মঙ্গলবার, জুন ২৮, ২০২২

ব্রংকিওলাইটিস কী ও কেন হয়

শীতের শুরুতে শিশুদের প্রায়ই ঠান্ডা লাগে। এ সময়ে অনেক শিশুর কাশিসহ শ্বাসকষ্ট হয়। অনেকেই একে নিউমোনিয়া বা হাঁপানি মনে করেন। শিশুদের কাশি ও শ্বাসকষ্ট হলেই সেটি নিউমোনিয়া বা হাঁপানি নাও হতে পারে। মৌসুমের এ সময়ে শিশুদের কাশি ও শ্বাসকষ্টের অন্যতম কারণ ব্রংকিওলাইটিস। এটি একটি ভাইরাসজনিত রোগ। বিস্তারিত লিখেছেন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ শিশু চিকিৎসক সমিতির সভাপতি

ব্রংকিওলাইটিস রোগের জীবাণু হলো রেসপিউরেটরি সিনটাইটিয়াল ভাইরাস (Respiratory Syncytial Virus-RSV)। তবে ইনফ্লুয়েঞ্জা-প্যারা ইনফ্লুয়েঞ্জা, এডিনো ও রাইনো ভাইরাসও কখনো কখনো এ রোগ সৃষ্টি করে।

হেমন্তের শেষ থেকে বসন্তের শুরু অবধি দুই বছরের কম বয়সি শিশুদের শ্বাসতন্ত্রের এ সংক্রমণ ব্রংকিওলাইটিস দেখা যায়।

সাধারণত দুই মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এ রোগ হয়। তবে তিন থেকে নয় মাসের বাচ্চাদেরই বেশি হয়।

সময়ের আগে জন্ম নেওয়া শিশু অর্থাৎ অপরিণত শিশু, যে শিশু মায়ের বুকের দুধ খায় না এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকা শিশুদেরও ফুসফুসের এ রোগের আক্রান্ত হওয়ার আশংকা বেশি।

নিউমোনিয়া ও ব্রংকিওলাইটিস বোঝার উপায়
গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের শিশুদের নিউমোনিয়ার চেয়ে ব্রংকিওলাইটিসই বেশি হয়। এক্ষেত্রে শ্বাসতন্ত্রের দুটি সম্পূর্ণ পৃথক স্থান আক্রান্ত হয়।

ফুসফুসের ক্ষুদ্র নালী ব্রংকিওলে ভাইরাসের কারণে প্রদাহ হলে তাকে বলে ব্রংকিওলাইটিস। আরও গভীরে এলভিওলাইতে প্রদাহ হলে তাকে বলে নিউমোনিয়া।

ব্রংকিওলাইটিস হলে শিশুদের মধ্যে অনেকে বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ে, শরীরের তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকে, পাশাপাশি কাশি ও শ্বাসকষ্টের পরিমাণও বেশি থাকে।

অপরদিকে ব্রংকিওলাইটিসে কাশি বেশি হলেও শিশু হাসিখুশি থাকে, জ্বর থাকে না বা কম থাকে। ব্রংকিওলাইটিস হলে শিশু ঠান্ডা-কাশি আর শ্বাসকষ্টে ভুগলেও সেই অর্থে অসুস্থ মনে হয় না।

এ ক্ষেত্রে ফুসফুসের প্রান্তিক শ্বাসনালিগুলোতে প্রদাহের সৃষ্টি হয়ে ফুলে যায় এবং মিউকাস নামক পদার্থ দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে শিশুর স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসে বাধার সৃষ্টি করে।

লক্ষণ
প্রথমে আক্রান্ত শিশুর নাক দিয়ে পানি পড়ে, তারপর আস্তে আস্তে কাশি শুরু হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়।

শ্বাসকষ্ট হলে বুকের খাঁচা বা পাঁজর শ্বাস নেওয়ার সময় ডেবে যায় এবং শিশু ঘনঘন বা দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস গ্রহণ করে।

শ্বাস নেওয়ার সময় বুকে সাইসাই শব্দ বা বাঁশির আওয়াজের মতো শোনা যায়। দুধ টানতে বা খেতে শিশুর কষ্ট হয়।

তীব্রতা অনুযায়ী রোগের শ্রেণিভেদ
মৃদু: বুকের দুধ বা পানীয় পান করতে পারে, শ্বাসকষ্ট খুব বেশি হয় না এবং অক্সিজেন মাত্রা স্বাভাবিক ৯২ শতাংশের ওপরে থাকে।

মধ্যম: খেতে গেলে শ্বাসকষ্ট হয়, বুকের নিচের অংশ ডেবে যায় এবং অক্সিজেন মাত্রা ৯২ শতাংশের নিচে থাকে, তবে অক্সিজেন দিলে তা স্বাভাবিক হয়ে আসে।

মারাত্মক:বুকের দুধ বা পানীয় পান করতে পারে না, শ্বাসপ্রশ্বাসে কষ্ট হয় ও বুকের নিচের অংশ তীব্রভাবে ডেবে যায় এবং শ্বাসপ্রশ্বাসে শব্দ শোনা যায়। অক্সিজেন মাত্রা ৯২ শতাংশের নিচে চলে যায় এবং অক্সিজেন দিলেও সহসা স্বাভাবিক হয় না।

রোগ নির্ণয় ও ঝুঁকি
ব্রংকিওলাইটিস রোগ নির্ণয় করতে তেমন কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা লাগে না। হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। কেননা এর প্রধান চিকিৎসা অক্সিজেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক লাগে না।

ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের জটিলতা হতে পারে। যেমন- যাদের বয়স ৩ মাসের কম, অপরিণত বা প্রিম্যাচিওর বেবি, জন্ম ওজন কম এবং যেসব শিশুর হৃদপিণ্ডের জন্মগত ত্রুটি আছে।

এটি ছোঁয়াচে রোগ, শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে রোগজীবাণু ছড়ায়। তাই আক্রান্ত শিশু থেকে অন্য শিশুদের আলাদা রাখা উচিত।

শিশুকে ধরা বা কোলে নেওয়ার আগে যে কারও ভালো করে হাত ধুয়ে নেওয়া জরুরি।

এ রোগ সম্পর্কে একটু সচেতন হলেই রোগ প্রতিরোধ ও নিরাময় দুটোই সহজে করা যায়।

চিকিৎসা
ব্রংকিওলাইটিসে আক্রান্ত শিশুর জন্য যে কোনো ব্রঙ্কোডাইলেটর, হাইপারটোনিক স্যালাইন এবং অক্সিজেন থেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসা করতে হয়।

অনেক সময়, গ্লুকোকোর্টিকয়েড স্টেরয়েড প্রয়োজন হয়। অ্যান্টিবায়োটিক এক্ষেত্রে দরকার পরে না।

* নাক-গলা পরিষ্কার রাখুন, (বাল্বসাকার বাল্ব সিরিঞ্জ ব্যবহার করতে পারেন)।

* জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল ওষুধ খাওয়াতে হবে।

* বুকের দুধ, পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে হবে।

* শ্বাসকষ্টের জন্য নেবুলাইজার (ইপ্রাটোপিয়াম, সালবুটালিন) অথবা ব্রঙ্কোডাইলেটর সিরাপ (ব্রংকোলাক্স বা সালমলিন সিরাপ) খাওয়ানো দরকার পরে।

প্রতিরোধ ও সতর্কতা
* শিশুকে স্যাঁতসেঁতে, অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে রাখা যাবে না। উষ্ণ আবহাওয়ায় স্বাভাবিক আলো-বাতাস চলাচল করে এমন ঘরে রাখতে হবে।

* শীতের তীব্রতা অনুযায়ী হালকা ও নরম কাপড় পরিধান করাতে হবে।

* ধুলাবালি, ধোয়া থেকে শিশুকে দূরে রাখতে হবে, শিশুর ঘরে বা সামনে বড়দের ধূমপান করা যাবে না।

* সন্তানকে অন্যান্য অসুস্থ শিশু থেকে দূরে রাখতে হবে।

লেখক: অধ্যাপক ডা. মনজুর হোসেন, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ও সভাপতি, বাংলাদেশ শিশু চিকিৎসক সমিতি।

আপনার জন্য নির্বাচিত খবর

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও পড়ুন

যুক্ত হউন

1,000FansLike
1,000FollowersFollow
100,000SubscribersSubscribe

সর্বশেষ খবর