শুধু নেই আর নেই আশ্বাসই ভরসা

সরেজমিন ঢাকা উত্তর সিটির ৫০নং ওয়ার্ড, চলে সংস্কার-সংস্কার খেলা * খেলার মাঠ, পার্ক, পাবলিক টয়লেট নেই * স্বাস্থ্যসেবাবঞ্চিত নাগরিকরা * অনেক প্রতিশ্রুতিই বাস্তবায়ন করতে পারিনি : ওয়ার্ড কাউন্সিলর

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৫০নং ওয়ার্ড শুধু নামেই। এখানে খেলার মাঠ ও পার্ক, পাবলিক টয়লেট এমনকি স্যুয়ারেজ সিস্টেম পর্যন্ত নেই।

রাস্তা ভাঙাচোরা, একটি রাস্তায়ও সড়কবাতি নেই। রাস্তায় দিনের পর দিন পানি জমে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের সৃষ্টি করছে। একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রও নেই।

এখানকার নাগরিকদের বসবাস শুধু নেই আর নেই-এর মধ্যে। ৫০নং ওয়ার্ড (মোল্লারটেক, ইরশাল ও আজমপুর) সরেজমিন ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

জনপ্রতিনিধিরা বলেছেন, জনবলের অভাব ও বাজেট সংকটের পরও তারা নাগরিক চাহিদা পূরণে যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন।

আগামী ফেব্রুয়ারির দিকে নতুন প্রকল্পের কাজ শুরু হলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে। তবে তাদের কথায় আস্থা রাখতে পারছেন না ওয়ার্ডবাসী।

তারা বলেন, দীর্ঘদিন শুধু আশ্বাসই দেওয়া হচ্ছে। কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।

সম্প্রতি সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, মোল্লারটেকের রাস্তায় লোকজন নাক চেপে কোনো রকমে হেঁটে যাচ্ছেন। রাস্তায় দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা পানিতে দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়েছে।

পানির পচা দুর্গন্ধে আশপাশের ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ। কয়েকটি দোকানের সামনের ড্রেন থেকে মাটি তোলা হলেও তা সরিয়ে নেওয়া হয়নি।

ফলে সামান্য বৃষ্টি হলেই পাঁকের (কাদা) সৃষ্টি হচ্ছে। এ পাঁক মাড়িয়েই লোকজনকে কোনো মতে যেতে হচ্ছে।

এলাকার বিভিন্ন ড্রেনের মাটি প্রায় ছয় মাস তোলা হয়েছে। মাটি সরিয়ে না নেওয়ায় জনদুর্ভোগ বেড়েছে।

উদয়ন স্কুল রোডের মাথায় সংস্কার কাজের কিছুটা নমুনা চোখে পড়ে। এখানে কাঠ ও সিমেন্ট দিয়ে একটি বক্সের মতো করে রাখা হয়েছে। সেটিও বেশ কয়েকদিন আগের।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্থানীয় সংসদ সদস্যের আসার কথা থাকায় এ সংস্কার নাটকের আয়োজন করা হয়। এখানে নাকি প্রায়ই এরকম ঘটনা ঘটে।

৫০নং ওয়ার্ডের হাওয়াই রোড ভাঙাচোরা। এখানে জলাবদ্ধতাও আছে। একটু বৃষ্টি হলেই বিভিন্ন সড়কে পানি জমে যায়।

বৃষ্টি হলে মুক্তিযোদ্ধা রোড, জামতলা রোড, ব্রাইটসান স্কুলের সামনে, মুন্সি মার্কেট রোড, ফরিদ মার্কেট রোড, ইরশাল কলোনি, গাওয়াইর নবীন সংঘ রোডের মাথা, ইরশাল কলোনি মাঠের পূর্বপাশসহ বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।

আবার কোথাও কোথাও বৃষ্টি ছাড়াই স্যুয়ারেজের পানি জমে যায়।

স্থানীয় বাসিন্দা আতিকুর রহমান বলেন, ১৯৯৩ সালের দিকে মোল্লারটেক মোড়ে ট্রাফিক থাকত। কিন্তু এখন ট্রাফিক থাকে না।

এ কারণে প্রায়ই ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটছে। এ এলাকা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) তত্ত্বাবধানে থাকার সময় এখানকার রাস্তাগুলো নিয়মিত ঝাড়ু দেওয়া হতো।

তখন রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকত। কিন্তু এখন ঝাড়ুদার চোখেই পড়ে না। রাস্তার ময়লা নিয়মিত সরানো হয় না। দিনের পর দিন পড়ে থাকে। এতে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।

স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নুরু মিয়া বলেন, শুধু আশ্বাসই শুনছি। কিন্তু কাজের কাজ তো কিছুই হচ্ছে না। বর্তমান কাউন্সিলর দুইবার নির্বাচিত হয়েছেন।

নির্বাচনের আগে তিনি যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সেগুলোর একটিরও বাস্তবায়ন নেই। একই মন্তব্য করেন এলাকার আরজু ও আউয়ালসহ আরও অনেকে।

তারা জানান, এ ওয়ার্ডে একটিমাত্র খেলার মাঠ আছে। সেটি সিভিল অ্যাভিয়েশনের হওয়ায় সাধারণ ছেলেরা সেখানে খেলতে পারে না। কোনো পার্ক না থাকায় শিশুরা বিনোদন করতে পারছে না।

বয়স্ক মানুষজনও সকাল-বিকাল হাঁটাহাঁটি করতে পারছেন না। সিটি করপোরেশনের কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র না থাকায় স্বল্পমূল্যে চিকিৎসাসেবা থেকে ওয়ার্ডের সাধারণ নাগরিকরা বঞ্চিত হচ্ছে।

উদয়ন স্কুলের একাধিক শিক্ষার্থী জানান, স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে প্রায় সময় তাদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। রাস্তায় পানি জমে থাকায় হেঁটে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

অনেক সময় জুতা ও পোশাক ভিজে যায়। বৃষ্টির দিনে রাস্তায় চলা যায় না। এ অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চললেও দেখার কেউ নেই।

ওয়ার্ড কাউন্সিলর ডিএম শামীম বলেন, এর আগে মোল্লারটেক মোড়ের রাস্তায় স্লাব বসানো হয়েছিল।

কিন্তু এ রাস্তা দিয়ে বড় বড় গাড়ি ওভারলোড নিয়ে চলায় স্লাবগুলো ভেঙে গেছে। সংস্কারকাজ শুরু করেছি। নতুন স্লাব তৈরিও হয়েছে। এখন সেগুলো বসানো হবে।

জনগণ ভালোবেসে আমাকে বারবার নির্বাচিত করেছে। নির্বাচনের আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, সেসব আমি পূরণ করতে পারছি না। তবে প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।

কাউন্সিলর শামীম বলেন, গত অর্থবছরে ২ কোটি ২৬ লাখ টাকার বাজেট পেয়েছিলাম। সেটি দিয়ে নয়টি রাস্তা হেরিংবন্ড করেছি। জেলা পরিষদ থেকে বরাদ্দ নিয়ে উদয়ন স্কুলের সামনে এবং মুক্তিযোদ্ধা রোড আরসিসি করা হয়েছে।

এ রোডে পানি জমে থাকা বন্ধ করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ড্রেন পরিষ্কার করা হচ্ছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ ইট, খোয়া, বালুর অবশিষ্ট অংশ ফেলে রেখে সব ড্রেন বন্ধ করে ফেলেছে।

এলাকাবাসীর মধ্যে সচেতনতার কোনো বালাই নেই। সিটি করপোরেশনই সবকিছু করবে-এমন ধারণা ঠিক নয়। নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাস্তার জলাবদ্ধতা নিরসনে ওয়াসাকে অনুরোধ করেছি। এর আগে প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে কালভার্ট নির্মাণ করেছি।

কোথায়ও কোথাও ড্রেন করে ওপরে স্লাব বসানো হয়েছে। যাতে জনসাধারণ ওপর দিয়ে চলাচল করতে পারে। তবে আগের অনেক ড্রেন দখল করে বাড়ি তৈরি করা হয়েছে।

মানুষ ড্রেনের জন্য তাদের জমি দিতে চায় না। এরকম নানা সমস্যা আছে।

এক প্রশ্নের জবাবে ওয়ার্ড কাউন্সিলর শামীম বলেন, সরকারি খাসজমি উদ্ধার করে খেলার মাঠ ও পার্ক তৈরি, পাবলিক টয়লেট স্থাপন, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং সরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা সরকারের কাছে জমা দেওয়া আছে।

তিনি বলেন, নতুন ১৮টি ওয়ার্ডের জন্য অনুমোদিত প্রকল্পের কাজ আগামী ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এটি হলে রাস্তা উন্নত হবে। সড়কবাতি থাকবে। নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

কাউন্সিলর শামীম আরও জানান, লোকবলের ওভাবে ওয়ার্ডের বাড়িগুলোয় হোল্ডিং নম্বর দিতে পারছি না। ফলে ট্যাক্সও সংগ্রহ করা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, এ এলাকাকে মাদকমুক্ত করতে কাজ করছি। প্রায় ৭০ ভাগ এলাকা মাদকমুক্ত করতে পেরেছি।

৪৯, ৫০ ও ৫১নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর জাকিয়া সুলতানা বলেন, আমরা যতই চেষ্টা করি না কেন, কোনো লাভ নেই।

বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ এবং লোকবল সংকট দূর করা না হলে কিছুই করা যাচ্ছে না। ব্যক্তি উদ্যোগে কিছু কিছু কাজ করা হচ্ছে।

কিন্তু সেগুলো তো কাজের কাজ নয়। তিনি বলেন, পুরো ওয়ার্ডের স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে।

তবে আশা করছি, নতুন প্রকল্প এলে এসব সমস্যার অনেকটাই সমাধান হয়ে যাবে।

সূত্রঃযুগান্তর

আপনার জন্য নির্বাচিত খবর

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও পড়ুন

যুক্ত হউন

1,000FansLike
1,000FollowersFollow
100,000SubscribersSubscribe

সর্বশেষ খবর