শনিবার, জানুয়ারি ২২, ২০২২

ব্যাংকারদের সহায়তায় ঋণ জালিয়াতি

করোনার ক্ষতি মোকাবিলায় প্রণোদনা

করোনার নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া প্রণোদনার ঋণ নিয়ে বেশকিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান জালিয়াতি করেছে।

এসব জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ পেতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছেন একশ্রেণির ব্যাংক কর্মকর্তা।

তাদের সহায়তায় কম সুদের প্রণোদনার ঋণ নিয়ে তা দিয়ে বেআইনিভাবে অন্য খাতের বেশি সুদের ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে।

কয়েকটি ব্যাংকের শাখার কর্মকর্তারা আগের ঋণ শোধ করার শর্তেই সংশ্লিষ্ট গ্রাহকদের প্রণোদনার ঋণ পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন।

প্রণোদনার ঋণের অপব্যবহারের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক তদন্ত প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনগুলো এখন সমন্বয় করা হচ্ছে।

কোন গ্রাহক কী ধরনের জালিয়াতি করেছেন, তা সুনির্দিষ্ট করে ছক আকারে তৈরি করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে ব্যাংক কর্মকর্তারাও কী ধরনের অনিয়ম করেছেন বা অনিয়ম করতে গ্রাহককে বেআইনিভাবে কীভাবে সহায়তা করেছেন, তা আলাদা করা হচ্ছে।

প্রণোদনা ঘোষণার সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলারে স্পষ্ট করেই উল্লেখ ছিল এ ঋণ শুধু সংশ্লিষ্ট খাতে চলতি মূলধন হিসাবে ব্যবহার করতে হবে।

এ ঋণ অন্য কোনো খাতে ব্যবহার, আগের কোনো ঋণ পরিশোধ বা সমন্বয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণ বা সংস্কার করা যাবে না।

২০১৯ সালে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া চলতি মূলধনের ৩০ শতাংশ প্রণোদনা হিসাবে দেওয়া যাবে।

এ ঋণ খেলাপি হলে, সীমার অতিরিক্ত ঋণ দেওয়া হলে, ভিন্ন খাতে ব্যবহার করলে কোনো সুদ ভর্তুকি পাওয়া যাবে না।

একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে পুনঃঅর্থায়ন করবে, তার বিপরীতে দণ্ড সুদ আদায় করা হবে।

সার্কুলারে আরও বলা হয়েছিল, এ বিষয়গুলো তত্ত্বাবধান করার জন্য সরাসরি প্রধান নির্বাহীর নেতৃত্বে একটি বিশেষ সেল গঠন করতে হবে।

এ সেল প্রণোদনার ঋণ বিতরণে ফোকাল পয়েন্ট হিসাবে কাজ করবে। বিষয়গুলো কঠোরভাবে তদারকি করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু প্রণোদনার ঋণ বিতরণের এক বছরের মধ্যেই নানা ধরনের অনিয়মের কথা উঠে আসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে।

পরে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক তদন্ত করা হয়। এতে বেশকিছু ব্যাংকে জালিয়াতির তথ্য উঠে আসে।

এর মধ্যে বেশির ভাগই হচ্ছে কম সুদে ঋণ নিয়ে আগের বেশি সুদের ঋণ পরিশোধ এবং অন্য খাতে স্থানান্তর করে নেওয়া।

তদারকির জন্য প্রতিটি ব্যাংকে বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করা হলেও তদারকি তেমনটি হয়নি।

এ প্রসঙ্গে কয়েকটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা প্রায় একই ধরনের মন্তব্য করে বলেন, প্রণোদনার বেশির ভাগ ঋণই যথাযথভাবে বিতরণ করা হয়েছে।

কিছু ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে। সেগুলোর বিষয়ে ব্যাংক থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দ্রুত ঋণ বিতরণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রবল চাপ ছিল। দ্রুত করতে গিয়ে কিছু ক্ষেত্রে তদারকিতে শিথিলতা হতে পারে।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের একটি কাঠামো রয়েছে।

প্রণোদনার ঋণে বিশেষ তদারকি করার নির্দেশ ছিল। সেটি অনেক ক্ষেত্রেই হয়নি। ব্যাংকগুলোর নিয়মিত গ্রাহকরাই অনিয়ম করেছে।

এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো প্রণোদনার ঋণ ব্যবহারে তদারকি করতে পারেনি। এমনটি হওয়ার কথা ছিল না।

তিনি আরও বলেন, অনিয়মের দায়ে সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিষয়। বিষয়গুলো উচ্চপর্যায়ে উপস্থাপন করা হলে বোঝা যাবে।

প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, প্রণোদনার শর্ত ভঙ্গ করে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান কম সুদের ঋণ নিয়ে বেশি সুদের ঋণ পরিশোধ করেছে।

এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর কতিপয় কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট গ্রাহকদের বেআইনি কর্মকাণ্ডের পক্ষে কাজ করেছেন।

প্রণোদনার ঋণ ছাড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর কিছু অর্থ দিয়ে আগের ঋণ শোধ করা হয়েছে।

এছাড়া এসব ঋণ অন্য খাতেও ব্যবহারের নজির পাওয়া গেছে।

প্রণোদনার শর্ত অনুযায়ী, গ্রাহক আগের বছরে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির নামে যে পরিমাণ চলতি মূলধন ঋণ নিয়েছেন তার ৩০ শতাংশ প্রণোদনা হিসাবে ঋণ পাবেন।

এর বেশি ঋণ পাবেন না। প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, গ্যালিকো স্টিল বিডি লিমিটেডকে প্রাপ্ত সীমার চেয়ে বেশি দেওয়া হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানের নামে ৩৩ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হলে গ্রাহক ব্যাংক কর্মকর্তাদের সহায়তায় অন্য ঋণ বেআইনিভাবে সমন্বয় করেছে।

প্রণোদনার ঋণ নিয়েছে সাড়ে ৪ শতাংশ সুদে। এ অর্থে ৯ শতাংশ সুদের অন্য ঋণ পরিশোধ করেছে।

প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এলকো ওয়্যার কেমিক্যালস লিমিটেড ৩ কোটি টাকা প্রণোদনার ঋণ নিয়ে অন্য ব্যাংকের বেশি সুদের ঋণ শোধ করেছে।

বেআইনিভাবে অন্য ঋণ সমন্বয়ের বিষয়টি ব্যাংক জানার পরও নীরবতা পালন করেছে।

এছাড়া গ্রাহক যে পরিমাণ ঋণ পাবে, এর চেয়ে বেশি ঋণ দিয়েছে ব্যাংক। কিন্তু বাড়তি এ ঋণ সমন্বয় করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নির্দেশ দেওয়া হলেও তা করা হয়নি।

বাংলাদেশ থাই অ্যালুমিনিয়াম প্রণোদনা বাবদ ১৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ৩ কোটি টাকা নগদ আকারে তুলে পরে পে-অর্ডারের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংকের হিসাবে জমা করেছে।

পরে ওইসব অর্থ নগদ আকারে তুলে নিয়ে কোন খাতে ব্যবহার করেছে, এর তথ্য নেই ব্যাংকে।

সিলমো ইলেকট্রোস লিমিটেড ৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে অন্য ঋণ পরিশোধ করেছে।

পূরবী অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে শর্ত অনুযায়ী ব্যবহার করেছে কি না, এ তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দলকে দেখাতে পারেনি।

স্টোন ব্রিকস ৯ কোটি টাকা নিয়ে অন্য ঋণ বেআইনিভাবে সমন্বয় করেছে। রশিদ ব্রিকস ৮ কোটি টাকা প্রণোদনার ঋণ নিয়ে ৭ কোটি টাকা দিয়ে অন্য ঋণ সমন্বয় করেছে। বাকি ১ কোটি টাকা নগদ তুলে নিয়েছে।

রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক থেকে প্রণোদনা বাবদ ৪ শতাংশ সুদে যেসব ঋণ দেওয়া হয়েছে, এর একটি বড় অংশই বেশি সুদের অন্য ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করা হয়েছে।

ব্যাংক কর্মকর্তাদের সহায়তায় বিশষ করে কৃষি ফার্ম ও অ্যাগ্রো প্রসেসিং শিল্পের উদ্যোক্তারা এসব কর্মকাণ্ড করেছেন।

অনেক ক্ষেত্রে আগের শোধের নিশ্চয়তা পেয়ে প্রণোদনার ঋণের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তারা। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে।

চট্টগ্রামের বড় একটি শিল্পগ্রুপ প্রণোদনা বাবদ ১০ কোটি ৩০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে তা দিয়ে আগের বাণিজ্যিক ঋণ পরিশোধ করেছে।

উল্লেখ্য, করোনার প্রকোপ শুরু হলে গত বছরের এপ্রিল থেকে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়।

এখন পর্যন্ত ২৩টি প্যাকেজের আওতায় দুই দফায় আড়াই লাখ কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ঋণনির্ভর প্রণোদনা প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা।

আপনার জন্য নির্বাচিত খবর

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও পড়ুন

যুক্ত হউন

1,000FansLike
1,000FollowersFollow
100,000SubscribersSubscribe

সর্বশেষ খবর