সোমবার, মে ২৩, ২০২২

ঢাকার পুরোনো ১০ বিরিয়ানির দোকানের খোঁজ

বিরিয়ানি ছাড়া পুরান ঢাকা হীরা ছাড়া রাজমুকুটের মতো। পুরান ঢাকার অলিগলিতে যেমন ৮০ বছরের বেশি পুরোনো বিরিয়ানির দোকান আছে, তেমনি আছে একেবারে নবীনতম দোকানও, যার বয়স হয়তো এক বছরও হয়নি।

হাজি বিরিয়ানি
ঢাকার সবচেয়ে পুরোনো বিরিয়ানির দোকানের তালিকায় সবার ওপরে আছে হাজি বিরিয়ানির নাম। ১৯৩৯ সালে হাজি মোহাম্মদ হোসেন ‘হাজি বিরিয়ানি’ প্রতিষ্ঠা করেন। বংশপরম্পরায় এখন তাঁর নাতিরা ব্যবসা পরিচালনা করছেন। কাঁঠাল পাতায় বানানো প্লেটে পরিবেশন করা হয় হাজি বিরিয়ানি। নাজিরা বাজারের কাজী আলাউদ্দিন রোডে ৭০ নম্বর দোকানটি খোলা থাকে বেলা ১১টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত। প্রতি প্লেট বিরিয়ানির দাম ২০০ টাকা।

কাঁঠাল পাতায় বানানো প্লেটে পরিবেশন করা হয় হাজি বিরিয়ানি।

মানিক চান
৪৫ বছর ধরে পুরান ঢাকার মিটফোর্ড রোডের দিগুবাবু লেনে বিরিয়ানির ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন মানিক চান। তিনি দাবি করেন, তাঁর বাবা মিয়া চান বিরিয়ানির ব্যবসা শুরু করেছিলেন আনুমানিক ১৯৪৮ সালের দিকে। এখানকার মূল আকর্ষণ হচ্ছে, বিরিয়ানি ছাড়াও এখানে অনেক ধরনের খাবার পাওয়া যায়। সপ্তাহের ছয় দিন ভিন্ন ভিন্ন খাবার থাকে দোকানটিতে। শুক্রবার বন্ধ থাকে। এখানকার খাবারের দাম হাতের নাগালে। এই দোকানে প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর থেকে সকাল আটটা পর্যন্ত চলে বিরিয়ানি বিক্রি।

মিটফোর্ড রোডের দিগুবাবু লেনে বিরিয়ানির ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন মানিক চান।

মাখন বিরিয়ানি
১৯৫০ সালে আব্দুল কাদের মিয়ার হাত ধরে মাখন বিরিয়ানির পথচলা শুরু হয়। এরপর ব্যবসার হাল ধরেন আব্দুল কাদের মিয়ার ছেলে হাজি মাখন। এখন তাঁর সন্তানেরা ব্যবসা পরিচালনা করছেন। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত দোকান খোলা থাকে রায়সাহেব বাজারের নাসির উদ্দিন সরদার লেনের এই দোকানটি। এখানে হাফ প্লেট বিরিয়ানির দাম ১১০ টাকা, ফুল প্লেট ২৫০ টাকা।

১৯৫০ সালে শুরু হয় মাখন বিরিয়ানির পথচলা।

বুদ্দু বিরিয়ানি
বুদ্দু বিরিয়ানির যাত্রা শুরু হয় ১৯৫৯ সালে। এর প্রতিষ্ঠাতা করিম বকশ। তাঁর ছেলে এলাহী বকশ বুদ্দু মিয়া পরে ব্যবসার হাল ধরেন। বংশপরম্পরায় এখন বুদ্দু বিরিয়ানির মালিক বুদ্দু মিয়ার ছেলে জাহিদ। ফরিদাবাদের হরিচরণ রায় রোডের ৫৬ নম্বর দোকানটিতে বেচাকেনা শুরু হয় সকাল ৯টা থেকে। শেষ হয় রাত ১২টা নাগাদ। বাসমতী চাল দিয়ে রান্না করা বুদ্দুর খাসির কাচ্চি বিরিয়ানি বেশ জনপ্রিয়। এখানকার বিরিয়ানির হাফ প্লেটের দাম ১৫০ টাকা, ফুল প্লেটের দাম ২৫০ টাকা। বুদ্দু বিরিয়ানিতে মোরগ পোলাও পাওয়া যায়।

বুদ্দু বিরিয়ানির যাত্রা শুরু হয় ১৯৫৯ সালে।

শাহ্ সাহেবের বিরিয়ানি
ঢাকার চকবাজার শাহি জামে মসজিদের ঠিক বিপরীতে ৬ নম্বর বণিক সমিতির গলি দিয়ে সোজা ঢুকে, হাতের বামেই শাহ্ সাহেবের বিরিয়ানি। জানা যায়, খাবারের দোকানটির প্রতিষ্ঠাকাল আনুমানিক ১৯৬০ সাল। শাহ্ সাহেবের বিরিয়ানি শুধু সকালেই পাওয়া যায়। সকাল নয়টার মধ্যে বিরিয়ানি শেষ হয়ে যায়। এখানে হাফ প্লেট বিরিয়ানির দাম ৮০ টাকা, ফুল প্লেট বিরিয়ানি ১৬০ টাকা। বিরিয়ানির পাশাপাশি প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার এখানে মোরগ পোলাও পাওয়া যায়। খুবই কম পরিমাণে মসলার ব্যবহার এদের বৈশিষ্ট্য। শুক্রবার ও অন্যান্য সরকারি ছুটির দিনে শাহ্ সাহেবের বিরিয়ানির দোকান বন্ধ থাকে।

শুধু সকালেই পাওয়া যায় শাহ্ সাহেবের বিরিয়ানি।

হাজি নান্না বিরিয়ানি
হাজি নান্না বিরিয়ানির খাসির কাচ্চি ভোজনরসিকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। এ ছাড়া এখানে পাওয়া যায় মোরগ পোলাও। পুরান ঢাকার বাবুর্চি হাজি নান্না মিয়া ১৯৬২ সালে এই ব্যবসা শুরু করেন বলে জানা যায়। পরিবারের সদস্যরা ব্যবসার ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। হাফ প্লেট খাসির বিরিয়ানির দাম ১৭০ টাকা, ফুল প্লেট ৩৪০ টাকা। খাসির বিরিয়ানি এক বোল ৬৮০ টাকা। মোরগ পোলাও হাফ প্লেট ১৬০ টাকা। এখানে প্রতি মাসের ৫ তারিখে আস্ত মোরগের বিরিয়ানি বিক্রি হয়। প্রতি বোলের মূল্য ৩৭০ টাকা। বেচারাম দেউড়ির ৪১ নম্বর দোকানটি প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত খোলা থাকে।

বেচারাম দেউড়ির ৪১ নম্বর দোকানটি প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত খোলা থাকে।

ফখরুদ্দিন বিরিয়ানি
ঢাকার পুরোনো বিরিয়ানির দোকানগুলোর মধ্যে ফখরুদ্দিন বিরিয়ানি অন্যতম। ঢাকার বেইলি রোড, গুলশান, মতিঝিল ও ধানমন্ডিতে ফখরুদ্দিন বিরিয়ানির শাখা রয়েছে। ফখরুদ্দিন বিরিয়ানির রমনা শপিং কমপ্লেক্সে যোগাযোগ করে জানা যায়, এটি ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এখন বংশপরম্পরায় তৃতীয় প্রজন্মের হাতে এটি পরিচালিত হচ্ছে। এর বিরিয়ানি ঢাকায় বেশ জনপ্রিয়।

ফকরুদ্দিন বিরিয়ানির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত হাজী মো. ফখরুদ্দিন (ডানে)। ছবিঃ সংগৃহিত।

ঝুনু বিরিয়ানি
দেশি মোরগ দিয়ে রান্না হয় ঝুনু বিরিয়ানি। ১৯৭০ সালে জনৈক নূর মোহাম্মদ এটি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি তাঁর মেয়ে ঝুনুর নামে দোকানের নাম রাখেন। প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত এখানে বেচাকেনা চলে। এখানে হাফ প্লেট বিরিয়ানি পাওয়া যাবে ১৭৫ টাকা, ফুল প্লেট ৩৬০ টাকায়। এতে থাকে এক টুকরো মাংস, একটি ডিম, মুরগির গিলা-কলিজা-মাথা ভুনা। নারিন্দা রোডের ১১ নম্বরে ঝুনু পোলাও ঘরের অবস্থান।

দেশি মোরগ দিয়ে রান্না হয় ঝুনু বিরিয়ানি।

হানিফ বিরিয়ানি
হাজি বিরিয়ানির বিপরীতেই গড়ে উঠেছে পুরান ঢাকার আরেকটি প্রসিদ্ধ বিরিয়ানির দোকান হানিফ বিরিয়ানি। এটি যাত্রা শুরু করে ১৯৭৫ সালে। পুরান ঢাকার বাসিন্দা হাজি মোহাম্মদ হানিফ এটির প্রতিষ্ঠাতা। ২০০৫ সালে তাঁর মৃত্যুর পর ছেলে হাজি মোহাম্মদ ইব্রাহিম রনি ব্যবসার হাল ধরেন। ঢাকায় হানিফ বিরিয়ানির বেশ কয়েকটি শাখা রয়েছে। এখানকার প্রধান আকর্ষণ খাসির বিরিয়ানি। নাজিরা বাজারের কাজী আলাউদ্দিন রোডে ৩০ নম্বর দোকানটিতে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত বিরিয়ানিপ্রেমীদের ভিড় চোখে পড়বেই।

হানিফ বিরিয়ানি যাত্রা শুরু করে ১৯৭৫ সালে।

করিম বিরিয়ানি
করিম বিরিয়ানির প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৮০ সালের দিকে। এটি পুরান ঢাকার নয়াবাজারের ৩৬ / ১ প্রসন্ন পোদ্দার লেনে অবস্থিত। ২৪ বছর ধরে এটি পরিচালনা করছেন রাশেদ আহমেদ। বর্তমানে করিম বিরিয়ানির আর আগের মতো জৌলুশ নেই। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এটি কিছুটা পিছিয়েই পড়েছে। কিছুটা আক্ষেপ উঠে এসেছে করিম বিরিয়ানির মালিক রাশেদ আহমেদের কণ্ঠেও।

পুরান ঢাকার নয়াবাজারের ৩৬ / ১ প্রসন্ন পোদ্দার লেনে অবস্থিত করিম বিরিয়ানি।
এ ছাড়া ঢাকার পুরোনো বিরিয়ানির দোকানগুলো মধ্যে নীলক্ষেতের রয়েল বিরিয়ানি, খিলগাঁওয়ের মুক্তা বিরিয়ানি, মালিটোলার রশি বিরিয়ানি, নাজিরা বাজারের মামুন বিরিয়ানি, ইসলামপুরের কাশ্মীর বিরিয়ানি হাউস অন্যতম।

আপনার জন্য নির্বাচিত খবর

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও পড়ুন

যুক্ত হউন

1,000FansLike
1,000FollowersFollow
100,000SubscribersSubscribe

সর্বশেষ খবর