বুধবার, জুন ২৯, ২০২২

ভিন্ন পথের এক উদ্যোক্তা স্যামসন এইচ. চৌধুরীর গল্প

তার হাত ধরে পাবনার ছোট্ট গ্রাম আতাইকুলায় রোপিত হয়েছিল ‘স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্ক' নামে এক কল্যাণবৃক্ষ, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যা সমৃদ্ধির মাইলফলক হয়ে ওঠে ব্যবসায় মৌলিকত্ব না থাকা এ দেশে

এ গল্প রূপকথা হার মানানো।

৩২ বছর বয়সী এক তরুণের ঋজুতায় বদলে গেল অনেক কিছু। ইতিহাস যদিও সমষ্টির প্রয়াসে তৈরি, কিন্তু এরপরও নির্দিষ্ট একজনকে নিতে হয় নেতৃত্বের দায়িত্ব।

১৯৫৮ সালে স্যামসন এইচ চৌধুরী সে দায়িত্ব কাঁধে নেন। সঙ্গে ছিল ৩ বন্ধু। পাবনার ছোট্ট গ্রাম আতাইকুলায় রোপিত হয়েছিল এক কল্যাণবৃক্ষ, “স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্ক” নাম যার। বন্ধুত্বের এ নিদর্শন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমৃদ্ধির মাইলফলক হয়ে ওঠে মৌলিকত্ব না থাকা এ দেশে।

ঐতিহাসিকভাবে নদীমাতৃক পূর্ববঙ্গ ছিল শিল্প অভিজ্ঞতাশূন্য। কৃষিনির্ভর সমাজ যে অবস্থায় শিল্পে উড্ডয়ন করে, বাংলার বেলায় তেমন ঘটেনি। ঔপনিবেশিক জুলুমে খাজনা দিতেই নিঃস্ব হতে হয়েছে। দেশিয় প্রভাবশালীদের ভিন্ন কোনো রাস্তায় হাঁটার মুরোদ ছিল না। স্রেফ ভিনদেশি শাসকের তাঁবেদার হয়ে আয়েশী দিন পার করেছে তারা। গরজ ছিল না দেশীয় শিল্পভিত্তি তৈরির দিকে।

ব্রিটিশ বেনিয়া চলে গেল ‘৪৭-এ। নতুন শিল্পভিত্তি তৈরির এক মোক্ষম সুযোগ উপস্থিত। কিন্তু এবারও চোখে পড়ে না তেমন বাঙালি। সোনালি স্বপ্নের আঁশে বোনা পাটশিল্প গড়ে উঠল। কিন্তু বাঙালি এবারও কৃষক আর মুষ্টিমেয় মধ্যস্বত্বভোগী।

রফতানির সুফল গোটাটাই পাচার হয়ে যায় পশ্চিম পাকিস্তানে। শিল্পপতি বলতে দৃশ্যমান হয় কেবল আদমজী, বাওয়ানী। এ পরিস্থিতিতে স্যামসন এইচ. চৌধুরীকে হাঁটতে হয় এক ভিন্ন পথে। যে পথেরই অস্তিত্বই নেই, তেমন এক পথে হাঁটতে ইচ্ছুক তরুণ স্যামসন। পথ হারানোর সুযোগ নেই বলেই কি এত একাত্ম ছিলেন তিনি?

চাকরি করবেন না এমন দৃঢ়তায় ১৯৫২ সালে একটি ওষুধের দোকান দিয়েছিলেন। শুধু ব্যবসায়ীক ধান্দায় নয়, ধুঁকতে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়াতে। প্রাণ বাঁচাতে অপরিহার্য অনেক ওষুধ তৈরি হতো না দেশে। তাই স্যামসনের দোকানদার হওয়া সাজে না, করতে হবে ওষুধ কারখানা। কিন্তু এত কি সহজ ছিল সেই আমলে এক বাঙালি তরুণের ওষুধ কারখানার মালিক হওয়া? আজকের মতো ইন্টারনেট নেই, পিচঢালা রাস্তা নেই, বড় ভবন নেই। সে এক অদ্ভুত সময়! এ সময়টা কী করে নিজের করে নিয়েছিলেন স্যামসন? বিভিন্ন সময়ে তার বয়ানে উঠে এসেছে তা।

বাবা ইয়াকুব এইচ চৌধুরীকে বললেন, ওষুধের দোকান দিবেন। বাবা রাজি। অতঃপর পাবনার আতাইকুলায় একটি দোকান হলো। এলাকায় তখন ডাক্তার রশীদ বলে সদ্য পাশ করা একজন রোগী দেখতেন। এ রশীদ ডাক্তার স্যামসনের বন্ধু। গ্রামে প্রতি সপ্তাহে হাট বসে। ডাক্তার রশীদকে হাটের দিন নিজের ফার্মেসিতে বসতে অনুরোধ করলেন স্যামসন। বন্ধু রাজি হলেন। সারাদিন রোগী দেখে, খাওয়াদাওয়া করে, বিকালে তাসটাস খেলে চলে যেতেন রশীদ ডাক্তার। ওই সময়েই পাবনায় একজন ফার্মাসিস্ট ছিলেন। ম্যালেরিয়ার ওষুধ বিক্রি করতেন। কিছু দিন পর এ ফার্মাসিস্ট দেশত্যাগ করেন। তার জায়গা কিনে নিলেন একজন, যিনি পরে “এডরুক” নামে একটি ওষুধ কোম্পানির মালিক হয়েছিলেন। এই “এডরুক” ই তরুণ স্যামসনের উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন উসকে দেয়।

১৫ হাজার টাকা সম্বল। ছোট্ট একটা জায়গা ভাড়া নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কারখানা তৈরি করলেন। মিক্সচার সিরাপ আর কিছু ট্যাবলেট বানানো হতো এখানে। প্রথম দিকে কোনো ঝাড়ুদার ছিল না। নিজেরাই নিজেদের কারখানা ঝাড়ু দিতেন প্রতিদিন। তিন বছর পর এ কারখানার পুঁজি দাড়ালো ৮০ হাজার টাকা। চার বছর পর লাভের মুখ দেখে স্যামসনদের কারখানা “স্কয়ার”।

দেশ স্বাধীনের পর ঢাকায় ইত্তেফাক মোড়ে নতুন অফিস নেয় স্কয়ার। স্বাধীন বাংলাদেশে ব্যবসা করা আজকের দিনের মতোই কঠিন ছিল। রাজস্ব বোর্ড নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভীতি ছিল এখনকার মতোই। পত্রিকায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্যামসন জানিয়েছিলেন, কারখানার জন্য একটি মেশিন আনা হলো বিদেশ থেকে। বিমানবন্দরে কাস্টমস তা আটকে দিলো। কাস্টমস কর্মকর্তাদের কথা, এত বড় মেশিন কিছু না দিলে তো হয় না। স্যামসন কালেক্টরের সঙ্গে দেখা করলেন। তবুও কিছু হয় না। যদিও শেষ পর্যন্ত ঘুষ না দিয়েই মেশিনটি ছাড়িয়েছিলেন নাছোড়বান্দা স্যামসন।

এরপর ধীরে ধীরে ফলবতী স্কয়ার বড় হতে লাগলো। সঙ্গে স্যামসনের ভাবনাও প্রসারিত। স্কয়ার শেয়ার বাজারে এলো। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে দেশের ব্যক্তি পর্যায়ে সর্বোচ্চ করদাতা তিনি। আমৃত্যু ছিলেন তাই। অথচ এমন নয় যে, তিনি দেশের সেরা ধনী।

ওষুধ শিল্পে দেশের আজকের অবস্থান অনেকটা একক স্যামসন এইচ. চৌধুরী কীর্তি। শুধু নিজের স্কয়ারকে বড় করেননি। টেনে তুলেছেন পুরো ওষুধ খাতকে। যখন ওষুধ নীতি করা হয়, তখন লেগেছিলেন একটি দেশিয় শিল্পবান্ধব নীতি যেন প্রণয়ন হয় সে কাজে।

ওষুধ শিল্পের পর টেক্সটাইলসহ প্রায় দেড়ডজনের বেশি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন স্যামসন এইচ. চৌধুরী। প্রায় ৩০ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে সাধারণের অংশীদারিত্ব স্থাপন করেছেন, অর্থাৎ শেয়ারবাজারে নিয়ে গেছেন। নিজের স্কয়ারে তৈরি করেছেন বিশ্ব মানের পরিচালন ব্যবস্থাপনা। তার না থাকায়ও যা স্থানচ্যুত হয়নি। এসবের মধ্য দিয়েই তিনি হয়ে ওঠেন বেসরকারি খাতের একজন “লিজেন্ড”।

বছরের পর বছর ব্যবসার পরিধি বেড়েছে। ওষুধ শিল্পে পৃথিবীর সেরাদের কাতারে উঠে এসেছে পাবনার আতাইকুলার গর্ব। একসঙ্গে ব্যবসার হাল ধরতে সন্তানদের ব্যবসায় নিয়ে এলেন স্যামসন। এ সন্তানরা যোগ্য। “উই কেয়ার” বলা কথা কাজে প্রতিফলন ঘটিয়েছেন তারা। স্যামসন শেষ বয়সেও খুব সকালে অফিসে আসতেন। পরিবারকে কাজে জড়িয়েছেন। কিন্তু পুরো পেশাদারিত্ব বজায় রেখে। সন্তানরা চেয়ারম্যানই ডেকেছে বাবাকে। হাজার হাজার কোটি টাকার কোম্পানি স্কয়ার আজও বলছে স্যামসনের মন্ত্র “উই কেয়ার”। লুটেরার দেশে যে স্যামসন ছিলেন ভিন্ন পথের উদ্যোক্তা।

আজকের দিন ৫ জানুয়ারি প্রয়াত হন স্যামসন এইচ. চৌধুরী। অনন্তলোকে এই কর্মবীর সুখি হোন – এমনই প্রার্থনা।

আপনার জন্য নির্বাচিত খবর

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও পড়ুন

যুক্ত হউন

1,000FansLike
1,000FollowersFollow
100,000SubscribersSubscribe

সর্বশেষ খবর