পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণে অচলাবস্থা কাটছে না

চাঁদপুরে তিন নদীর মিলনস্থল

দুই মন্ত্রণালয়ের টানাহেঁচড়ায় চাঁদপুরে তিন নদীর মিলনস্থলে পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ আলোর মুখ দেখছে না।

দীর্ঘ সাড়ে সাত বছরেও প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত পর্যটনকেন্দ্রটি নির্মাণের কোনো অগ্রগতি নেই।

রেলপথ মন্ত্রণালয় ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের রশি টানাটানিতে চাঁদপুর বড় স্টেশন মোলহেডের আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন স্থাপনার নির্মাণকাজ ফাইলবন্দি হয়ে আছে।

সংশ্লিষ্ট দুই মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত সিদ্ধান্তের অভাবেই এমন অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

পদ্মা-মেঘনা-ডাকাতিয়া নদীর মিলনস্থলে চাঁদপুর বড় স্টেশন মোলহেডের ১ দশমিক ৬ একর জায়গায় ইলিশকেন্দ্রিক হোটেল-মোটেল নির্মাণসহ একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ করতে আগ্রহী পর্যটন মন্ত্রণালয়।

অপরদিকে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দাবি-রেলের জায়গায় পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ করতে হলে তা তারাই করবে।

এ দুই মন্ত্রণালয়ের এমন রশি টানাটানিতে পর্যটনকেন্দ্রটির নির্মাণ কার্যক্রম সাড়ে সাত বছর ফাইলবন্দি হয়ে আছে।

এদিকে স্থানীয় প্রশাসন মোলহেডের চত্বরকে ‘বঙ্গবন্ধু পর্যটনকেন্দ্র’ নামকরণ করে এর প্রবেশপথে গেট নির্মাণ করলেও তেমন কোনো উন্নয়নই করতে পারছে না।

জানা যায়, চাঁদপুর সম্ভাবনাময় একটি পর্যটননগরী হতে পারে-এমন উপলব্ধি থেকে চাঁদপুরকে ‘পর্যটনকেন্দ্র ও ব্র্যান্ডিং জেলা’ গঠনের প্রথম উদ্যোগ নেন সাবেক জেলা প্রশাসক মো. আব্দুস সবুর মণ্ডল।

এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, সাংবাদিক, সুধীমহল ও তৎকালীন প্রশাসন নিয়ে ‘জেলা ব্র্যান্ডিং কমিটি’ গঠন করা হয়।

নদী তীরবর্তী রেলওয়ের অব্যবহৃত প্রায় ২০০ বিঘা জমির ওপর পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেয় কমিটি।

এজন্য রেলের ওই জায়গার অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ কার্যক্রমও হাতে নেওয়া হয়।

২০১৪ সালে জেলা প্রশাসকদের সম্মেলনে তৎকালীন জেলা প্রশাসক আব্দুস সবুর মণ্ডল চাঁদপুরে পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ এবং নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করেন।

পরবর্তী সময়ে রেল মন্ত্রণালয় ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মধ্যকার ভূমিসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে তিনি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার আয়োজন করেন।

সভায় দীর্ঘ আলোচনার পর পর্যটন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পর্যটন করপোরেশনকে রেলওয়ে মন্ত্রণালয় ভূমি স্থানান্তর করবে বলে সিদ্ধান্ত হয়।

এ সিদ্ধান্তের সূত্র ধরে পর্যটন করপোরেশনের প্রতিনিধিদল চাঁদপুর মোলহেড সরেজমিন পরিদর্শন করে।

‘রক্তধারা’ স্মৃতিস্তম্ভের পর থেকে নদীর তীর পর্যন্ত ১ দশমিক ৬ একর জমি নির্ধারণ করে তাতে ‘রিভারভিউ ফুড পোর্ট’ নামে আধুনিকমানের পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয় প্রতিনিধিদল।

পর্যটন করপোরেশনের মহাব্যবস্থাপক (পিটিএস) জাকির হোসেন সিকদার জানান, চাঁদপুরে তিন নদীর মিলনস্থলে একটি পর্যটনকেন্দ্র করা প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত।

তাই এটি নির্মাণে আমাদের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই।

২০১৪ সালে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠিয়ে প্রায় এক একর জায়গা চেয়ে আমরা লিখিত আবেদন করি।

রেলওয়ের মহাপরিচালক বিষয়টি নিরীক্ষার জন্য পূর্বাঞ্চলের ডিজির কাছে পাঠিয়েছেন।

পূর্বাঞ্চলের ডিজি এস্টেট বিভাগের মাধ্যমে আঞ্চলিক এস্টেট অফিসারের কাছে ফাইলটি স্থানান্তর করেছেন।

কিন্তু অদৃশ্য কারণে এস্টেট অফিস এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য এখনো দেয়নি।

এতে সাড়ে সাত বছর ধরে চাঁদপুর পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের কার্যক্রম ফাইলবন্দি হয়ে আছে।

রেলওয়ে চট্টগ্রাম বিভাগের প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা (পূর্ব) সুজন চৌধুরী জানান, চাঁদপুরের ওই স্থানটি রেলওয়ের অতিগুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।

সেখানে পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ করতে হলে অন্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নয়, রেলওয়ের মাধ্যমেই করতে হবে। রেলের সর্বোচ্চ অথরিটি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এদিকে দুই মন্ত্রণালয়ের বিতর্কের অবসান না হওয়ায় চাঁদপুর জেলা প্রশাসক ও পৌর প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে ওই স্থানকে ‘বঙ্গবন্ধু পর্যটনকেন্দ্র’ নামকরণ করে পর্যটন অঞ্চল ঘোষণা করা হয়েছে।

মূলত বড় স্টেশন মোলহেড চত্বরে ‘জেলা ব্র্যান্ডিং কমিটি’ মোলহোডের প্রবেশপথে ‘সেলফি স্ট্যান্ড’ নামে একটি ইলিশ ভাস্কর্য নির্মাণ করেছে।

তবে এটি ছাড়া দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন লক্ষ করা যায়নি। আবার এতে আপত্তিও জানিয়েছে রেলওয়ে।

রেলওয়ের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা এসএম সলিমুল্লাহ বাহার জানান, অনুমতি না নিয়ে রেলের জায়গায় নির্মাণ করা অবৈধ।

পর্যায়ক্রমে সব উচ্ছেদ করা হবে। তবে চাঁদপুর মোলহেডের কী থাকবে আর কী উচ্ছেদ হবে, এ বিষয়ে রেলের পূর্বাঞ্চলের চিফ এস্টেট অফিসার জানান, পর্যটনকেন্দ্র করার আগে জায়গাটি অবৈধ দখলমুক্ত করতে হবে।

সেখানে রেলওয়ে থেকে পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ কারণে অনুমতি না নিয়ে কিছু নির্মাণ করা হলেও সেসব বহাল থাকবে।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষার্থে কোনো ভাস্কর্য নির্মিত হলে তা অবশ্যই বহাল রাখা হবে।

এক্ষেত্রে ‘রক্তধারা’ ভেঙে ফেলার কোনো সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক অফিসে নেওয়া হয়নি। বাকিটা মন্ত্রণালয় বলতে পারবে।

চাঁদপুরের দুই মন্ত্রী শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এবং পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলমের হস্তক্ষেপে দুই মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘদিনের মতবিরোধ দূর হবে বলে চাঁদপুরের সুধীমহল প্রত্যাশা করে।

আপনার জন্য নির্বাচিত খবর

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও পড়ুন

যুক্ত হউন

1,000FansLike
1,000FollowersFollow
100,000SubscribersSubscribe

সর্বশেষ খবর