প্রেগন্যান্সি টেস্ট: জেনে রাখুন খুটিনাটি সব

প্রেগন্যান্সি টেস্ট করা নিরাপদ গর্ভধারনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ন পদক্ষেপ । এখানে আমরা আপনাদের জন্য প্রেগন্যান্সি টেস্ট কি, কখন প্রেগন্যান্সি টেস্ট করতে হয়, প্রেগন্যান্সি টেস্ট করার ঘরোয়া উপায়, প্রেগন্যান্সি টেস্ট কিট কিভাবে ব্যবহার করতে হয় ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো । সন্তান সম্ভবা মা এবং তার অনাগত সন্তানের নিরাপদ গর্ভাবস্থার জন্য প্রেগন্যান্সি টেস্ট ভীষণ জরুরী। চলুন তবে শুরু করা যাক ।

প্রেগন্যান্সি টেস্ট কি ?
প্রেগন্যান্সি টেস্ট বলতে মূলত দৈহিক মিলনের পর মাতৃগর্ভে সৃষ্ট ভ্রুণ থেকে নিঃসৃত HCG হরমোনের উপস্থিতি মাপাকে বোঝায়। মায়ের রক্ত বা প্রসাবে HCG হরমোনের উপস্তিতি পাওয়া গেলে বুঝতে হবে যে সে গর্ভবতী ।

কখন প্রেগন্যান্সি টেস্ট করতে হয় ?
যখন আপনি ধারনা করবেন যে আপনি গর্ভধারন করেছেন তখন আপনি নিশ্চিত হওয়ার জন্য পরিক্ষা করতে পারেন । অনেকে কৈতুহল বা উত্তেজনাবশত মিলনের ৬-৭ দিন পরেই প্রেগন্যান্সি টেস্ট করতে চায় । তবে মিলনের মাত্রে ৬-৭ দিনের মাথায় এই পরিক্ষা করলে সঠিক ফলাফল পাওয়ার সম্ভবনা একেবারে নেই বললেই চলে । সঠিক ফলাফল পাওয়ার জন্য অন্তত ৩ থেকে ৪ সপ্তাহ বা তার বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে ।

প্রেগন্যান্সি টেস্ট করার ঘরোয়া উপায়
ঘরে বসেই প্রেগন্যান্সি পরিক্ষা করতে চাইলে আপনার প্রয়োজন হবে প্রেগন্যান্সি টেস্ট কিট । বর্তমানে ফার্মেসি দোকানগুলোতেই সহজে প্রেগন্যান্সি পরিক্ষা করার কিট কিনতে পারবেন।

প্রেগন্যান্সি পরিক্ষা করার কিটটি সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথমবার প্রসাব করার পর তাতে ডুবিয়ে রাখতে হয় । বিস্তারিত নিয়ম প্যাকেটেই লেখা থাকে । যদি ফলাফল পজেটিভ আসে তাহলে বুজতে হবে আপনি গর্ভধারন করেছেন । আর ফলাফল নেগেটিভ আসলে বুঝবেন আপনি গর্ভধারন করেননি ।

তবে এই পদ্ধতির কিছু দূর্বলতা রয়েছে । অনেক সময় গর্ভধারন না করেও ফলাফল পজেটিভ আসতে পারে । নীচে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো ।

গর্ভধারন করার আরো কিছু লক্ষন রয়েছে । সেগুলো এখানে তুলে ধরলাম –
মাসিক কি নির্দিষ্ট সময়ে হয়েছে ? প্রতিমাসের একটি নির্দিষ্ট সময়ে নারীদের মাসিক হয়ে থাকে (সাধারণত ২৮ দিন পর পর)। সেক্ষেত্রে, খেয়াল রাখুন আপনার মাসিক ঠিক সময়ে হচ্ছে কিনা । যদি ২৮ দিন পর পিরিয়ড না হয়, তাহলে এটিও গর্ভধারনের একটি লক্ষন।
সামান্য রক্তপাত পিরিয়ডের সময় যদি স্বাভাবিক রক্তপাতের বদলে খুব সামান্য পরিমাণ রক্তপাত হয়ে বন্ধ হয়ে যায়,এই চিহ্নটিকে অবহেলা করবেন না। এটি হতে পারে গর্ভধারণের লক্ষণ।

মাথা ঘোরা, বমি ও হজমে সমস্যা সাধারণত সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি প্রচন্ড দূর্বল, মাথা ঘোরা ও বিষন্ন লাগে এবং সেই সাথে প্রায়ই হজমে সমস্যা বা কোষ্ঠকাঠিন্য্য দেখা দেয়। হতে পারে, আপনার গর্ভধারনের অন্যতম লক্ষণ এটি।
ক্রমাগত ক্লান্তি যদি হঠাৎ করে সারাক্ষণ নিজেকে ক্লান্ত মনে হয় এবং সময়ে অসময়ে কেবল ঘুমোতে ইচ্ছে করে, যা আপনার স্বাভাবিক রুটিনের বাইরে, অন্যান্য লক্ষণগুলোর সাথে এই লক্ষণটি জানিয়ে দেয় আপনি হয়তো গর্ভধারণ করেছেন।

ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ খেয়াল করুন, আপনি কি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশীবার, বার বার প্রস্রাবের চাপ অনুভব করছেন ? গর্ভধারণের অন্যতম লক্ষণ এটি।
স্তনে পরিবর্তন গর্ভধারণ করার ফলে আপনার স্তনের আকৃতি কিছুটা বৃদ্ধি পাবে ও স্তনের বোটা গাঢ় রঙ ধারণ করেছে কিনা খেয়াল রাখুন।

গর্ভধারন না করেও প্রেগন্যান্সি টেস্ট পজিটিভ হওয়ার কিছু কারন –

কিছু কিছু ক্ষেত্রে গর্ভধারন না করেও টেস্ট রেজাল্ট পজিটিভ আসতে পারে। চলুন তাহলে জেনে নেই, কি কি কারনে গর্ভবতী না হয়েও টেস্ট পজিটিভ হতে পারে –

-বিভিন্ন ট্রফোব্লাস্টিক টিউমার (Trophoblastic Tumor) যেমন: হাইডাটিডফর্ম মোল (Hydatiform Mole), কোরিওকারসিনোমা (Choriocarcinoma) ইত্যাদিতেও একই ঘটনা ঘটে। শরীরে টিউমারের কারনে এ সময় প্রেগন্যান্সি পরিক্ষা করলে ফলাফল পজিটিভ আসতে পারে ।

-মেয়েদের কিছু জার্ম সেল টিউমার (Germ cell Tumor) হতে পারে। যেমন: ডিজজার্মিনোমা (Dysgerminoma)। এটা ওভারির একটা টিউমারের নাম। এই রোগে অস্বাভাবিকভাবে HCG হরমোন নিঃসৃত হয়। তখন প্রেগন্যান্সি পরিক্ষা করলে রেজাল্ট পজিটিভ হবে। কারন এ সময় HCG লেভেল বেশি থাকে।

-বমি বন্ধ হওয়ার জন্য বাজারে বিভিন্ন নামে প্রোমিথাজিন (Promethazine) ট্যাবলেট পাওয়া যায়। এগুলো খেলেও প্রেগন্যান্সি টেস্ট পজিটিভ হতে পারে । দেখা গেলো এমন হলো যে, এক মেয়ে বাসে চড়লে বমি হয় বলে বমির ওষুধ খেয়েছে, বমি ভাব বা Motion Sickness বন্ধ হওয়ার জন্য। বাস থেকে নেমে আবার একটু মাথা ঘুরালো আর বমি বমি লাগলো। সন্দেহ করে প্রেগন্যান্সি টেস্ট করালো। এক্ষেত্রেও গর্ভধারন না করেও পজিটিভ রেজাল্ট চলে আসতে পারে!

-শরীরের যেখানে ইনসুলিন তৈরী হয় সেখানেও কিছু টিউমার হতে পারে যা HCG নিঃসরণ করে। এক্ষেত্রেও টেস্ট পজিটিভ হতে পারে।

তাই প্রেগন্যান্সি টেস্ট পজিটিভ হলেই গর্ভবতী হয়েছে এমনটা ভাবা ঠিক হবে না। তবে উপরের বিষয়গুলো মাথায় রেখেই বিষয়টি নিশ্চিত হতে হবে । তাই প্রেগন্যান্সি পরিক্ষার ফলাফল ইতিবাচক আসলে আরো নিশ্চিত হওয়ার জন্য অবশ্যই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে যাওয়া উচিত।

গর্ভধারন নিশ্চিত হলে অতিরিক্ত সুরক্ষার জন্য আরো যেসব বিষয় পরিক্ষা করা দরকার –
আল্ট্রাসনোগ্রামঃ আল্ট্রাসনোগ্রাম হল প্রেগন্যান্সির সবচেয়ে প্রয়োজনীয় টেস্ট। গর্ভধারণের ৭\৮ সপ্তাহের মধ্যে আল্ট্রাসনোগ্রাম করে বাচ্চার অবস্থান ও জীবন নিশিত করা হয়। যদি কারো ডিম্ববাহী নালী বা জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণ হয়ে থাকে তাহলে তার গর্ভাবস্থা আর অগ্রবর্তী না করাই ভাল কারণ গর্ভধারণ থাকবে না এবং এর জন্য পরবর্তীতে রক্তক্ষরণ হয়ে বাচ্চা বের হয়ে যাবে। অর্থাৎ অ্যাবরসন হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ মতো ভাল কোনো সনোলজিস্ট দিয়ে ভাল একটি পরীক্ষা কেন্দ্রে এ পরীক্ষা করাতে হবে।

ব্লাডে সুগারের পরিমাণ টেস্টঃ নিরাপদ প্রেগন্যান্সি এর অন্যতম শর্ত হল আপনার রক্তে শর্করা বা সুগারের পরিমাণ টেস্ট করা। সহজ কথায় বলতে গেলে বলতে হয় আপনার ডায়াবেটিস আছে কিনা সে সম্পর্কে নিশ্চিত হতে রক্ত পরীক্ষা করা। ডায়াবেটিস থাকলে গর্ভে আপনার সন্তান বড় হয়ে যাবে আর প্রসবের সময় জটিলতা দেখা দেবে। OGTT টেস্ট খালি পেটে বা গ্লুকোজ খাওয়ার দু’ঘণ্টা পর সুগার টেস্ট করতে হবে। ডায়াবেটিস ধরা পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো চিকিৎসা করাতে হবে।

ব্লাড গ্রুপ ও আরএইচ জানাঃ নিরাপদ প্রেগন্যান্সির এই পরীক্ষাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। মায়ের ব্লাড ও বাচ্চার কর্ড ব্লাড নিয়ে সহজেইএ টেস্ট করা যায়। মা ও বাচ্চা উভয়ের পজিটিভ হলে সমস্যা নেই তবে হা যদি পজেটিভ নেগেটিভ হয় তাহলে জটিলটার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। এক্ষেত্রে জটিলতা এড়াতে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
জেনেটিক ডিজিজ টেস্টঃ গর্ভাবস্থায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হল ক্রোমোজোমাল স্টাডি বা জেনেটিক টেস্ট। যদিও এটি বেশ কস্টলি একটা পরীক্ষা তবে এই পরীক্ষার মাধ্যমে অনাগত সন্তানের মধ্যে বংশগত কোন রোগ যাচ্ছে কিনা, সন্তানের শরীরে অনিরাময় যোগ্য কোন অসুখ বিশুক অথবা সারাজীবন প্রাণঘাতী কোন রোগ আপনার সন্তানকে বয়ে বেড়াতে হবে কিনা এ সম্পর্কে জানা সম্ভব। এ ধরনের জেনেটিক ও ক্রোমোজোমাল টেস্ট বিশেষত যারা বেশি বয়সে মা হচ্ছেন, যাদের বংশগত রোগ আছে তাদের জন্য করানো গুরুত্বপূর্ণ।

ইউরিন টেস্টঃ গর্ভাবস্থায় ইউরিন টেস্ট করার প্রয়োজনীয়তা অনেক।তাই আপনার চিকিৎসক যখন আপনার কাছে ইউরিন টেস্ট এর জন্য বলে অবশ্যই সেটা করা উচিৎ। আপনার ইউরিন টেস্টের মাধ্যমে জানা যাবে আপনি হবু মা হিসেবে কতটুকু সুস্থ আছেন। ইউরিন টেস্ট এর আরও একটি অন্যতম কারণ হল যদি আপনার ইউরিনে প্রোটিন নিঃসরণ হতে দেখা যাই তবে সেটা কিডনি ইনফেকশন বা ব্যাকটেরিয়া আক্রমণের লক্ষণ।

এইচআইভি পরীক্ষাঃ গর্ভবতী মা যদি এই ভাইরাসটির বাহক হয়ে থাকেন তবে রক্তের মাধ্যমে গর্ভস্থ শিশুও এটি দ্বারা সংক্রমিত হতে পারে। প্রসবের সময় এমনকি পরবর্তীতে বুকের দুধ খাওয়ার মাধ্যমেও শিশুর শরীরে এই ভাইরাসটি সংক্রমিত হতে পারে। প্রসবপূর্ব সেবা গ্রহনের সময় আপনার যদি এই পরীক্ষাটি করানোও হয়, তার গোপনীয়তা রক্ষা করা হবে। যদি গর্ভাবস্থায় রক্তে এইচ আই ভি ভাইরাসের উপস্থিতি ধরা পরে, শিশুর সংক্রমনের ঝুকি কমানোর জন্য চিকিৎসা রয়েছে ।

হেপাটাইটিস-বি পরীক্ষাঃ এই ভাইরাসটি আমাদের শরীরে প্রবেশ করলে তখনই লিভারকে আক্রমণ করে, আবার কখনো কখনো লিভারকে আক্রমন না করে সুপ্ত অবস্থায় শরীরে থেকে যায়, অন্যকে সংক্রমিত করার জন্য বাহক হিসাবে কাজ করে। যদি আপনি এই ভাইরাসটির বাহক হয়ে থাকেন বা গর্ভাবস্থায় এটি দ্বারা সংক্রমিত হোন, তবে আপনার গর্ভস্থ শিশুও এটি দ্বারা সংক্রমিত হতে পারে। হেপাটাইটিস – বি প্রতিরোধের জন্য শিশু জন্মের পর টিকার ব্যবস্থা আছে। গর্ভাবস্থায় যদি আপনার রক্তে হেপাটাইটিস – বি এর উপস্থিতি ধরা পরে তবে আপনাকে একজন বিশেষজ্ঞর কাছে পাঠানো হবে ।

আশা করি নিবন্ধটি পড়ে প্রেগন্যান্সি টেস্ট সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় বুঝতে পেরেছেন । নিরাপদ গর্ভধারনের জন্য সকল সতর্কতা মেনে চলুন, গর্ভকালীন যত্ন নিন, ভালো থাকুন,ধন্যবাদ।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave A Reply

Your email address will not be published.

shares