) বিশেষ এক ধরনের এনজাইমের স্বল্পতা দেখা দিলে শরীরে বিশেষ ধরনের টক্সিনের আধিক্য হয়।

এর প্রভাবে শরীরের অভ্যন্তরে সিস্টেমেটিক প্রদাহের সৃষ্টি হয়, যা রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন ইনসুলিনের উৎপাদন ও কার্যক্ষমতা কমে যায়।

আজ বুধবার দুপুরে রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই আবিষ্কারের তথ্য তুলে ধরা হয়।

অসংক্রামক রোগের মধ্যে ডায়াবেটিস রোগের বিস্তার গোটা বিশ্বেই সবচেয়ে বেশি।

এ নিয়ে চিকিৎসক ও গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা করছেন। এখন পর্যন্ত ডায়াবেটিস রোগের নিরাময় পাওয়া যায়নি।

তবে এটি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আর নিরাময় না পাওয়ার পেছনে এ রোগের মূল কারণ শনাক্ত নিয়ে জটিলতাই মুখ্য।

সম্প্রতি বারডেম হাসপাতালের অধ্যাপক মধু এস মালো ও জাতীয় অধ্যাপক এ কে আজাদ খানের নেতৃত্বে এক দল গবেষক ডায়াবেটিস হওয়ার একটি নতুন কারণ আবিষ্কার করেন।

বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে গত ৫ বছর ধরে ৩০-৬০ বছর বয়সী ৫৭৪ জন সুস্থ লোকের ওপর এই গবেষণা পরিচালনা করা হয়।

এখন পর্যন্ত ডায়াবেটিসের কারণ অনুসন্ধানের লক্ষ্যে অনেক গবেষণা পরিচালনা করা হয়েছে। বিভিন্ন সময় এ রোগের জন্য দায়ী বিভিন্ন কারণ সামনে এসেছে।

এবার আরেক ধাপ এগোনো গেল। এ সম্পর্কিত গবেষণা প্রতিবেদনটি সম্প্রতি ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল ও আমেরিকান ডায়াবেটিস সমিতির যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত জার্নাল দ্য বিএমজে ওপেন ডায়াবেটিস রিসার্চ অ্যান্ড কেয়ার-এ প্রকাশিত হয়েছে।

এ সম্পর্কিত সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন গবেষণায় জানা গেছে, ডায়াবেটিসের প্রত্যক্ষ কারণ হলো টক্সিন নিয়ন্ত্রিত নিম্ন-গ্রেডের সিস্টেমিক প্রদাহ।

এই প্রদাহের ফলে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন ইনসুলিনের উৎপাদন ও কার্যক্ষমতা কমে যায়। এতে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে গিয়ে ডায়াবেটিস হয়।

গবেষকেরা জানান, মানবদেহের অন্ত্রে থাকা মৃত ব্যাকটেরিয়ার কোষ প্রাচীরের অংশ টক্সিন (এন্ডোটক্সিন) হিসেবে কাজ করে। এই টক্সিন সাধারণত মলের সঙ্গে বেরিয়ে যায়।

তবে উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার, ফ্রুকটোজ বা অ্যালকোহল টক্সিনকে রক্তে ঢুকতে সহায়তা করে। ফলে নিম্ন গ্রেডের সিস্টেমিক প্রদাহের সৃষ্টি হয়, যার ফলে ডায়াবেটিস হতে পারে।

তবে এই টক্সিনকে ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে মানবদেহের অন্ত্রে থাকা ইন্টেস্টিনাইল অ্যালকালাইন ফসফাটেস (আইএপি) নামক এনজাইম।

এর ঘাটতি হলে অন্ত্রে অতিরিক্ত টক্সিন জমা হয়, যা রক্তে ঢুকে সিস্টেমিক প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে ডায়াবেটিসের পাশাপাশি ইশকেমিক হার্ট ডিজিজও হতে পারে।

গবেষণায় দেখা যায়, যাদের শরীরে আইএপি এনজাইম বেশি, তাদের তুলনায় যাদের কম, তাদের ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি ১৩ দশমিক ৮ গুণ বেশি।

অল্পবয়সীদের মধ্যে যাদের অন্ত্রে এ এনজাইম দ্রুত কমতে থাকে, তাদের ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি ৭ দশমিক ৩ গুণ বেশি।

গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের অন্ত্রে এই এনজাইম কম ছিল এবং পরে তা বেড়ে গেছে, তাদের ডায়াবেটিস হয়নি।

এনজাইমটি যাদের অন্ত্রে কম ছিল, তাদের ফাস্টিং সুগার বৃদ্ধির মাত্রা প্রায় দ্বিগুণ। এনজাইমের মাত্রা বেশি হলে স্থূল ব্যক্তিদেরও ডায়াবেটিস হয় না।

গবেষকেরা বলছেন, যাদের দেহে আইএপি এনজাইমের পরিমাণ কম, তাদের এটি খাওয়ানো সম্ভব হলে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ সম্ভব।

বর্তমানে গবেষকেরা এ এনজাইম তৈরির চেষ্টা করছেন।

প্রসঙ্গত, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী অধ্যাপক মধু এস মালো এর আগে আইএপি এনজাইম পরিমাপের লক্ষ্যে একটি পরীক্ষাও আবিষ্কার করেছিলেন।

মল পরীক্ষার মাধ্যমে মান শরীরে থাকা আইএপির পরিমাণ নির্ণয়ের এ পদ্ধতির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি নিরূপণ করা যাবে।

সে ক্ষেত্রে ঝুঁকিতে থাকা লোকেরা প্রতিরোধ মূলক পদক্ষেপ নিতে পারবেন।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি ডা. এ কে আজাদ খান বলেন, যাঁদের আইএপি কমে যায়, তাঁদের ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা বেশি।

এটি একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার। এই আবিষ্কার থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরাও বড় কাজ করতে সক্ষম।

গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বারডেম, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক।

আপনার জন্য নির্বাচিত খবর

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও পড়ুন

যুক্ত হউন

1,000FansLike
1,000FollowersFollow
100,000SubscribersSubscribe

সর্বশেষ খবর