এবড়োখেবড়ো সড়কে নাকাল বাসিন্দারা

সরেজমিন ঢাকা উত্তর সিটির ৪০নং ওয়ার্ড পাকা সড়ক যেন মেঠোপথ * কোনো উন্নয়ন কাজই হয়নি

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৪০ নম্বর ওয়ার্ডের সড়কগুলো বেহাল। ইট, খোয়া ও পিচ উঠে পাকা সড়ক যেন মেঠোপথে পরিণত হয়েছে।

এবড়োখেবড়ো গর্তে ভরা সড়কে চলতে গিয়ে নাকাল হচ্ছেন এলাকাবাসী।

ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত হলেও নাগরিক সেবার মান বাড়েনি।

প্রকল্প অনুমোদনের কথা শুনিয়ে ছেলে ভোলানোর গল্পের মতো ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের আশ্বস্ত করছে ডিএনসিসি।

ভাটারা, সোলমাইদ ও নয়ানগর মৌজার সমন্বয়ে ৪০নং ওয়ার্ড গঠিত। এখানকার বেশির ভাগ সড়ক সরু।

এসব সড়কের পাশে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অনুমোদন ছাড়াই বহুতল ভবন গড়ে উঠছে। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই ভরাট করা হচ্ছে জলাভূমি।

প্রায় ৩০ বছরের ড্রেনেজব্যবস্থা এ এলাকার পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। এ কারণে বর্ষার মৌসুমে সামান্য বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে পুরো ওয়ার্ড।

এ এলাকার বাসিন্দাদের বেশির ভাগই দরিদ্র। ওয়ার্ডের বসুমতী, দাসের টেক বালুর মাঠ, সাঈদনগর ও নয়ানগর এলাকায় বস্তি গড়ে উঠেছে। সেখানে নিু আয়ের মানুষের বসবাস।

এ ওয়ার্ডে মাদানী অ্যাভিনিউ, বসুন্ধরা, নতুনবাজার এলাকা পড়েছে।

অভিজাত বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের কার্যালয়সহ বসুন্ধরার ব্লক-এ, ই, আই এবং সম্প্রসারিত ‘আই’ অংশে বেসরকারি উদ্যোগে উন্নয়ন হয়েছে।

এ কারণে এখানে কোনো নাগরিক দুর্ভোগ নেই। পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন কার্যক্রম হওয়ায় সড়ক ও ড্রেনগুলো প্রশস্ত। নানা শূন্যতার মধ্যেও এ ওয়ার্ডের ছোলমাইদ পূর্বপাড়ায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে মুক্তিযোদ্ধা তোরণ।

সেখানে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।

এ তোরণের ওপরে বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা মোজাম্মেল হকের ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। স্বাধীনতাপ্রেমী ও সংস্কৃতিমান নগরবাসী দূরদূরান্ত থেকেও এ ভাস্কর্য দেখতে যান।

ডিএনসিসির তথ্যমতে, নবগঠিত ৪০নং ওয়ার্ডের আয়তন ২ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা প্রায় ৪ লাখ, ভোটার ৪২ হাজার।

ওয়ার্ডে সেমিপাকা ও একতলা, দোতলা ভবনের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। আর তেতলা থেকে বহুতল ভবনের সংখ্যা হবে অন্তত এক হাজার।

এ ওয়ার্ডে উন্নয়ন কাজ না করায় ট্যাক্সও আদায় করছে না ডিএনসিসি। এজন্য ভবন ও দোকানপাটে কোনো হোল্ডিং নম্বরও পড়েনি।

নাগরিকত্ব সনদ ইস্যু করা ছাড়া কাউন্সিলরেরও তেমন কোনো ভূমিকা নেই। এলাকাবাসী ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করলে তিনি (কাউন্সিলর) জানান, প্রধানমন্ত্রী প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছেন।

শিগগিরই কাজ শুরু করা হবে। এসব কথা বলেই তিনি জনগণকে ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করেন। যদিও জনগণ ডিএনসিসি মেয়র ও কাউন্সিলরের ওপর চরম ক্ষুব্ধ।

যতই সময় গড়াচ্ছে, ততই তাদের ওপর ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ডিএনসিসির ৪০ নম্বর ওয়ার্ডের সিংহভাগ সড়ক ভাঙাচোরা। ইউনিয়ন পরিষদে থাকাবস্থায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশলের (এলজিইডি) তত্ত্বাবধানে এসব সড়কের উন্নয়ন কাজ হয়েছে।

কিন্তু এরই মধ্যে দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও সড়কের কোনো উন্নয়ন বা সংস্কার কাজ করা হয়নি।

২০১৬ সালের ৯ মে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি (নিকার) নাগরিক সেবা বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়ে রাজধানীর ১৬টি ইউনিয়নকে সিটি করপোরেশনভুক্ত করে।

এর মধ্যে আটটি ইউনিয়ন পড়েছে ডিএনসিসিতে। এসব এলাকা নিয়ে ১৮টি ওয়ার্ড গঠন করা হয়। ভাটারা ডিএনসিসির নতুন ওয়ার্ডের একটি।

প্রধানমন্ত্রীর সেবা বৃদ্ধির ঘোষণার কোনো বাস্তবায়ন না দেখে এলাকাবাসী ডিএনসিসির মেয়র ও কাউন্সিলরের আশ্বাসে আর আস্থা রাখতে পারছেন না।

সরেজমিন দেখা যায়, ওয়ার্ডের বেশির ভাগ সড়ক ১০ থেকে ১৬ ফুটের। এর চেয়েও সরু কিছু সড়ক রয়েছে। এছাড়া গুটিকয়েক সড়ক ২০ থেকে ২৫ ফুটের।

উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় এসব এলাকার সড়কগুলো প্রশস্ত করার চিন্তা ডিএনসিসির। এসব সড়ক ২০ ফুট বা ৪০ ফুট করে তৈরি করা হবে। এ এলাকায় কোনো খেলার মাঠ ও পার্ক নেই।

তবে যে কোনো মূল্যে খেলার মাঠ ও পার্ক করতে চান স্থানীয় কাউন্সিলর। এ বিষয়ে তিনি একটি প্রস্তাবনা ডিএনসিসিতে জমা দিয়েছেন।

ওয়ার্ডের ভাটারা গলি, ভাটারা হাইস্কুল রোড, হাজি দীন মোহাম্মদ খন্দকার রোড, ছোলমাইদ পূর্বপাড়া, আব্দুল লতিফ খন্দকার রোড, হাজি মো. আলী মার্কেট রোড এলাকা ঘুরে সড়ক, ড্রেনেজ ও অবকাঠামো উন্নয়নের করুণচিত্র লক্ষ করা গেছে।

শীত মৌসুম শুরু হওয়ায় এ এলাকার ধুলোবালির পরিমাণ বেড়ে গেছে। মানুষের চলাচল ও গাড়ি চলাচলে প্রচুর ধুলোবালি উড়ছে।

মাস্ক ছাড়া চলাচলে অসুস্থ হয়ে পড়ে এলাকাবাসী। এছাড়া ডিএনসিসির আবর্জনা পরিষ্কার, মশার ওষুধ ছিটানো, সৌন্দর্যবর্ধনসহ নাগরিক সেবার মৌলিক বিষয়গুলো থেকে বাসিন্দারা বঞ্চিত।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ইউনিয়ন পরিষদে থাকাকালে কিছুটা হলেও সেবা মিলত। এখন কোনো সেবাই পাচ্ছেন না তারা। কবে এলাকার উন্নয়ন হবে এবং দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে-এসবের কোনো উত্তর মিলছে না।

ছোলমাইদ পূর্বপাড়া এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মনিরুল ইসলাম বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ছোলমাইদ, ভাটারা ও নয়ানগর এলাকা সিটি করপোরেশনভুক্ত হওয়ায় কোনো সুফল মেলেনি।

বরং আগের চেয়ে নাগরিক সেবার মান কমেছে। বর্ষার মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতে পুরো এলাকা তলিয়ে যায়। সড়ক, ড্রেনেজ ও আবর্জনা পরিষ্কারের চিত্র বেহাল।

সিটি করপোরেশনভুক্ত হওয়ার পর পাঁচ বছর অতিবাহিত হলেও ন্যূনতম উন্নয়ন হয়নি। নাগরিক সেবা যেন সোনার হরিণে পরিণত হয়েছে।

আব্দুল লতিফ খন্দকার রোডের বাসিন্দা ইমরান হোসেন বলেন, অবহেলা ও ভোগান্তির কোনো উদাহরণ দিতে চাইলে এ এলাকাকে বেছে নেওয়া হবে চমৎকার।

পরিকল্পিত উন্নয়ন ও নাগরিক সেবা বৃদ্ধির কথা বলে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সিটি করপোরেশনভুক্ত করা হলেও বাস্তবে কোনো সেবাই মিলছে না।

কবে উন্নয়ন ও সেবা মিলবে, তারও কোনো জবাব দিতে পারছেন না জনপ্রতিনিধিরা। জনগণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিও সমস্যা সমাধানের প্রকাশ্য দাবি তোলেন।

এ প্রসঙ্গে ৪০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ঢালী বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সিটি করপোরেশনভুক্ত হওয়ার পর এ ওয়ার্ডে এখনো উল্লেখ করার মতো কোনো উন্নয়ন হয়নি।

তবে ডিএনসিসি এলাকার নতুন ওয়ার্ডের উন্নয়নের লক্ষ্যে ৪ হাজার ২৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে।

করোনাভাইরাস মহামারি না হলে এতদিনে কাজ শুরু হয়ে যেত। তিনি জানান, মেয়রের সঙ্গে তার কথা হয়েছে।

ডিসেম্বরের মধ্যেই উন্নয়ন কাজ শুরু করা হবে বলে তিনি (মেয়র) জানিয়েছেন।

সূত্রঃযুগান্তর

আপনার জন্য নির্বাচিত খবর

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও পড়ুন

যুক্ত হউন

1,000FansLike
1,000FollowersFollow
100,000SubscribersSubscribe

সর্বশেষ খবর