মা-বাবার প্রতি গভীর ভালোবাসা

মধুমাখা একটি নাম হল ‘মা’। পৃথিবীতে মায়ের মতো আপন কেউ নেই। একটি নবজাতক সন্তান যখন ভূমিষ্ঠ হয়ে সর্বপ্রথম এই সুন্দর পৃথিবীর আলোর মুখ দেখে, শত কষ্ট-ব্যথা-যন্ত্রণা সহ্য করার পরও তখন সর্বাধিক আনন্দিত হন মা। আদরের সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ভুলে যান সব দুঃখ-যন্ত্রণা। সন্তান ভূমিষ্ঠের পর তার লালন-পালনের সার্বিক দায়িত্ব মাকেই বহন করতে হয়। কত রাত মা সন্তানের জন্য নির্ঘুম কাটিয়ে দেন। শত প্রতিকূলতার মাঝেও সন্তানকে বুকের মাঝে আগলে রাখেন। আর বাবা তো বটবৃক্ষের মতো উভয়কে মমতার ছায়ায় আবৃত রাখেন এবং সর্বদা সচেষ্ট থাকেন তাদের প্রয়োজন পূরণে। পৃথিবীতে নিখাদ ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা একমাত্র মা-বাবার কাছেই পাওয়া যায়। যদি কেউ মা-বাবার চেয়ে অধিক ভালোবাসা দেখায়, তবে বুঝতে হবে সেটা প্রকৃত ভালোবাসা নয়।

মহান রাব্বুল আলামিন বাবা-মাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেছেন। পবিত্র কোরআনের একাধিক স্থানে তাঁর ইবাদতের সঙ্গে সঙ্গে মা-বাবার সেবা ও আনুগত্যের নির্দেশ প্রদান করেছেন। সুতরাং আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করা যেমন ফরজ, মা-বাবার খেদমত করাও তেমন ফরজ। এ পসঙ্গে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না; মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের একজন বা উভয়জন যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের ব্যাপারে ‘উফ’ শব্দটিও বলো না এবং তাদের ধমক দিও না। তাদের সঙ্গে বিনম্রভাবে কথা বলো। আর তাদের জন্য মমতার ডানা বিছিয়ে দাও এবং বলো হে আমার প্রতিপালক, তাদের প্রতি দয়া করুন যেমনটি তারা করেছে আমার শৈশবে।’ (সূরা বনি ইসরাইল : ২৩-২৪)।

মা-বাবার অধিকারের ব্যাপারে মহান আল্লাহ তায়ালা কোরআনের অন্যত্র এরশাদ করেন, ‘আমি মানুষকে তার মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে তাকে গর্ভধারণ করেছেন। আর দুই বছর পর্যন্ত স্তন্যদান করেছেন। সুতরাং তোমরা আমার এবং তোমার মা-বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায় কর। আমার কাছেই প্রত্যাবর্তন করতে হবে।’ (সূরা লোকমান : ১৪)। হজরত মুগিরা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) এরশাদ করেন, ‘আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ওপর হারাম করেছেন, মা-বাবার অবাধ্য হওয়া।’ (বোখারি)।

ইসলাম বাবার তুলনায় মাকে তিনগুণ বেশি অধিকার প্রদান করেছে। মা যদি কাফেরও হয়, তদুপরি তার সঙ্গে বিনম্র আচরণ করা, তার প্রতি শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ভালোবাসা প্রদর্শন করা ইসলামের শাশ্বত নীতি। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রাসুল! আমার কাছে কে উত্তম ব্যবহার পাওয়ার অধিক হকদার? তিনি বললেন, তোমার মা। লোকটি বলল তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে বলল তারপর কে? তিনি বললেন তোমার মা। সে বলল তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার বাবা।’ (বোখারি)।

যে মা-বাবাকে মহান আল্লাহ তায়ালা সর্বোচ্চ মর্যাদাবান করেছেন, যাদের সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টির ওপর সন্তানের জান্নাত-জাহান্নাম নির্ভর করে, যাদের দিকে ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাকালে কবুল হজের সওয়াব লেখা হয়Ñ অতি পরিতাপের বিষয় যে, সে মা-বাবার সঙ্গে অনেক হতভাগা সন্তান ধমকের সুরে কথা বলে। তাদের প্রতি অশ্লীল বাক্য প্রয়োগ করে। এমনকি পাষ- সন্তান তার জন্মদাতা ও গর্ভধারিণী মা-বাবার গায়ে হাত তুলতেও দ্বিধাবোধ করে না। আবার অনেক হৃদয়হীন সন্তান তার মা-বাবাকে জোরপূর্বক বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে। অথচ মা-বাবার খেদমত করা তাদের ভরণ-পোষণের সার্বিক ব্যবস্থাপনা করা প্রত্যেক সন্তানের মানবিক, নৈতিক ও ঈমানি দায়িত্ব।

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ‘যখন কোনো অনুগত সন্তান নিজের মা-বাবার দিকে ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাকায়, মহান আল্লাহ তায়ালা তাকে প্রতিটি দৃষ্টির বিনিময় একটি কবুল হজের সওয়াব দান করেন।’ (বায়হাকি, মিশকাত)। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি তার মা-বাবা উভয়কে বা একজনকে বৃদ্ধাবস্থায় পেল; কিন্তু তাদের খেদমত করে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না, সে ধ্বংস হোক।’ (মুসলিম)।
তাই মহান স্রষ্টার সন্তুষ্টি ও সান্নিধ্য লাভ করতে হলে, নিজ মা-বাবার সেবা করতে হবে। তাদের সঙ্গে সদয় ব্যবহার করতে হবে এবং তাদের ভালোবাসতে হবে হৃদয়ের গভীর থেকে।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave A Reply

Your email address will not be published.

shares