সোমবার, মে ২৩, ২০২২

ঝুঁকিপূর্ণ ৭০ লঞ্চে মৃত্যুর ‘হাতছানি’

প্রায় ২১ বছর ধরে মুন্সীগঞ্জের মীরকাদিম থেকে নারায়ণগঞ্জে এসে হোসিয়ারি ব্যবসা করছেন হাজী সাইফ উদ্দিন। যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম যাত্রীবাহী লঞ্চ।

বয়া ও লাইফ জ্যাকেট নামের কোনো বস্তু লঞ্চে দেখেননি বলে জানালেন তিনি।

প্রতিদিন নারায়ণগঞ্জ থেকে মুন্সীগঞ্জে যাতায়াতকারী এমন হাজারও লঞ্চ যাত্রীর কাছে নিরাপত্তা ও যাত্রী সেবা শুধুই ‘কাগজিক’ভাষা মাত্র।

শীত মৌসুম ছাড়া বছরের বাকিটা সময় প্রাণ হাতে নিয়েই চলাচল করতে হয় হাজার হাজার যাত্রীকে।

কারণ নারায়ণগঞ্জ থেকে ৭টি রুটে চলাচলকারী ৭০টি লঞ্চের (সানকেন ডেক) মধ্যে যেটি সবচেয়ে নতুন তার বয়সও কমপক্ষে ৩৫ বছর।

রোববার দুর্ঘটনা কবলিত ‘এম এল আফসার উদ্দিন’নামের লঞ্চটিও ৪৯ বছর আগের। তৈরি হয়েছিল ১৯৭৩ সালে।

এসব সানকেন ডেক প্রকারের লঞ্চগুলো অধিক মাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ বলে কয়েক বছর আগে থেকেই এগুলোর অনুমোদন বন্ধ করে দিয়েছে নৌপরিবহণ অধিদপ্তর।

কিন্তু এসব অতিমাত্রার ঝুঁকিপূর্ণ ও মান্ধাতা আমলের লঞ্চ আঁকড়ে ধরে ব্যবসা চালিয়ে আসছেন লঞ্চ মালিকরা।

অভিযোগ রয়েছে, এই লাইনে দোর্দণ্ড প্রতাপশালী হিসেবে খ্যাত লঞ্চ মালিক সমিতির সভাপতি বদিউজ্জামান বাদলের একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও নতুন বা আধুনিক লঞ্চ নামাতে পারেন না কোনো পুরানো বা নতুন মালিকই।

৩ যুগেরও বেশি সময় ধরে মালিক সমিতির সভাপতির পদ আঁকড়ে ধরে রাখা এই মালিক সমিতির নেতা অবশ্য এসব লঞ্চকে ঝুঁকিপূর্ণ বলতে রাজি নন।

যদিও খোদ এসব লঞ্চের ফিটনেস প্রদানকারী সংস্থা নৌপরিবহণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন এসব লঞ্চ ঝুঁকিপূর্ণ তো বটেই, পাশাপাশি ফিটনেস পাওয়ার মতো সব শর্ত পূরণেও ব্যর্থ এসব নৌযান।

আর বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষ ( বিআইডব্লিউটিএ) বলছে, দেশের সবচেয়ে ছোট আকারের আর ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চগুলোই চলছে নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ রুটে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীটি অত্যন্ত ব্যস্ততম একটি নৌরুট হওয়ায় এখান দিয়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার বালুবাহী বাল্কহেড, টাইটারেজ, কার্গোসহ বিশালাকার জাহাজ চলাচল করে।

দেশের অন্যতম বৃহত্তম নদীবন্দর হিসেবে খ্যাত নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দর থেকে মুন্সীগঞ্জসহ ৭টির রুটে মোট ৭০টি লঞ্চ চলাচল করছে।

আকারে ছোট এসব লঞ্চ এক সময় কাঠের তৈরি হলেও সরকারি নির্দেশে সেগুলোকে স্টিল (লৌহ) বডিতে রূপান্তর করে সানকেন ডেক টাইপের করা হয়।

কিন্তু এসব লঞ্চের তলানি খুবই পাতলা হওয়ায় সেগুলো শুরু থেকেই ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। হাল্কা ধাক্কাতেই এসব লঞ্চ ভারসাম্য হারিয়ে নদীতে তলিয়ে যায়।

প্রতি বছর নৌ দুর্ঘটনা ঘটায় বেশ কয়েক বছর আগেই নৌপরিবহণ অধিদপ্তর থেকে এসব সানকেন ডেক জাহাজের অনুমোদন দেয়া বন্ধ করে দেয়া হয়।

কিন্তু নারায়ণগঞ্জে চলাচলকারী সানকেন হেড লঞ্চগুলোর পূর্বের অনুমোদন থাকায় সেগুলো চলাচল করছেই।

সরেজমিন দেখা গেছে, এসব লঞ্চে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বলতে কিছুই নেই। লাইফ জ্যাকেট তো দূরে থাক একটি লঞ্চেও বয়ার দেখা মেলেনি।

অপরিষ্কার অপরিচ্ছন্ন টয়লেট আর লঞ্চজুড়ে শত শত জোড়াতালি দেয়া এসব লঞ্চের কোনোটির বয়স ৪৫ বছরও পেরিয়ে গেছে।

তবে যাত্রীদের নিরাপত্তায় কোনো ব্যবস্থা না থাকলেও লঞ্চ মালিকরা তাদের নৌযানের নিরাপত্তায় লঞ্চের চারপাশে মোটা রশি দিয়ে পুরনো টায়ার বেঁধে রাখেন।

আপাতদৃষ্টিতে সেগুলো যাত্রী নিরাপত্তার টিউব (চাকা) মনে হলেও মূলত নোঙর করা লঞ্চগুলো একে অপরকে ধাক্কা দিলেও লঞ্চের ক্ষতি যেন না হয় সেজন্যই এ ব্যবস্থা।

এদিকে রোববার লঞ্চডুবির ঘটনার পর নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দর থেকে যাত্রীবাহী এসব লঞ্চ চলাচল অনির্দিষ্টকালের জন্য বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে।

এ ঘোষণায় এই রুটে যাতায়াতকারী হাজার হাজার যাত্রী দুর্ভোগে পড়েন।

আর বিআইডব্লিউটিএর ওপর ক্ষোভ ঝেড়েছেন লঞ্চ মালিক সমিতির সভাপতি বদিউজ্জামান বাদল।

তিনি দাবি করেছেন, বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক (নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা) রফিকুল ইসলাম আমাকে ফোন দিয়ে লঞ্চ বন্ধ করতে বলেছেন কিন্তু এই বন্ধ ঘোষণায় বিআইডব্লিউটিএর কোনো আইনগত অধিকার নেই।

তাদের দায়িত্ব নৌরুট বা নৌপথ সচল রাখা, লঞ্চ বন্ধ করা নয়।

তিনি এ সময় দুর্ঘটনাকবলিত লঞ্চকে ধাক্কা দেওয়া জাহাজ রূপসীর চালকসহ আটক ৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হলেও জাহাজ মালিককে মামলায় আসামি না করায় এই মামলাকে সাজানো নাটক বলে আখ্যা দেন।

নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ রুটে চলাচলকারী এসব লঞ্চের ফিটনেস বৈধ কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে বাদল বলেন, নৌপরিবহণ অধিদপ্তর (ডিজি শিপিং) ফিটনেস বা সার্ভে রিপোর্ট দিয়েছে বলেই আমরা লঞ্চ চালাই।

নতুন বা আধুনিক লঞ্চ নামাতে চাইলেও তার বাধার কারণে সম্ভব হচ্ছে না এমন অভিযোগকে মিথ্যা দাবি করে বাদল বলেন, নৌপরিবহণ অধিদপ্তর আমাদের বললে আমরা অবশ্যই লঞ্চগুলোকে আধুনিক করতে পারি।

কিন্তু তারা তো এ ব্যাপারে কোনোদিনও কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

অপরদিকে বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক (নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা) রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, ডিজি শিপিং এখন আর সানকেন ডেক টাইপের লঞ্চগুলোকে অনুমোদন দেন না।

কিন্তু পুরানোগুলোকেই পেট্রনাইজ করা হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ রুটে দেশের সবচেয়ে ছোট ছোট লঞ্চগুলো এই রুটে চলাচল করছে।

পাশাপাশি এখানকার মালিকরা এখানে নতুন কোনো লঞ্চ বা বড় কোনো লঞ্চ প্রবর্তনের ব্যাপারে মোটেই আগ্রহী না।

তারা সেই মান্ধাতা আমলের সানকেন ডেক লঞ্চগুলো আঁকড়ে ধরে আছে। অথচ এমন একটি ব্যস্ততম নৌরুটে এমন ছোট লঞ্চগুলো চলাচল নিরাপদ নয়।

সামান্য একটু গুতো লাগলেই এগুলো ডুবে যায়। ফলে বড় বড় নৌযান এই রুটে চলে বিধায় ছোট আকারের এসব লঞ্চ চলাচল বারবার দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে, প্রাণহানি ঘটছে।

তাই সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তেই এই রুটে লঞ্চ চলাচল আপাতত বন্ধ করা হয়েছে।

অপরদিকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের সার্ভেয়ার এহতেশামুল হক নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জগামী লঞ্চগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে স্বীকার করে জানিয়েছেন, এসব লঞ্চে বয়া থাকাটা বাধ্যতামূলক।

তবে নতুন লঞ্চগুলোতে লাইফ জ্যাকেট থাকাটা আবশ্যক। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের এসব লঞ্চগুলো অনেক পুরনো হলেও যেগুলোর ফিটনেস আছে সেগুলো চলছে।

ফিটনেস বলতে আক্ষরিক ক্ষেত্রে যা বুঝায় সেগুলোর সব ক্রাইটেরিয়া এসব লঞ্চে নেই।

একশো ভাগ সেফটিও মেনটেইন করছে না। তবে মন্ত্রণালয়ের দেওয়া একটি পুরনো সার্কুলার (গ্যাজেট) অনুযায়ী এসব লঞ্চ চলছে।

আপনার জন্য নির্বাচিত খবর

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও পড়ুন

যুক্ত হউন

1,000FansLike
1,000FollowersFollow
100,000SubscribersSubscribe

সর্বশেষ খবর