মদিনা শরিফের জুমার খুতবাঃ ঋণ আদান প্রদানের বিধিবিধান

ঋণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইসলামে এ ব্যাপারটি গুরুতর। এ কারণে আবু হুরায়রা (রা.) রাসুল (সা.) সম্পর্কে বর্ণনা করেন, ঋণগ্রস্ত মৃত ব্যক্তির লাশ (জানাজার জন্য) হাজির করা হলে রাসুল (সা.) জিজ্ঞেস করতেন ‘সে কি অপরিশোধিত কোনো ঋণ রেখে গেছে? যদি বলা হতো, তিনি পরিশোধ করে গেছেন, তাহলে তিনি তার (জানাজা) নামাজ পড়াতেন। অন্যথায় বলতেন, তোমরা তোমাদের সাথির জানাজা পড়ে নাও।’ (বোখারি ও মুসলিম)

ইসলামের একটি অকাট্য নীতি হলো, হেফাজত ও সংরক্ষণের দিক দিয়ে বান্দার হকগুলোর প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব প্রদান করা। আজকাল লোকরা পাওনাদারকে তার প্রাপ্য আদায়ে ঢিলেমি করছে। এসব হকের মধ্যে বিশেষ একটি হক হলো ঋণ, যা পরিশোধ করা তার ওপর অত্যাবশ্যক ফরজ। পণ্য কিনে টাকা না দেওয়া, ঋণ নিয়ে তা যথাসময়ে আদায় না করা এবং কাজের শ্রমিককে তার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করা ইত্যাদি এ ঢিলেমির অংশ। একজন মুসলমানের কর্তব্য, সে নিজ দায়িত্ব আদায় এবং তার ওপর অন্য ভাইয়ের কৃত হক আদায়ে সচেষ্ট থাকবে। এ ব্যাপারে আল্লাহর এরশাদÑ ‘তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভোগ করো না।’ (সূরা বাকারা : ১৮৮)।
প্রত্যেক মুসলমানের ওপর বাধ্যতামূলক ফরজের একটি হলো, সে অপরের হক আদায় করবে। পরিপূর্ণভাবে, কোনো কমানো ছাড়া। পুরোপুরি, কোনো ত্রুটি ছাড়া। স্পষ্ট গোনাহ ও মহাঅন্যায় হলো, ঋণ আদায়কে এড়িয়ে যাওয়া, ঋণদাতা থেকে পলায়ন এবং পাওনা পরিশোধে তার সঙ্গে টালবাহানা করা। অন্যের হক আদায়ে কালক্ষেপণ করাও এসবের শামিল। রাসুল (সা.) এরশাদ করেনÑ ‘(পাওনা পরিশোধে) ধনীর গড়িমসি অন্যায়।’ (বোখারি ও মুসলিম)।

ঋণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইসলামে এ ব্যাপারটি গুরুতর। এ কারণে আবু হুরায়রা (রা.) রাসুল (সা.) সম্পর্কে বর্ণনা করেন, ঋণগ্রস্ত মৃত ব্যক্তির লাশ (জানাজার জন্য) হাজির করা হলে রাসুল (সা.) জিজ্ঞেস করতেনÑ ‘সে কি অপরিশোধিত কোনো ঋণ রেখে গেছে? যদি বলা হতো, তিনি পরিশোধ করে গেছেন, তাহলে তিনি তার (জানাজা) নামাজ পড়াতেন। অন্যথায় বলতেন, তোমরা তোমাদের সাথির জানাজা পড়ে নাও।’ (বোখারি ও মুসলিম)।

হে ওই ব্যক্তি, যে ঋণ আদায়ে কোনো গুরুত্বই রাখ না, ঋণদাতার প্রাপ্য বিষয়ে কোনো রেয়াতই কর না, তোমার রব আল্লাহকে ভয় করো। অন্যের হক আদায়ে সিরিয়াস হও। রাসুল (সা.) এরশাদ করেনÑ ‘শহীদের সব গোনাহ মাফ করে দেওয়া হবে, শুধু ঋণ ছাড়া।’ (মুসলিম)।

অতএব হে মুসলিম, জিম্মায় থাকা তোমার দায়িত্বকে আদায় করো, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও মানুষের সম্পদ আদায়ে গড়িমসি থেকে সাবধান হও। সবকিছু নিঃশেষ হওয়া এবং ভালো-মন্দের হিসাব-নিকাশ শুরুর আগেই এসব আদায়ে অগ্রগামী হও। রাসুল (সা.) এরশাদ করেনÑ ‘যার কাছে তার ভাইয়ের সম্মানহানি বা এ জাতীয় কোনো কিছু জুলুম হিসেবে গচ্ছিত থাকে, আজই (আরাফাহর দিনে) সে যেন তার ভাইয়ের সঙ্গে ওইসব থেকে মীমাংসা করে নেয়। ওইদিন আসার আগেই, যেদিন কারও কাছে কোনো দিনার বা দিরহাম থাকবে না। যদি অন্যায়কারীর কোনো নেক আমল থাকে, তাহলে তার কাছ থেকে তার জুলুম পরিমাণ নিয়ে নেওয়া হবে। আর যদি তার কোনো নেক আমল না থাকে, তাহলে পাওনাদারের গোনাহকে তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।’ (বোখারি)।

যে ব্যক্তি নিজের কাঁধে ঋণের বোঝা চাপিয়েছে, তা আদায় ও পরিশোধের জোর চেষ্টা করা উচিত। আদায়ে সক্ষমতা সত্ত্বেও যে গড়িমসি ও অবাধ্যতা অবলম্বন করবে, সে কেয়ামত দিবসে নিজেকে ভয়াবহতার দিকে ঠেলে দেবে।

মুহাম্মদ বিন জাহস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সম্মুখে উপবিষ্ট ছিলাম। দেখলাম, তিনি তাঁর মাথাকে আসমানের দিকে ওঠালেন। তাঁর হাতের তালু কপালে রাখলেন। তারপর বললেন, সুবহানাল্লাহ! কী ভয়াবহ জিনিস নাজিল হলো? উপস্থিত সব সাহাবায়ে কেরাম থ’ হয়ে গেলেন। এ অবস্থা দেখে আতঙ্কিত হলেন। পরদিন আমি (বর্ণনাকারী) রাসুল (সা.) এর কাছে জানতে চাইলাম, নাজিল হওয়া কঠিন জিনিসটি কী? তিনি বললেন, ‘যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ করে বলছি, যদি কোনো ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়, তারপর সে আবার জীবিত হয়। এরপর আবার শহীদ হয়ে ফের জীবিত হয়। অতঃপর সে আবার শহীদ হয়, আর তার ওপর ঋণ থাকে। তার পক্ষ থেকে প্রাপ্য ঋণ আদায় না হওয়া পর্যন্ত সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।’ (নাসাঈ)।

হে মুসলিম, সৃষ্টির হক আদায়ে নির্ভেজাল প্রত্যয়ী হও। পাওনা আদায় ও পরিশোধে বিশুদ্ধ নিয়ত হাজির রাখ। নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তোমার জন্য উত্তরণের পথ এবং বন্ধ দরজাগুলো খুলে দেবেন। রাসুল বলেনÑ ‘যে ব্যক্তি অন্যের সম্পদ গ্রহণ করে এবং তা আদায়ের পূর্ণ ইচ্ছা রাখে; আল্লাহ তায়ালা তার পক্ষ থেকে তা আদায়ের ব্যবস্থা করেন। আর যে তা গ্রহণ করে বিনাশের ইচ্ছা করে; আল্লাহ তায়ালা তাকে ধ্বংস করে দেন।’ (বোখারি)।

আর হে ঋণদাতা! তুমি ঋণগ্রহীতার প্রতি ক্ষমাশীল, নম্র ও উদারমনা হও। যে ঋণ আদায়ে অসচ্ছল তাকে সচ্ছল হওয়া পর্যন্ত সুযোগ দেওয়া কর্তব্য। আল্লাহ এরশাদ করেনÑ ‘যদি খাদক অভাবগ্রস্ত হয়; তবে তাকে সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত সময় সুযোগ দেওয়া উচিত।’ (সূরা বাকারা : ২৮০)। সর্বোপরি অসচ্ছলকে ছাড় দেওয়া এবং নিঃস্বকে ক্ষমা করা একটি ফজিলতপূর্ণ কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেনÑ ‘এক ব্যবসায়ী ছিল। সে মানুষকে ঋণ দিত। যখন ঋণ আদায়ে কাউকে অক্ষম দেখত; ছেলেদের বলত, তোমরা তাকে মাফ করে দিও। হয়তো আল্লাহও আমাদের মাফ করে দেবেন। তার মৃত্যুর পর আল্লাহ তাকে মাফ করে দিলেন।’ (বোখারি ও মুসলিম)। রাসুল (সা.) আরও এরশাদ করেনÑ ‘যে অসচ্ছলের জন্য সহজতা দেখাবে, আল্লাহ তায়ালাও দুনিয়া ও আখেরাতে তার জন্য সহজতা দেখাবেন।’ (বোখারি ও মুসলিম)।

অতএব হে মুসলিম ভাই, নির্দিষ্ট সময়ে পরিশোধ করা থেকে অক্ষম ব্যক্তির প্রতি দয়াশীল, ক্ষমাশীল ও তাকে ছাড় দিয়ে কামিয়াব হও। এসব কিছু সওয়াব ও প্রতিদানের দিক দিয়ে মহান ও গুরুত্ববহ। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে চায় যে কেয়ামত দিবসের বিপদ থেকে আল্লাহ তাকে মুক্তি দিন; তো সে যেন অসামর্থ্য ব্যক্তির কষ্টকে লাঘব করে অথবা তাকে ক্ষমা করে দেয়।’ (মুসলিম)।

ইসলামের আরেকটি আবশ্যকীয় দিক হলো, শ্রমিকের মজুরি আদায় করা। তার হকে কম দেওয়া বা হ্রাস করা হারাম। বোখারিতে বর্ণিত রাসুল (সা.) এরশাদ করেনÑ ‘কেয়ামতের দিন আমি তিন ব্যক্তির প্রতিপক্ষ হব। অন্য বর্ণনায় এসেছে, আমি যার প্রতিপক্ষ হই, তার বিরুদ্ধে মোকদ্দমা পেশ করি। তাদের মধ্যকার একজন ব্যক্তিকে উল্লেখ করে বলেন, এমন ব্যক্তি যে কোনো শ্রমিককে কাজে নিয়োগ করল তারপর তার থেকে পূর্ণরূপে কাজ নিল। অবশেষে তাকে তার পারিশ্রমিক দিল না।’ (বোখারি)।

২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরি মদিনার মসজিদে নববিতের প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত অনুবাদ নাজমুল হুদা

ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave A Reply

Your email address will not be published.

shares