চট্টগ্রামে গ্রাহকের টাকা মেরে কোটিপতি তিন ব্যাংকার

বিদেশে পরিশ্রম করে প্রবাসীরা দেশে পাঠানো অর্থ সঞ্চয় করতে ব্যাংকে রাখলেও গ্রাহকের অজান্তেই তা হাওয়া হয়ে গেছে।

জমা রসিদ দিলেও গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে না রেখে সেই অর্থ পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে অন্যের অ্যাকাউন্টে!

চট্টগ্রামে ইস্টার্ন ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংকের শাখায় ১৪টি ঘটনায় ১৪ গ্রাহকের আমানত আত্মসাৎ করে তিন ব্যাংকারের কোটিপতি বনে যাওয়ার প্রমাণ পেয়েছে দুদক।

দুদক জেলা কার্যালয়-১-এর উপপরিচালক লুৎফল কবির চন্দন বলেন, ইস্টার্ন ব্যাংকে টাকা জমার বিপরীতে ভুয়া কাগজ দিয়ে গ্রাহকের প্রায় ১৩ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় ১৩টি মামলা করে দুদক।

এরই মধ্যে ১১টি মামলায় আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। অন্য দুটি মামলার চার্জশিট শিগগির জমা দেওয়া হবে। দুই ম্যানেজারকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

দুদকের সহকারী পরিচালক আবু সাঈদ বলেন, তদন্তে অগ্রণী ব্যাংক কর্মকর্তা শাহ মো. ফজলে আজিমসহ চারজনের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়ায় আদালতে চার্জশিট দিয়েছি। তবে অভিযুক্ত আজিম পলাতক।

দুদকের চার্জশিটের বর্ণনায় বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের ১৫ মে ইস্টার্ন ব্যাংকে একটি প্রায়োরিটি অ্যাকাউন্ট খোলেন দুবাইপ্রবাসী সুফী মোহাম্মদ হোসেন গনি।

তিনি নগরীর চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার বি-ব্লক ৯ নম্বর রোডের ২২৫ নম্বর খান ভিলার বাসিন্দা।

তিনি ব্যাংকটির চান্দগাঁও শাখায় এক কোটি ৯৩ লাখ টাকার তিনটি এফডিআর করেন।

তাকে এর জমা রসিদ দেওয়া হলেও জালিয়াতি করে টাকা অন্য অ্যাকাউন্টে সরিয়ে নেওয়া হয়।

ব্যাংকের প্রায়োরিটি ম্যানেজার ইফতেখারুল কবির এই প্রতারণা করেন।

প্রবাসী গনির নামে একটি ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলেন ব্যাংকার ইফতেখারুল। সেই ভুয়া অ্যাকাউন্টে সরিয়ে ফেলা হয় এক কোটি ৯৩ লাখ টাকা।

২০১৯ সালের ৫ ফেরুয়ারি ইফতেখারুলের সহযোগিতায় তাদের প্রতারণা চক্রের সদস্য ফারজানা হোসেন ফেন্সী, জাকির হোসেন বাপ্পী ও আবদুল মাবুদ নগদে এবং তাদের অ্যাকাউন্টে এই টাকা সরিয়ে নেন।

গনির আত্মসাতের এ ঘটনায় ১২ আগস্ট আদালতে চার্জশিট দেয় দুদক। একইভাবে প্রবাসী গ্রাহক আলী করিমের এক কোটি ৫৯ লাখ টাকা মেরে দেয় চক্রটি।

নগরীর চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার বি-ব্লকের ১৩ নম্বর রোডের ৩০২ নম্বর খান ভিলার বাসিন্দা প্রবাসী আবুল মনসুর খানের দুই কোটি ৬৫ লাখ টাকাও আত্মসাৎ করেন তারা।

যেভাবে সামনে এলো ঘটনা: প্রবাসী ও স্থানীয় ১৩ গ্রাহকের ১৩ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন ইস্টার্ন ব্যাংকের ম্যানেজার ইফতেখারুল কবীর ও সামিউল সাহেদ চৌধুরী।

২০২০ সালের ১৪ অক্টোবর দুদকের পাঁচ কর্মকর্তা বাদী হয়ে আটজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে ১৩টি মামলা করেন।

তদন্তে তারা ১২ কোটি ৯৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৩৩ টাকা আত্মসাতের ঘটনায় পারস্পরিক যোগসাজশে জালিয়াতি, প্রতারণা, মিথ্যা নথি তৈরি, গ্রাহক ও ব্যাংককে মিথ্যা হিসাব বিবরণী দেওয়ার প্রমাণ পান।

দুদকের তদন্তে উঠে এসেছে, ২০১৬ সালের ১২ জুন কনা দে নামে এক গ্রাহক নগরীর চান্দগাঁও শাখায় একটি এফডিআর করেন।

২০২০ সালে তিনি ৬০ লাখ টাকার এফডিআরের বিপরীতে ঋণ সুবিধা নিতে ব্যাংকের ওআর নিজাম রোড শাখায় যোগাযোগ করলে তার এফডিআরের রসিদটি দেখে শাখা ম্যানেজার গোলাম মহিউদ্দীনের সন্দেহ হয়।

এরপর ম্যানেজার ব্যাংকের রেকর্ড ফাইল দেখে এটি নকল এফডিআরের রসিদ বলে গ্রাহককে জানান। তিনি কনা দেকে জানান, ওই সময় তার নামে কোনো এফডিআর ইস্যুই হয়নি।

বিস্তারিত আলাপ করে ম্যানেজার জানতে পারেন, কনা দের এফডিআর করেছিলেন ইফতেখারুল।

শুধু ইস্টার্ন ব্যাংকের ওআর নিজাম শাখাতেই নয়, একই কায়দায় চান্দগাঁও শাখা থেকেও গ্রাহকের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটে।

অগ্রণী ব্যাংকে জাল ডকুমেন্টে চার অ্যাকাউন্টে সরানো হয় অর্থ: অগ্রণী ব্যাংক চট্টগ্রাম নগরীর বহদ্দারহাট বিটি শাখার রেমিট্যান্স শাখার অফিসার ছিলেন খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার মাস্টারপাড়ার বাসিন্দা শাহ মো. ফজলে আজিম।

তিনি বিদেশ থেকে পাঠানো প্রবাসী সিরাজুল ইসলামের অর্ধকোটি টাকা জালিয়াতি করে প্রতারক চক্রের অন্য সদস্যের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরিয়ে নেন।

তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ২ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের আদালতে ব্যাংকার আজিমসহ চক্রের চার সদস্যের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয় দুদক। এখনও এ মামলার বিচার শুরু হয়নি।

চার্জশিটের বর্ণনায় বলা হয়, টাকা জমার ভুয়া রসিদ তৈরি করে ফজলে আজিম দফায় দফায় হামদে রাব্বীর অ্যাকাউন্টে ছয় লাখ টাকা, রিপায়ন বড়ূয়ার অ্যাকাউন্টে সাড়ে চার লাখ টাকা, রেজাত হোসেনের অ্যাকাউন্টে সাড়ে ১৩ লাখ টাকা, সফিক উল্লাহর অ্যাকাউন্টে ১৬ লাখ টাকা সরিয়ে তারা মিলেমিশে আত্মসাৎ করেন।

ব্যাংকের কাছে আজিম টাকা ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকার করলেও তিনি তা দেননি।

তিন ব্যাংকারের সিন্ডিকেটে যারা: ইস্টার্ন ব্যাংকের প্রতারক চক্রের সদস্যরা হলেন নগরীর সদরঘাট থানার পূর্ব মাদারবাড়ি, ৭৩ দারোগারহাট এলাকার আলমগীর কবিরের ছেলে ব্যাংকার ইফতেখারুল।

আরেক প্রতারক ম্যানেজার সামিউল নগরীর ২১/এ মোমিন রোড ঝাউতলা সাফিউল ইসলাম চৌধুরীর ছেলে।

তাদের সিন্ডিকেটে আছেন নগরীর দক্ষিণ খুলশী আবাসিক এলাকার বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান, পূর্ব মাদারবাড়ীর মাবুদ, লাবিবা বুটিকসের মালিক ফেন্সী, তার স্বামী বাপ্পী, আজম চৌধুরী ও খালেদ সাইফুল্লাহ।

অগ্রণী ব্যাংক কর্মকর্তা শাহ মো. ফজলে আজিমের প্রতারক চক্রে আছেন আনোয়ারা উপজেলার দুমরিয়া গ্রামের রেজাত হোসেন।

নগরীর ফিরোশ শাহ কলোনির আই-ব্লকের ৪৭ নম্বর বাসার হামদে রাব্বি ও রাউজানের কদলপুর গ্রামের রিপায়ন বড়ূয়া। দুদকের তদন্তে তাদের নাম উঠে এসেছে।

আপনার জন্য নির্বাচিত খবর

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও পড়ুন

যুক্ত হউন

1,000FansLike
1,000FollowersFollow
100,000SubscribersSubscribe

সর্বশেষ খবর