ছোট প্রকল্পে বড় অসংগতি

২১ মাসের প্রকল্প : ব্যয়ের প্রস্তাব ৪৬ মাসের, ইউএনওডিসি ও আইওএমকে বাস্তবায়নকারী সংস্থা হওয়ায় পরিকল্পনা কমিশনের আপত্তি

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় মাত্র ১৮ কোটি ৯৭ লাখ টাকার ছোট্ট একটি প্রকল্পে কর্মকর্তাদের বেতন প্রস্তাবে বড় ধরনের অসংগতি ধরা পড়েছে।

প্রকল্পটির মেয়াদ ২১ মাস হলেও স্টাফদের বেতন ধরা হয়েছে ৪৬ মাসের।

এক্ষেত্রে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ৬ কোটি ৮ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। এছাড়া অন্যান্য খাতে বেশকিছু ব্যয়ও ধরা হয়েছে, যা ৪৬ মাসের হিসাবেই।

শুধু তাই নয়, একজন আউটসোর্সিং কর্মকর্তার জন্য বেতন বাবদ প্রস্তাব করা হয়েছে ৩৫ লাখ ১০ হাজার টাকা, যা প্রাথমিকভাবে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে সংশ্লিষ্টদের কাছে।

এভাবে বিভিন্ন স্তরের বেতনসহ অন্যান্য খাতের ব্যয়ের অস্পষ্টতা সম্পর্কে ব্যাখ্যা চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।

সেই সঙ্গে এটি কোন সংস্থা বাস্তবায়ন করবে, তা নিয়েও সৃষ্টি হয়েছে জটিলতা।

‘গ্লোবাল অ্যাকশন টু প্রিভেন্ট অ্যান্ড অ্যাড্রেস ট্রাফিকিং ইন পার্সনস অ্যান্ড স্মার্গলিং অব মাইগ্রান্টস বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রকল্পে এমন প্রস্তাব করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ এই প্রস্তাব দেয়। ৩১ অক্টোবর এ নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় পিইসি (প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি) সভা। ওই সভার কার্যবিবরণী থেকে জানা যায় এসব তথ্য।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রকল্পটির দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) মামুন-আল-রশীদ বলেন, প্রকল্প প্রস্তাবে স্টাফ এবং আউটসোর্সিং জনবল কতজন হবে এবং মোট কত জনমাসের

বিপরীতে মাসিক পারিশ্রমিকের হার বিভাজন করা হয়েছে, তা দেওয়া হয়নি।

এ অবস্থায় টিএপিপিতে (কারিগরি প্রকল্প প্রস্তাব) এসব বিষয় সংযুক্ত করতে বলা হয়েছে।

তিনি জানান, পরামর্শকদের টার্মস অব রেফারেন্স (কর্মপরিধি) তাদের জনমাস এবং মাসিক সম্মানির হার টিএপিপিতে সংযুক্ত করতে বলা হয়েছে সভায়।

এছাড়া ২১ মাসের জন্য প্রস্তাবিত প্রকল্পের ৪৬ মাসের বেতনভাতা, অফিস ভবন ভাড়া, গাড়ি ভাড়ার সংস্থান রাখার বিষয়টি টিএপিপিতে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে মতামত দেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) ফেরদৌসী আখতার বলেন, এটি সম্পূর্ণ অনুদানের অর্থে বাস্তবায়ন করা হবে।

এখানে বাংলাদেশ সরকারের অর্থনৈতিক কোনো সম্পর্ক নেই। তারা যেহেতু টাকাটা এনেছে, আবার তারাই ব্যয় করতে চাচ্ছে, সেজন্য আমরা অতটা গ্রামারের মধ্যে ফেলতে চাইনি।

কেননা ওই টাকায় যে কার্যক্রম হবে, আমাদের দেশের মানুষই প্রশিক্ষিত হবে।

এখানকার কর্মকর্তারাই বেতনভাতা পাবেন। সুতরাং এটা দেশেরই লাভ হবে। এমন সরল চিন্তা করেই প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়েছে।

কিন্তু এখন যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, এতে যদি টাকাটা ফেরত চলে যায়, আমাদের কিছু করার থাকবে না।

সূত্র জানায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ কোটি ৯৭ লাখ ৬১ হাজার টাকা। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৩ সালের জুনে বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে।

এতে বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে ইউনাইটেড নেশনস অফিস অন ড্রাগ অ্যান্ড ক্রাইম (ইউএনওডিসি) এবং ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন (আইওএম)।

কিন্তু এতে ভেটো দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।

বলা হয়েছে, বাস্তবায়নকারী হিসাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো সংস্থাকে থাকতে হবে। এর আগে ৬ মে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) অনুষ্ঠিত হয় আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা।

সেখানেও বলা হয়েছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগকে লিড মন্ত্রণালয় করে সহযোগী মন্ত্রণালয় হিসাবে পররাষ্ট্র, আইন-বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে উল্লেখ করতে হবে।

পিইসি সভার কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ ২০১১ সালের জুলাইয়ে ইউএনটিওসি এবং ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে টিআইপি (ট্রাফিকিং ইন পার্সনস) প্রটোকল সম্মত হয়েছে।

কিন্তু এখনো স্মাগলিং অব মাইগ্রান্টস (এসওএম) প্রটোকল অনুমোদন করতে পারেনি।

বাংলাদেশ মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনটি (২০১২) কার্যকরভাবে এবং যথাযথভাবে ব্যবহার করার জন্য ২০১৭ সালে তিনটি রুলস তৈরি করেছে।

এছাড়া বাংলাদেশে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ প্রণয়ন করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মানব পাচার মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারের প্রধান সংস্থা হিসাবে কাজ করছে।

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার আরও চারটি দেশের (ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলংকা) সঙ্গে ইউএনওডিসির মাধ্যমে প্রযুক্তিগত সহযোগিতার একটি আঞ্চলিক কর্মসূচিতে স্বাক্ষর করেছে।

যার মধ্যে ব্যক্তি পাচার ও অভিবাসীদের পাচার মোকাবিলাও রয়েছে। ইউএনওডিসি ইতোমধ্যেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় মানব পাচার প্রতিরোধসংক্রান্ত বেশ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে।

সেই ধারাবাহিকতায় এ প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়েছে।

সভায় অংশ নেওয়া একাধিক সদস্য জানান, যেকোনো টিএপিপির উদ্দেশ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রেফারেন্স উল্লেখ করা প্রয়োজন।

এ সময় ইআরডির উপসচিব বিধান বড়াল বলেন, এই টিএপিপির উদ্দেশ্য এবং কার্যক্রমগুলো স্পষ্ট হলে পরবর্তী সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন অধিকতর সহজ হবে।

পিইসি সভার কার্যবিবরণীতে আরও বলা হয়েছে, টিএপিপিতে স্টাফ তালিকা সংযুক্ত নেই।

মোট স্টাফের সংখ্যা ১৪ জন উল্লেখ থাকলেও টিএপিপিতে অপর স্থানে ৪৬ জন উল্লেখ রয়েছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়।

এছাড়াও প্রশিক্ষণ ব্যয়, সেমিনার এবং কনফারেন্সের ব্যয়, ভ্রমণ ব্যয় সংশোধনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে পিইসি সভায়।

ওই সভায় বলা হয়, যেহেতু প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর যে ফল আসবে, তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থাগুলোর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত, তাই প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা এর অধীন কোনো সংস্থার নাম উল্লেখ করা যথাযথ হবে।

এ বিষয়ে ভৌত অবকাঠামো বিভাগের যুগ্মপ্রধান মো. আতাউর রহমান খান সভায় বলেন, ১৯৯৭ সালে ইউএনওডিসির যাত্রা শুরু হলেও এর বহু আগে থেকেই বাংলাদেশে মানব পাচার প্রতিরোধ, মাদক প্রতিরোধ কার্যক্রম এবং এ সংক্রান্ত আইন ও বিধি সবই রয়েছে।

সে ক্ষেত্রে জননিরাপত্তা বিভাগের অধীন কোনো সংস্থাকে যদি বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসাবে দায়িত্ব দেওয়া হয় তবে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, হোক অনুদানের অর্থ।

এটি তো আমাদের দেশের নামেই এসেছে। এরও একটি জবাবদিহিতা থাকা উচিত।

এছাড়া প্রকল্পের শুরুতেই যদি এরকম অসংগতি থাকে, তাহলে বাস্তবায়ন পর্যায়ে আরও হযবরল এবং অর্থের অপচয় হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।

উদ্দেশ্য যেহেতু ভালো, সেহেতু নিয়মের মধ্যেই টাকাটা খরচ হলে সবার জন্যই মঙ্গল।

সূত্রঃযুগান্তর

আপনার জন্য নির্বাচিত খবর

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও পড়ুন

যুক্ত হউন

1,000FansLike
1,000FollowersFollow
100,000SubscribersSubscribe

সর্বশেষ খবর