আমজাদ হোসেনের ঋণ জালিয়াতি: চার দেশে বিপুল অর্থ পাচার

সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এসএম আমজাদ হোসেন চার দেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করেছেন।

আমেরিকা, রাশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ভারতে একাধিক বাড়ি, গাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন।

ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি এই টাকা আত্মসাৎ করেন। চারটি দেশের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য। প্রতিবেদনগুলো দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পৌঁছেছে।

আমজাদ হোসেনের বিরুদ্ধে দুদকে নতুন করে ৪৩০ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির আরেকটি অভিযোগ এসেছে। শুরু হয়েছে এর অনুসন্ধান।

এ পর্যায়ে আমজাদ হোসেনের বিরুদ্ধে ৯ কর্মচারীর নামে ২৫ কোটি টাকা ঋণ তুলে আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

এখন অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে মামলার জোর প্রস্তুতি চলছে। এদিকে বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আমজাদ হোসেন ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ৯৩৫টি ব্যাংক হিসাব ফ্রিজের (অবরুদ্ধ) আদেশ দিয়েছেন আদালত।

দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পরিচালক মো. গুলশান আনোয়ার প্রধানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ কেএম ইমরুল কায়েশ ওই অ্যাকাউন্টগুলো ফ্রিজের আদেশ দিয়েছেন। দুদক সূত্র যুগান্তরকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

জানতে চাইলে দুদক কমিশনার ড. মোজাম্মেল হক খান যুগান্তরকে বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই আমজাদ হোসেন ও অন্যদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।

ইতোমধ্যেই ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ ও মানি লন্ডারিংয়ের অপরাধে একটি মামলাও হয়েছে। এমতাবস্থায় স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ফ্রিজ ও ক্রোকের আবেদনসহ নানা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা তদন্তকারী কর্মকর্তা গ্রহণ করবেন।

বিদেশে অর্থ পাচার ও ঋণ জালিয়াতির বিভিন্ন বিষয়ে জানতে আমজাদ হোসেনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।

৯৩৫টি ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ: আমজাদ হোসেন ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ৯৩৫টি ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করা হয়েছে। তবে অধিকাংশ হিসেবেই বর্তমানে টাকা নেই।

হিসাবগুলোর মধ্যে ৬৭৯টিতে ব্যালেন্স শূন্য। বাকি ২৫৬টি অ্যাকাউন্টে জমা ৫৫ কোটি টাকা ফ্রিজ করা হয়েছে। শূন্য এসব অ্যাকাউন্টের প্রতিটিতেই কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে।

শতকোটি টাকার ওপর লেনদেন হয়েছে এমন অ্যাকাউন্টের সংখ্যাও অনেক।

চার দেশে অর্থ পাচারের প্রমাণ দুদকের হাতে : বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে (বিএফআইইউ) আমজাদ হোসেনের বিদেশে অর্থ পাচারের তথ্য চেয়ে চিঠি দেয় দুদক।

এই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বিএফআইইউ আমেরিকা, কানাডা, দুবাই, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, রাশিয়া, সিঙ্গাপুর ও জাপানসহ বেশ কয়েকটি দেশের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে চিঠি দেয়। এতে আমজাদ হোসেনের অর্থ পাচার সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়।

এসব দেশের মধ্যে আমেরিকা, রাশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ভারতের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট তাদের জবাব বিএফআইউর কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে, যা বিএফআইইউ ইতোমধ্যেই দুদকের কাছে হস্তান্তর করেছে।

গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, আমেরিকায় আমজাদ হোসেনের পাঁচটি বাড়ি ও গাড়িসহ একাধিক ব্যাংকে বড় অঙ্কের বিনিযোগ রয়েছে।

রাশিয়ার কয়েকটি ব্যাংকে বড় অংকের টাকা জমা রয়েছে তার। আর সিঙ্গাপুরেও রয়েছে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ।

এ ছাড়া ভারতের কলকাতায় আজমাদ হোসেনের একটি চিংড়ি রফতানি প্রসেসিং কোম্পানি রয়েছে। সেখানে তার বড় অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে।

এর আড়ালে তিনি অর্থ পাচার করেছেন। ইমিগ্রেশনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আমজাদ হোসেন বছরজুড়েই কলকাতা, দুবাই, আমেরিকা ও সিঙ্গাপুর ঘনঘন যাতায়াত করতেন, যা স্বাভাবিক যাতায়াত নয় বলে বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

৪৩০ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির নতুন অভিযোগ : আজমাদ হোসেন চক্রের বিরুদ্ধে বড় ধরনের ঋণ জালিয়াতির আরেকটি অভিযোগ দুদকে এসেছে।

এতে জনতা ব্যাংক, এসবিএসি ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে ঋণের নামে ৪৩০ কোটি টাকা আত্মসাতের কথা বলা হয়েছে।

পুরাতন অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত করে এটি অনুসন্ধানের জন্য দুদকের উপ-পরিচালক মো. গুলশান আনোয়ার প্রধানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংক ও জনতা ব্যাংকে চিঠি দিয়ে অভিযোগের বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়েছে। কিছু কাগজপত্রও দুদকের হাতে এসেছে।

কর্মচারীর নামে ২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ: দুদকে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া তথ্যানুসারে ৯ জন কর্মচারীর নামে ঋণ তুলে ২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন আমজাদ হোসেন।

সিকিউরিটি অভার ড্রাফ্ট (এসওডি) ঋণের নামে ওই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। কর্মচারীদের নামে ঋণ নিলেও ঋণের অর্থ আমজাদ হোসেন ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়েছে।

মডগেজের বিপরীতে ৮০ শতাংশ ঋণের নিয়ম থাকলেও এ ক্ষেত্রে ৫০০ শতাংশ ঋণ দেওয়া হয়েছে।

এ জালিয়াতির প্রধান সহায়ক ছিলেন সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের (এসবিএসি)খুলনা ব্রাঞ্চের সাবেক ম্যানেজার ইকবাল মেহেদী।

এর আগে তিনি সোনালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পদে চাকরি করেছেন। ঋণ জালিয়াতির অভিযোগের মুখে সেখান থেকে মেহেদীকে নিজ ব্যাংকে বড় পদে নিয়োগ দেন আমজাদ হোসেন।

ফলে প্রধান কার্যালয় ও বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া ঋণ দেওয়া থেকে শুরু করে মেহেদী সব ধরনের সুবিধা আমজাদ হোসেনকে দিয়েছেন।

দুদকের অনুসন্ধানেও অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে মামলা করার জোর প্রস্তুতি চলছে।

এ ছাড়া খুলনা বিল্ডার্স লিমিটেড নামে কাগুজে প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে আমজাদ হোসেনের ২০ কোটি ৬০ লাখ টাকা উত্তোলনপূর্বক আত্মসাতের প্রধান সহযোগীও ছিলেন ওই ইকবাল।

ওই অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গত ২১ অক্টোবর আমজাদ ও ইকবালসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

চলতি বছরের মাঝামাঝি আমজাদ হোসেনের বিরুদ্ধে ঋণ জালিয়াতিসহ দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।

অভিযোগ অনুসন্ধানে গত ১৯ আগস্ট দুদকের উপ-পরিচালক মো. গুলশান আনোয়ার প্রধানকে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা হিসাবে নিয়োগ করে কমিশন।

সূত্রঃযুগান্তর

আপনার জন্য নির্বাচিত খবর

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও পড়ুন

যুক্ত হউন

1,000FansLike
1,000FollowersFollow
100,000SubscribersSubscribe

সর্বশেষ খবর