শনিবার, জানুয়ারি ২২, ২০২২

দেশের প্রথম আর্সেনিক শনাক্ত গ্রামের চিত্র পাল্টে গেছে

জনস্বাস্থ্য ও প্রকৌশল অধিদপ্তর ১৯৯৩ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বারোঘরিয়া ইউনিয়নের চামাগ্রামে কয়েকটি কূপে পরীক্ষা চালিয়ে দেশের সর্বপ্রথম ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি পায়।

এরপরই সেই গ্রামের মানুষের জন্য ত্রাণকর্তা হিসেবে আসে ‘ব্রতী’ নামের সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।

তারা পরীক্ষানিরীক্ষা শুরু করে কীভাবে বাংলাদেশে প্রথম আর্সেনিক শনাক্ত গ্রামের বাসিন্দাদের আর্সেনিকমুক্ত পানি সরবরাহ দেওয়া যায়।

গ্রামবাসীর জন্য আর্সেনিক পানির ভয়াবহতা দূর করতে ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ দিতে গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা মহানন্দা নদী থেকে পানি সংগ্রহ করে প্রাকৃতিক উপায়ে ফিল্টার করে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করছে ব্রতী।

বর্তমানে তারা বারোঘরিয়া ইউনিয়নের চামাগ্রাম, লাহারপুর ও লক্ষ্মীপুর গ্রামের প্রায় ৫০০ পরিবারে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করছে।

ব্রতী পানি বিশুদ্ধ করতে প্রয়োগ করছে প্রাকৃতিক পদ্ধতি। পাথর-বালু দিয়ে নদীর পানি বিশুদ্ধ করে সরবরাহ করছে আশেপাশের ৩ গ্রামে।

নদী থেকে সংগ্রহ করা ফিল্টার পানি, গ্রামের মানুষেরা খাবার পানি ছাড়াও রান্না ও অন্যান্য কাজে ব্যবহার করছে। প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে নদীর পানি বিশুদ্ধ করে সরবরাহ করায় দেশের প্রথম আর্সেনিক শনাক্ত গ্রামের চিত্র পাল্টেছে।

ব্রতীর এই কার্যক্রমের ফলে বর্তমানে গ্রামটিতে কেউ নতুন করে টিউবওয়েল স্থাপন করছে না।

জানা যায়, ব্যয়বহুল খরচের এই পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠানটির কোনো লাভ না হলেও, ব্যাপক সুবিধা পাচ্ছে ৩টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের প্রথম আর্সেনিক শনাক্ত জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা এর ঝুঁকিতে আছে।

এখনই কার্যকরী পদক্ষেপ না নিলে আর্সেনিকের প্রভাবে বিভিন্ন রোগ ছড়াতে পারে।

সেক্ষেত্রে জেলাজুড়ে বয়ে চলা মহানন্দা নদীর পানি সংগ্রহ করে ব্রতীর মতো প্রাকৃতিক উপায়ে বিশুদ্ধ করতে পারলে রক্ষা পাবে এই অঞ্চলের মানুষ।

চামাগ্রাম গ্রামের সাইদুর রহমান বলেন, দেশের মধ্যে এই গ্রামে প্রথম আর্সেনিক ধরা পড়ার পর ব্রতীর নির্বাহী পরিচালক গ্রামের আর্সেনিকের অবস্থা দেখতে আসেন।

এরপর তিনি গ্রামবাসীকে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করার উদ্যোগ নেন। মহানন্দা থেকে পাইপ দিয়ে আধা কিলোমিটার দূরে তাদের অফিসের পাশে ফিল্টারের জায়গায় পানি উঠিয়ে নিয়ে যায়।

এরপর পানি ফিল্টার করার পর বাড়ি বাড়ি বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করে তারা।

তিনি আরও বলেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পাওয়া গেছে ব্রতীর সরবরাহ করা পানি ১০০ ভাগ বিশুদ্ধ। তবে আগে পানির বিল ১২০ টাকা ও সংযোগ নিতে ১৫০ টাকা লাগতো।

তবে এখন তা বাড়িয়ে পানির বিল ৩৫০ টাকা ও সংযোগ ফি ৪০০ টাকা করা হয়েছে। এতে গ্রামবাসীর একটু কষ্ট হচ্ছে।

১০ বছর ধরে ব্রতীর পানি ব্যবহার করে একরামুল হকের পরিবার। একরামুল হকের স্ত্রী আকলিমা বেগম জানান, এই পানি পাওয়ার পর থেকে আমরা টিউবওয়েল বা কুয়া বন্ধ করে দিয়েছি।

আমাদের জন্য খুবই ভালো হয়েছে। যেকোনো সময় যেকোনো জায়গায় পানি সরবরাহ পাচ্ছি। রান্নাসহ সব কাজে এই পানি ব্যবহার করতে পারি।

লাহারপুর গ্রামের রঞ্জনা দাস বলেন, টিউবওয়েলের পানিতে প্রচুর পরিমাণে আইরন আছে। থালা-বাসন, এমনকি কাপড়ও লাল হয়ে যায়।

তাই আমরা এসব পানি বাদ দিয়ে নদীর সরবরাহ করা ব্রতীর পানি ব্যবহার করি। এই গ্রামে বর্তমানে টিউবওয়েল বসানো যায় না। কারণ এর পানি ব্যবহারের অনুপযোগী।

চায়ের দোকানের সব কাজে ব্রতীর সরবরাহ করা নদীর পানি ব্যবহার করেন নাজমুল হক শিবলী। তিনি বলেন, এই পানি জগে দুই মাস পর্যন্ত সরবরাহ করা যায়।

কোনোরকম আকার পরিবর্তন করে না। যেমন অবস্থায় রাখা হয়, তেমন অবস্থায় থাকে। দোকানে চা করা, কাস্টমারদের পান করাসহ সব কাজে এই পানি ব্যবহার করি।

ষাটোর্ধ্ব তাজেমুল হক জানান, এই গ্রানের ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যবহার করার অনুপযোগী। এখন পানি নিয়ে আমাদের আর কোন দুর্যোগ নেয়।

তাদের সরবরাহকৃত পানি বিশুদ্ধ ও সব কাজে ব্যবহার উপযোগী। এই গ্রামের এখন আর কেউ টিউবওয়েলের পানি পান করব না বলে জানান মোজাম্মেল হক।

স্থানীয় এনজিওকর্মী নাদিম হোসেন জানান, নদীর পানিতে কাপড়ের কোনো ক্ষতি হয় না। গোসল করা যেমন সুবিধা, তেমনি পান করতেও ভালো লাগে।

আমাদের গ্রামে এখনও নতুন কোন টিউবওয়েল বা গভীর নলকূপ স্থাপন করলে তাতে আর্সেনিক পাওয়া যায়। বর্তমানে ব্রতীর ফিল্টার করা পানি ব্যবহার আশেপাশের কয়েকটি গ্রামেও বাড়ানো যেতে পারে।

তাতে সেসব এলাকার মানুষ আর্সেনিক থেকে রক্ষা পাবে। এই পদ্ধতিতে নদীর পানির সঠিক ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা- ব্রতীর ফিল্ড ম্যানেজার আমিনুল ইসলাম বলেন, ১৯৯৩ সালে চামাগ্রামে আর্সেনিক শনাক্তের পর থেকেই ব্রতী এই এলাকায় বাড়ি বাড়িতে আর্সেনিকমুক্ত বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে কাজ শুরু করে।

এরপর থেকে সম্পূর্ণ অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রায় পাঁচশ পরিবারে পানি সরবরাহ করছি আমরা। আগামীতে পানি সরবরাহের পরিমাণ আরও বাড়ানো হবে।

তিনি আরও বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই কার্যক্রম মডেল হিসেবে নিয়ে আর্সেনিকপ্রবণ এলাকায় এমন কাজ করার ইচ্ছে রয়েছে।

এই কাজে সরকার বা অন্য কোনো সংস্থা এগিয়ে আসলে তাদেরকে সহযোগিতা ও পরামর্শ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে ব্রতীর।

আমাদের শিল্প আকারে বৈদ্যুতিক বিল দিতে হয়। এটি যদি কৃষি বা কোনো উপায়ে দেয়া যেত তাহলে প্রকল্পটি আরও দীর্ঘস্থায়ী করা যেত।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) চাঁপাইনবাবগঞ্জ শাখার সাধারণ সম্পাদক ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. গোলাম রাব্বানী জানান, আর্সেনিকের প্রভাবে বিভিন্ন সমস্যা দেখা যায়।

চামড়ায় সাদা দাগ হয়ে থাকে। চুল উঠে যায়, ফুসফুসের সমস্যা দেখা যায়। লিভারের বিভিন্ন সমস্যা ও শ্বাসকষ্ট হয় আর্সেনিকের কারণে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিত কুমার সরকার বলেন, সরকার নিরাপদ বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে নানা পদক্ষেপ নিয়ে থাকে।

বর্তমানে প্রত্যেকটি ইউনিয়নে সরকার থেকে ২৬টি করে পানির উৎস দিচ্ছে। সেক্ষেত্রে যেই এলাকার জন্য যেমন প্রযুক্তি দরকার, তেমনি প্রযুক্তি সম্পন্ন পানির উৎস দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ৩ বছরের তথ্য অনুযায়ী চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলায় ২১ শতাংশ টিউবওয়েলে আর্সেনিক পাওয়া গেছে।

শিবগঞ্জ ২৫ শতাংশ ও গোমস্তাপুরে ৮ শতাংশ টিউবওয়েলে আর্সেনিক পাওয়া গেছে।

তবে ভোলাহাট ও নাচোল উপজেলা এখনও আর্সেনিকমুক্ত রয়েছে।

বর্তমানে আরেকটি জরিপকাজ চলছে, শেষ হলে জেলাজুড়ে আর্সেনিকের বর্তমান অবস্থা জানা যাবে।

আপনার জন্য নির্বাচিত খবর

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও পড়ুন

যুক্ত হউন

1,000FansLike
1,000FollowersFollow
100,000SubscribersSubscribe

সর্বশেষ খবর