সোমবার, মে ২৩, ২০২২

সরকারি ব্যয় বাড়ছে আট হাজার কোটি টাকা

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর চাহিদা ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি * সার, খাদ্যপণ্য, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি

রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে খাদ্যপণ্য, কৃষি, জ্বালানি তেল ও এলএনজির মূল্য বেড়েছে। আর এসব খাতে সরকারের নির্ধারিত ভর্তুকির অঙ্ক ঠিক থাকছে না।

পরিস্থিতি সামাল দিতে কমপক্ষে আরও আট হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বাড়াতে হিসাব কষছে অর্থ বিভাগ।

যদিও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর চাহিদা ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ভর্তুকি বেড়ে যাওয়ায় বেশ চাপের মুখে পড়েছে সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

অর্থ বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, গত দু’বছর করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে গিয়ে অর্থনীতি চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

সেখান থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসার আগেই শুরু হয় রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধ। এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।

এ ছাড়া যুদ্ধের আগে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশের অভ্যন্তরে এক দফা মূল্য বাড়িয়ে সমন্বয় করা হয়েছে।

কিন্তু এখন বর্ধিত দামেই কিনতে হচ্ছে জ্বালানি তেল। নতুন করে মূল্য সমন্বয় করা হবে না। ফলে এ খাতে ভর্তুকির অঙ্ক বাড়বে।

এ ছাড়া বেড়েছে সার ও খাদ্যপণ্যের দামও। আন্তর্জাতিক বাজারে এর দাম বাড়লেও সরকার কৃষকের সারের মূল্য বৃদ্ধি করেনি।

কৃষককে দেওয়া হচ্ছে ভর্তুকি মূল্যে সার। ফলে বড় ধরনের ভর্তুকি এ খাতেও গুনতে হবে।

এ ছাড়া রেমিট্যান্স প্রভাব ঠিক রাখতে সরকার নিজেই এ খাতে প্রণোদনা ২ শতাংশ থেকে ২.৫ শতাংশে উন্নীত করেছে। এখানে ভর্তুকি বাড়ছে।

সব মিলে আমরা ভর্তুকি নিয়েই আছি। তার মতে, এ ধাক্কা আসন্ন বাজেটেও গিয়ে পড়বে।

জানতে চাইলে সাবেক সিনিয়র অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ভর্তুকির অঙ্ক বাড়বে।

এটি ব্যবস্থা করতে হলে আমাদের রেমিট্যান্স ব্যবস্থার প্রতি নজর রাখতে হবে। এ খাত যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। রপ্তানি এখনো পর্যন্ত বাধাগ্রস্ত হয়নি।

রপ্তানি আয় বাড়ানো বিশেষ করে নতুন পণ্য, নতুন দেশ খুঁজতে হবে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে বিশেষ করে রাজস্ব আহরণ আরও বাড়াতে হবে। কারণ এই মুহূর্তে ভর্তুকি বন্ধ করা যাবে না। ভর্তুকির প্রয়োজন হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কৃষি ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে ইতোমধ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ভর্তুকি চেয়ে পত্র পাঠিয়েছে।

এর মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় ২৮ হাজার কোটি টাকা এবং জ্বালানি মন্ত্রণালয় ৩২ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে।

চলতি অর্থবছরে (২০২১-২২) কৃষি খাতে ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

বিশ্ববাজারে ইউরিয়া সারের মূল্য এক বছরের ব্যবধানে প্রতি কেজিতে ৩২ টাকা থেকে ৯৬ টাকায় উঠেছে।

কিন্তু সরকার এ সার আগের দামেই প্রতি কেজি ১৬ টাকা দরে বিক্রি করছে। মূল্যবৃদ্ধির কারণে এ খাতে ভর্তুকি কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।

সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এ ভর্তুকির অঙ্ক তিন হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্থ বিভাগ।

এ ছাড়া বিদ্যুৎ খাতে চলতি অর্থবছরে ৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এর প্রভাব বিদ্যুৎ খাতে পড়েছে।

এ খাতেও আরও দুই হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর হিসাব করছে অর্থ বিভাগ। আর এলএনজি খাতে চলতি অর্থবছরে ছয় হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে।

যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি গ্যাসের মূল্য অনেক বেড়েছে। ফলে এ খাতে ভর্তুকি বাড়বে এমনটি ধরে হিসাব চলছে।

সূত্র আরও জানায়, রেমিট্যান্সের প্রভাব বাড়াতে এ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়ানো হয়। প্রতি ১০০ টাকার বিপরীতে দুই টাকা প্রণোদনা দেওয়া হতো।

গত জানুয়ারিতে সেটি বাড়িয়ে ২ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়। এই দশমিক ৫০ শতাংশ প্রণোদনা বাড়ানোর ফলে এ খাতে নতুন করে ভর্তুকি আরও এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

অর্থাৎ বছরের শুরুতে ছিল রেমিট্যান্স খাতে ভর্তুকি চার হাজার কোটি টাকা। সেটি বছর শেষে দাঁড়াবে পাঁচ হাজার কোটি টাকা।

একই ভাবে রপ্তানি খাতে ছয় হাজার ৮২৫ কোটি টাকার ভর্তুকি বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে সাত মাসে ব্যয় করা হয়েছে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা।

এদিকে যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেল, গম, চিনিসহ অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়েছে। এর প্রভাবে অস্বাভাবিক দাম বেড়েছে দেশি পণ্যের বাজারে।

যে কারণে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় টিসিবি এক কোটি নিম্ন আয়ের মানুষকে সাশ্রয় মূল্যে চিনি, ভোজ্যতেল ও মসুর ডাল বিতরণ কর্মসূচি চালু করেছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, টিসিবির ফ্যামিলি কার্ড নামে এই কর্মসূচি পরিচালনা করতে গিয়ে সরকারকে ৪০০ কোটি টাকার ভর্তুকি গুনতে হবে।

এদিকে বেসরকারি সংস্থা সিপিডির হিসাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, গ্যাস, সার ও খাদ্যপণ্যের বৃদ্ধির কারণে আগামী তিন মাসে ডিজেলের জন্য বাড়তি খরচ করতে হবে প্রায় চার হাজার ৮০০ কোটি টাকা।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় তিন হাজার ৯১৫ কোটি টাকা, এলএনজিতে প্রায় ১৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা।

এ ছাড়া ফ্যামিলি কার্ডে টিসিবির পণ্য বাবদ প্রায় ৪৩০ কোটি টাকা এবং ভোজ্যতেলের ভ্যাট মওকুফ করায় কিছুটা রাজস্ব কমবে।

এসব নিয়ে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার মতো অতিরিক্ত বোঝা আসবে বাজেটের ওপর।

আপনার জন্য নির্বাচিত খবর

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও পড়ুন

যুক্ত হউন

1,000FansLike
1,000FollowersFollow
100,000SubscribersSubscribe

সর্বশেষ খবর