বুধবার, অক্টোবর ২৭, ২০২১

মুকতাদি ইমামের সঙ্গে না, পরে সালাম ফেরাবে?

প্রশ্ন: ইমামের সঙ্গে নামাজ আদায়কারীরা নামাজ শেষে কখন কীভাবে সালাম ফেরাবে?

উত্তর: কোনো ব্যক্তি যখন নামাজে কারও পেছনে ইকতিদা (অনুসরণ) করে; তখন সে নামাজের আমলগুলো ইমামের অনুসরণে তথা তার পেছনে পেছনে করা ওয়াজিব। আগে করা মাকরুহে তাহরিমি। তবে সেটি ঠিক কীভাবে হবে; এ নিয়ে ফকিহদের বিভিন্ন মত রয়েছে।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তার সমমনা ফকিহদের মত হলো— ইমামের সঙ্গে সঙ্গে আমলগুলো আদায় করবে। অর্থাৎ ইমাম যখন কোনো আমল করতে শুরু করে, মুকতাদিও সেটি করতে শুরু করবে। এটিকে আরবিতে المتابعة علي وجه المقارنة বলা হয়।

পক্ষান্তরে অন্যান্য ইমামের মত হলো— সঙ্গে সঙ্গে নয়; বরং ইমাম যখন এ আমলে পৌঁছে যাবে, তার পর মুকতাদি আমলে যাওয়া শুরু করবে। এটিকে আরবিতে المتابعة علي وجه المعاقبة বলা হয়।

ফকিহদের এ মতবিরোধ মূলত এ সংক্রান্ত হাদিসগুলো ব্যাখ্যা ও সমন্বয়ে তারতম্যের কারণে হয়েছে। নিজস্ব মত থেকে নয়।

যেমন ইমাম আবু হানিফা (রহ.) মনে করেন— হাদিসে বর্ণিত إِنَّمَا جُعِلَ الْإِمَامُ لِيُؤْتَمَّ بِهِ، فَإِذَا صَلَّى قَائِمًا فَصَلُّوا قِيَامًا، وَإِذَا رَكَعَ فَارْكَعُوا، وَإِذَا رَفَعَ فَارْفَعُوا،

হাদিসটিতে ‘ফা’ (ف) হরফটি তা’কিব তথা সঙ্গে সঙ্গে বা পর পরই আদায় করা বোঝানোর জন্য এসেছে। এখানে বিলম্ব করার সুযোগ নেই।

সম্পূর্ণ হাদিসটি ও তার তরজমা এমন— আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত: একদা রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোড়ায় সওয়ার হন এবং ঘোড়ার পিঠ থেকে নিচে পড়ে গিয়ে তিনি ডান পাঁজরে ব্যথা পান। ফলে তিনি কোনো এক ওয়াক্তের নামাজ বসে আদায় করেন। আমরাও তার পেছনে বসে নামাজ আদায় করলাম।

নামাজ শেষে তিনি বললেন— ইমাম এ জন্যই নিয়োগ করা হয়, যেন তার অনুসরণ করা হয়। ইমাম দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করলে তোমরাও তখন দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করবে। ইমাম রুকু করলে তখন তোমরাও রুকু করবে। ইমাম মাথা উঠালে তোমরাও তখন মাথা উঠাবে।

আর ইমাম ‘সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ’ বললে তোমরা বলবে, ‘রাব্বানা লাকাল হামদ’। আর ইমাম বসে নামাজ আদায় করলে তোমরা সবাই বসে নামাজ আদায় করবে। (সুনানে আবু দাউদ- হাদিস নং ৬০১, হাদিসটি সহিহ)

পক্ষান্তরে অন্যান্য ইমাম নিম্নোক্ত হাদিসকে তাদের মতের পক্ষে দলিল হিসাবে উল্লেখ করেন: মুয়াবিয়া ইবনু আবু সুফিয়ান (রা.) থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— আমার পূর্বে তোমরা রুকু ও সেজদা করবে না। আমি যখন তোমাদের পূর্বে রুকুতে যাব এবং তোমাদের পূর্বে (রুকু হতে) মাথা তুলব, তখন তোমরা আমার অনুসরণ করবে। কেননা আমি তো এখন কিছুটা ভারি (স্থুল) হয়ে গেছি। (সুনান আবু দাউদ: হাদিস নং- ৬১৯)

এ জন্য বহু সাহাবা (রা.) নবীজি যখন রুকুতে বা সিজদাতে পৌঁছে যেতেন; তখন তারা যথাক্রমে রুকু ও সেজদায় যেতেন।

এ হাদিসের ব্যাপারে হানাফি ফকিহদের ব্যাখ্যা হলো— এটি নবীজি (সা.) এক বিশেষ ওজরের কারণে বলেছেন; বৃদ্ধ বয়সে যখন তার শরীর মুবারক ভারি হয়ে গিয়েছিল, তিনি তখন ধীরে ধীরে নামাজের রুকনগুলো আদায় করতেন। যুবক ও শক্তিমানরা যেন তার আগে রুকু-সেজদা না করে ফেলে; সে জন্য তিনি তার সঙ্গে আমলে যেতে বারণ করেছেন।

তাদের আরেকটি ব্যাখ্যা হলো— এ হাদিসে ইমামের আগে যেতে বারণ করা হয়েছে; সঙ্গে যেতে বারণ করা হয়নি। আর ইমামের আগে মুকতাদি যাওয়া কোনোভাবেই জায়েজ নয়, এ ব্যাপারে হানাফি ফকিহদের দ্বিমত নেই।

মোটকথা— ইমামের পেছনে পেছনে মুকতাদি রুকনগুলো আদায় করুক, অথবা পরে আদায় করুক উভয়টি সুন্নাহসম্মত।

প্রশ্নে বর্ণিত সালাম ফেরানোর মাসআলাটিও অনুরূপ। আপনি যদি ফিকহে হানাফি অনুসরণ করে থাকেন, তা হলে আপনি ইমামের পেছনে পেছনে সালাম ফেরাতে থাকবেন। যখন তিনি ডান দিকে সালাম ফেরাবেন, আপনিও সেদিকে সালাম ফেরাবেন । আর যখন তিনি বাম দিকে সালাম ফেরাবেন, তখন আপনি বাম দিকে সালাম ফেরাবেন।

কিন্তু আপনি যদি অন্য কোনো ফিকহের অনুসারী হন, তা হলে ইমাম সম্পূর্ণ সালাম শেষ করার পর আপনি সালাম ফেরাবেন। উভয় পদ্ধতিই সুন্নাহসম্মত। এ নিয়ে বিতর্ক করার কিছু নেই।

উল্লেখ্য, এ মতবিরোধটি কেবল মুস্তাহাব/সুন্নাত হওয়া নিয়ে। অর্থাৎ কোনটি উত্তম বা সুন্নাত; সেটি নিয়ে। কাজেই একটি সুন্নাতে জায়েদা নিয়ে ঝগড়াবিবাদ করে ফরজ নষ্ট করা কোনো মুমিনের শান হতে পারে না। এক মুসলমান অপর মুসলমানের সম্মান রক্ষা করা ফরজ।

আপনার জন্য নির্বাচিত খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও পড়ুন

যুক্ত হউন

0FansLike
22FollowersFollow
0SubscribersSubscribe

সর্বশেষ খবর