নিরব কারাগারে, অন্যরা অধরা

ই-কমার্সে তারকাদের ভূমিকা, চলতি মাসের শুরুতেই নিরব চাকরি ছেড়ে দেন, তিনি কোনো অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত নন- স্ত্রী লাবণ্য লিজা

সংসদ সদস্য ও জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন-মুর্তজাসহ ই-কমার্স কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক সেলিব্রেটি বা তারকা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।

কিউকমের সঙ্গে জড়িত থাকায় আরজে নিরব গ্রেফতার হলেও অন্যরা ধরাছোঁয়ার বাইরে।

অথচ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জের শুভেচ্ছাদূত ছিলেন মাশরাফি। ইভ্যালির প্রচারণায় যুক্ত ছিলেন মডেল-অভিনেত্রী শবনম ফারিয়া এবং জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী তাহসান।

সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন- আরজে নিরব কারাগারে থাকলে অন্য প্রচারকরা কেন অধরা থাকবেন?

যদি অন্যদের গ্রেফতার করা না হয়, তাহলে আরজে নিরবকেও ছেড়ে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

নিরবের স্ত্রী অভিনেত্রী লাবণ্য লিজা তাকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, চলতি মাসের শুরুতেই নিরব চাকরি ছেড়ে দেন।

তিনি কোনো অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত নন। তারপরও তাকে গ্রেফতার হতে হয়েছে। নিরবের সহপাঠীরা বলেন, শুধু নিরবই নন অন্য সেলিব্রেটিরাও বিভিন্ন ই-কমার্সের প্রচারণায় যুক্ত ছিলেন।

তাদের কিছু হচ্ছে না। অথচ আইনি মারপ্যাঁচে জেলের ঘানি টানতে হচ্ছে নিরবকেই।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সেলিব্রেটি বা তারকাদের নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে এক ধরনের দুর্বলতা কাজ করে। আর জনপ্রিয়তায় তুঙ্গে অবস্থান করা তারকা হলে তো আর কথাই নেই।

তারকা খেলোয়াড়, জনপ্রিয় কোনো শিল্পী বা অভিনেতা-অভিনেত্রী কোনো পণ্যের প্রচারণায় থাকলে অনেকটা যাচাই-বাছাই ছাড়াই সেই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মাঝে ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়।

আর সেই টার্গেট নিয়েই ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, কিউকমসহ বেশ কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান মাশরাফি-বিন-মুর্তজা, আরজে নিরব, তাহসান খান, শবনম ফারিয়াদের মতো সেলিব্রেটিদের তাদের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করে।

দেশের আলোচিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালিতে ১ জুন জনসংযোগ, মিডিয়া ও কমিউনিকেশনস প্রধান হিসাবে যুক্ত হন শবনম ফারিয়া। এর আগে ১০ মার্চ ‘ফেস অব ইভ্যালি’ নির্বাচিত হন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী তাহসান।

পাশাপাশি ‘চিফ গুডউইল অফিসার’ হিসাবে নিয়োগ পান তাহসান। তিনি দুই বছরের জন্য ইভ্যালি ডটকম ডটবিডির ‘ফেস’ হয়ে থাকবেন বলে চুক্তিবদ্ধ হন।

সে সময় তাহসান বলেছিলেন, ‘আমি বিলিভ (বিশ্বাস) রাখি ইভ্যালিতে। আমি বিশ্বাস করি যে, ইভ্যালি একদিন গ্লোবাল ব্র্যান্ডে পরিণত হবে।’ তাহসান খান ও শবনম ফারিয়ার কাছে ইভ্যালির গুণগান শুনে তাদের অনেক ভক্ত-শুভাকাঙ্ক্ষী পণ্য কিনতে আগ্রহী হন।

আর পরে গ্রাহকরা প্রতারণার শিকার হন। এদিকে ইভ্যালির বিরুদ্ধে ৪০৭ কোটি ১৮ লাখ টাকা দেনার অভিযোগ উঠে। এরপর ১৬ সেপ্টেম্বর ইভ্যালির সিইও মোহাম্মদ রাসেল ও তার স্ত্রী শামীমার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গুলশান থানায় একটি মামলা হয়।

আরিফ বাকের নামে ইভ্যালির এক গ্রাহক মামলাটি করেন। মামলাটি হওয়ার পর ওইদিন বিকালেই ইভ্যালির সিইও মোহাম্মদ রাসেল ও তার স্ত্রী প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিনকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসায় অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করে র‌্যাব।

তারা গ্রেফতার হওয়ার পর পণ্যে বিনিয়োগ করা টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে গ্রাহকরা অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।

যে তারকাদের ভালোবাসায় ইভ্যালি থেকে গ্রাহকরা পণ্য কিনতে আগ্রহী হয়েছিলেন সেই চিফ গুডউইল অফিসার তাহসান এবং জনসংযোগ কর্মকর্তা ফারিয়া বিষয়টি নিয়ে নিশ্চুপ রয়েছেন।

তাদের অবস্থা অনেকটা গা ঢাকা দিয়ে থাকার মতো।

অনলাইন ভিত্তিক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জের শুভেচ্ছাদূত ছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও জাতীয় সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মুর্তজা।

ই-অরেঞ্জের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের ১১শ কোটি টাকা প্রতারণার অভিযোগ ওঠে। প্রতিষ্ঠানটির মালিকের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় মামলা হয়। ওই মামলায় ১৭ আগস্ট ই-অরেঞ্জের মালিক সোনিয়া মেহজাবিন ও তার স্বামী মাসুকুর রহমান ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করেন।

আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এছাড়া ই-অরেঞ্জের চিফ অপারেটিং অফিসার আমান উল্লাহও গ্রেফতার হন।

এদিকে ই-অরেঞ্জের গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের অভিযোগের মধ্যে দেশ ছেড়ে পালিয়ে ৩ সেপ্টেম্বর ভারত-নেপাল সীমান্তে বিএসএফের হাতে আটক হন বনানী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সোহেল রানা।

তিনি ই-অরেঞ্জের মালিক সোনিয়া মেহজাবিনের আপন ভাই ও প্রতিষ্ঠানটির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

সোহেল রানাকে ভারত থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য দেশটির ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোকে (এনসিবি) এরই মধ্যে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মাশরাফি বিন মুর্তজা ই-অরেঞ্জের শুভেচ্ছাদূত হিসাবে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পরেই গ্রাহকরা অনেকটা হুমড়ি খেয়ে পড়েন।

মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন পণ্য আকর্ষণীয় অফার দিয়ে বিক্রি করা হলেও গ্রাহকদের পণ্য দেয়নি ই-অরেঞ্জ। এভাবে গ্রাহকের ১১শ কোটি টাকা হাতিয়েছে তারা।

তবে মাশরাফি বিন মুর্তজা দাবি করছেন, ই-অরেঞ্জের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠার আগেই তার চুক্তি শেষ হয়েছে।

আইন ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, চুক্তি শেষ হলেও কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারেন না মাশরাফি। কারণ, তিনি শুভেচ্ছাদূত হওয়ার পরই ই-অরেঞ্জ ব্যাপকভাবে প্রচার লাভ করে।

আর এই সুযোগে প্রতিষ্ঠানটি দেদার হাতিয়ে নেয় গ্রাহকদের মোটা অঙ্কের টাকা। বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি মাশরাফি বিন মুর্তজা মিরপুরের বাসার সামনে গ্রাহকরা বিক্ষোভও করেছেন।

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সোমবার মাশরাফি বিন মুর্তজার মোবাইলে একাধিকবার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার ফোন নম্বরটি বন্ধ ছিল।

এর আগে মাশরাফি বিন মুর্তজা গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে দাবি করেছিলেন, অনেক আগেই ই-অরেঞ্জের সঙ্গে তার চুক্তি শেষ হয়ে গেছে।

প্রতারণার অভিযোগ ওঠার পর তিনি ই-অরেঞ্জের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের মামলায় সহায়তা করেছেন।

এদিকে যোগাযোগ করা হলে তাহসান খান বলেন, আমি ফেব্রুয়ারিতে ইভ্যালিতে যোগদান করেছিলাম। কিভাবে কার চাপে পড়ে যোগদান করি, তা এখন বলতে চাই না।

আমাকে তো এ দেশে থাকতে হবে, আমাকে তো বাঁচতে হবে। তিনি বলেন, আপনারা খোঁজ নিয়ে দেখেন আমি আমার ক্যারিয়ারে কোনো ধরনের ক্রাইম করিনি।

গত কয়েক মাস ধরে আমাকে নিয়ে নানা ধরনের নিউজ হচ্ছে। আমি মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে পারছি না। তিনি বলেন, ইভ্যালিতে যোগদানের পর কোনো একটা বিজ্ঞাপনও করিনি।

তবুও আমাকে নিয়ে টানা-হ্যাঁচড়া হচ্ছে। তিনি বলেন, সিআইডি একটি ব্রিফিং শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছে, প্রয়োজন হলে, সেলিব্রেটিদের ডাকা হবে।

অথচ গণমাধ্যমে খবর এসেছে আমাকে আইনের আওতায় আনা হবে। এ ধরনের নিউজ সত্যিই দুঃখজনক।

শবনম ফারিয়ার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। ফোনে রিং হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

গত কয়েক মাসে ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, রিংআইডিসহ এক ডজনেরও বেশি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

যেসব ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান প্রতারণাসহ বিভিন্ন অনিয়মে জড়িত তাদের একটি তালিকা তৈরি শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি ইমাম হোসেন বলেছেন, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সিআইডিও ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের প্রতারণা নিয়ে কাজ শুরু করেছে।

কাজ করতে গিয়ে দেখা গেছে, কিছু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের টাকা নিয়ে পণ্য ডেলিভারি না দিয়ে দিনের পর দিন কাটিয়ে দিচ্ছে।

এ অবস্থায় ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ করেছেন। এমন অভিযোগের ভিত্তিতে সম্প্রতি কিছু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের মালিকসহ কর্মকর্তাদেরও গ্রেফতার করা হয়।

অভিযোগের ভিত্তিতে ও সিআইডির নিজস্ব অনুসন্ধানে ৬০টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের সংক্ষিপ্ত তালিকা করা হয়েছে। ৬০টির মধ্যে ৩০ থেকে ৩২টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানকে নজরদারিতে রেখেছে সিআইডি।

সূত্রঃযুগান্তর

আপনার জন্য নির্বাচিত খবর

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও পড়ুন

যুক্ত হউন

1,000FansLike
1,000FollowersFollow
100,000SubscribersSubscribe

সর্বশেষ খবর