মঙ্গলবার, জানুয়ারি ২৫, ২০২২

সেদিন বিধ্বস্ত চেহারায় ফেরেন ড. সেলিম

মৃত্যুর দুদিন আগেও ফোনে চাপ দিয়েছিল ছাত্রলীগ

সেদিন বিধ্বস্ত চেহারায় বাসায় ফিরেছিলেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) শিক্ষক ড. মো. সেলিম হোসেন।

তার চোখেমুখে ছিল ভয়ের ছাপ। মাথার চুল ছিল এলোমেলো। ছোট্ট মেয়ে আনিকাকে আদর করতেও ভুলে যান তিনি।

কী হয়েছে জানতে চাইলে স্ত্রীকে জানান, হল প্রভোস্টের দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন। এরপর ঢুকে পড়েন ওয়াশরুমে।

পরে সেখান থেকে দরজা ভেঙে তার অচেতন দেহ বের করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

সোমবার দুপুরে মোবাইল ফোনে এসব তথ্য জানান শিক্ষক ড. সেলিমের স্ত্রী সাবিনা খাতুন রিক্তা।

তিনি আরও জানান, ড. সেলিম কুয়েটের লালন শাহ হলের প্রভোস্ট ছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতারা হল ডাইনিংয়ের ম্যানেজার পদে নিজেদের লোককে নির্বাচন করতে তাকে চাপ দিয়ে আসছিল।

মৃত্যুর দুদিন আগেও ড. সেলিমকে ফোন করে কঠোর ভাষায় কথা বলেছিল ছাত্রলীগের এক নেতা।

বর্তমানে বিভিন্ন মোবাইল নম্বর থেকে ফোন করে তাকে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে বলেও জানান সাবিনা খাতুন রিক্তা।

৩০ নভেম্বর ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মীর সাক্ষাতের পর ড. সেলিমের রহস্যজনক মৃত্যু হয়। অভিযোগ ওঠে, ওই সাক্ষাতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাকে লাঞ্ছিত করেন এবং মানসিক নির্যাতন চালান।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, কুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ান সেজানের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ড. সেলিমকে অনুসরণ করে তার ব্যক্তিগত কক্ষে (তড়িৎ প্রকৌশল ভবন) প্রবেশ করে।

আনুমানিক আধা ঘণ্টা শিক্ষকের কক্ষে অবস্থান করে তারা। পরে শিক্ষক ক্যাম্পাস সংলগ্ন বাসায় যান। সেখানে দুপুর ২টার দিকে ওয়াশরুমে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন।

সাবিনা খাতুন রিক্তা বলেন, ওইদিন দুপুরের আগে তিনি (ড. সেলিম) আমাকে ফোনে বলেন, ‘১টা ১৫ মিনিটে ল্যাব আছে। তুমি রান্না করে রেখ।’ কিন্তু তিনি সময়মতো বাসায় ফেরেননি।

পৌনে ২টার দিকে তিনি বাসায় আসেন। উনি ক্যাম্পাস থেকে ফিরে সব সময় প্রথমে মেয়েকে কোলে নিতেন। কিন্তু সেদিন মেয়েকেও কোলে নেননি।

তার চুলগুলো ছিল এলোমেলো। চোখ-মুখ লাল। বিপর্যস্ত চেহারা।

কী হয়েছে জানতে চাইলে জানান, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল। অফিসে গিয়ে হল প্রভোস্টের দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন।

রিক্তা বলেন, এরপর তিনি গোসলের জন্য ওয়াশরুমে যান। কিছুক্ষণ পর তার মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস আনিকা ওয়াশরুমের সামনে গিয়ে বাবাকে ডাকে।

কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া মিলছিল না। পরে আমি গিয়ে ডাকাডাকি করি। কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ নেই। পরে আশপাশের লোকজনকে ডাকি।

তারা এসে ওয়াশরুমের দরজা ভেঙে ফেলেন। দেখি উনি অচেতন হয়ে দেওয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসে আছেন।

তাকে প্রথমে কুয়েট মেডিকেলে নেওয়া হয়। পরে সিটি মেডিকেলে। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ড. সেলিমের স্ত্রী জানান, বর্তমানে তাকে বিভিন্ন মোবাইল নম্বর থেকে একই ব্যক্তি ফোন করে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে।

এ নিয়ে তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বিষয়টি তিনি গোয়েন্দা সংস্থা ও কুয়েট শিক্ষক সমিতিকে জানিয়েছেন।

তারা আপাতত অপরিচিত নম্বর থেকে কল রিসিভ করতে নিষেধ করেছেন।

সাবিনা খাতুন রিক্তা বলেন, মৃত্যুর ঠিক দুদিন আগে রাত ১০টার দিকে ড. সেলিমের ফোনে একটি কল আসে।

এ সময় আমি ও আমার মেয়ে তার কাছেই ছিলাম। মোবাইল ফোনে অপর প্রান্ত থেকে খুব জোরে জোরে কথা বলা হচ্ছিল।

তার কথা শুনে ড. সেলিমের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। পরে তিনি জানান, ছাত্রলীগের এক নেতা হল ডাইনিংয়ের ম্যানেজারের পদের জন্য চাপ দিচ্ছে।

রিক্তা আরও বলেন, আমার স্বামী খুবই মেধাবী ছিলেন। তিনি অল্প বয়সে একাধিক দেশে গিয়ে বিভিন্ন ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

কিপ্টোগ্রাফিতে পিএইচডি করেছেন। তিনি তার স্বামীর মৃত্যুর ঘটনায় দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছেও আইনগতভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান রিক্তা। এ বিষয়ে কুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রতীক চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, প্রয়াত স্যারের (ড. সেলিম) স্ত্রী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

তিনি বিষয়টি আমাদের জানানোর পর আমরা উপাচার্য স্যারকে জানিয়েছি।

কুয়েটের উপাচার্য প্রফেসর ড. কাজী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, বিষয়টি আমরা দেখছি।

মামলার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পর আমরা পদক্ষেপ নেব।

কমিটির প্রতিবেদন ও সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই সব হবে।

খানজাহান আলী থানার ওসি (তদন্ত) শাহরিয়ার হাসান বলেন, পারিপার্শ্বিক বিষয় ও সাধারণ ডায়েরির আলোকে আমরা ড. সেলিম হোসেনের লাশ উত্তোলনের উদ্যোগ নিয়েছে।

তার স্ত্রীকে হুমকির বিষয়টিও আমরা গুরুত্বসহকারে দেখছি।

সূত্রঃযুগান্তর

আপনার জন্য নির্বাচিত খবর

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও পড়ুন

যুক্ত হউন

1,000FansLike
1,000FollowersFollow
100,000SubscribersSubscribe

সর্বশেষ খবর