প্রকৃতি পরিবেশ ও আমরা

বিগত ২০০ বছর ধরে বিশ্বব্যাপী লাগাম ছাড়া শিল্পায়নের কারণে বায়ুম-লে ব্যাপকভাবে বিষাক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস নির্গত হয়ে আসছে। আমাদের কৃষিব্যবস্থা এখনও পুরোপুরি বিজ্ঞানসম্মত নয়। ফলে বর্ধিত জনসংখ্যার চাপ সামলাতে কোপ পড়েছে অরণ্য ও বণ্যপ্রাণীর ওপররাজধানী ঢাকায় এক বিদেশি ঘুরে গিয়ে মন্তব্য করেছেন, ঢাকা শহর ইটের তৈরি এক বস্তি শহর। মনে পড়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার লাইন, ‘ইটের পর ইট মাঝখানে মানুষ কীট।’ অস্বীকার করার উপায় নেই, আজকাল এটাই আমাদের নগর জীবনের এক নিদারুণ বাস্তবতা। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে এবং ইদানীং গ্রামগঞ্জে ইটের পর ইট এমনভাবে গাঁথা হচ্ছে, এমনভাবে যত্রতত্র আকাশচুম্বী ভবন নির্মিত হচ্ছে, মাঝখানে মানুষের অবস্থা দাঁড়িয়েছে কীটেরই মতো।

আমরা সামাজিক মানুষ। সামাজিক মানুষ যখন বসতি নির্মাণ করে, তখন তাদেরও মনে থাকে সচেতন কিছু ইচ্ছা। ইচ্ছাগুলো হচ্ছে সম্পদ আর স্বাচ্ছন্দ্যের। কিন্তু একসময় দেখা যায়, ওই সম্পদও স্বাচ্ছন্দ্য জমা হতে হতে বিশাল এক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর সেই বোঝার নিচে চাপা পড়তে থাকে মানুষ। মানুষের জীবনে এটা এক ধরনের নির্বাসন। এ নির্বাসনের সমস্যাটা যদি মানুষ বুঝত; তবে বৃহত্তর সমাজের পক্ষে অনেক উপকার হতো। প্রকৃতিকে মানবসমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ভাবা যায় না, প্রতিপক্ষও ভাবা যায় না। কেননা মানুষ প্রকৃতির সন্ততি। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষ অচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। কিন্তু ইদানীং মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে সৃষ্ট এক বিরোধ সম্পদ পৃথিবীর পরিবেশকে বিপজ্জনক পরিণতির দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। আধুনিক শিল্প সভ্যতা নিঃশেষ করে দিচ্ছে পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদ বনভূমি এবং বন্যপ্রাণী। দূষিত করেছে বাতাস ও পানি।
বিগত ২০০ বছর ধরে বিশ্বব্যাপী লাগাম ছাড়া শিল্পায়নের কারণে বায়ুম-লে ব্যাপকভাবে বিষাক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস নির্গত হয়ে আসছে। আমাদের কৃষিব্যবস্থা এখনও পুরোপুরি বিজ্ঞানসম্মত নয়। ফলে বর্ধিত জনসংখ্যার চাপ সামলাতে কোপ পড়েছে অরণ্য ও বণ্যপ্রাণীর ওপর।

অন্যদিকে বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের কর্মসূচিতে রয়েছে ত্রুটিবিচ্যুতির অভিযোগ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সংরক্ষণের আওতায় থাকছে শুধু বৃহৎ আকার মেরুদ-ী প্রাণীদের, বিশেষ করে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের। কিন্তু অমেরুদ-ী ছোট ছোট প্রাণীকে রক্ষার তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। অতি ক্ষুদ্র প্রাণীরা তো রয়ে গেছে ধর্তব্যের বাইরে। একইভাবে অরণ্যের বৃহৎ প্রজাতির বৃক্ষ তাদের অর্থনৈতিক গুরুত্বের জন্য সংরক্ষিত হচ্ছে; কিন্তু ছোট ছোট উদ্ভিদ ও লতাগুল্ম ক্রমে পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী গুরুত্বারোপ করা হয়েছে জৈববৈচিত্র্যের ওপর। জৈববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বলতে বোঝায় মানুষসহ যাবতীয় প্রাণী, উদ্ভিদ, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস এবং সর্বপ্রকার জেনেটিক উপাদানের যথাযথ সংরক্ষণ।

বলা বাহুল্য, মানুষ প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। সম্পর্কটা মোটেও মানুষ বনাম প্রকৃতি নয়। শুধু পরিবেশের লাবণ্যের জন্য নয়, আত্মরক্ষার তাগিদেও মানুষকে হতে হয় প্রকৃতিপ্রেমী তথা প্রাণীপ্রেমী। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের, প্রাণের সঙ্গে অপ্রাণের এই যে ধারাবাহিকতা আধুনিক পরিবেশ বিজ্ঞানে তা স্বীকৃত। আকাশ আর মাটি, সমুদ্র আর বাতাস, উদ্ভিদ আর প্রাণিজগৎÑ সবকিছু মিলেমিশে পৃথিবী নামক আমাদের এ গ্রহটি আপন কক্ষপথে আবর্তিত। প্রাণ আর অপ্রাণ মিলেই পৃথিবী।
যাইহোক পরিবেশ ও প্রতিবেশ শুধু ইট-কাঠের তৈরি হলে হবে না। তার পেছনে থাকতে হবে একটা গোটা সমাজের আশা-আকাক্সক্ষা, ভালোমন্দ বোধ, রুচি আর আদর্শ। কিন্তু সমাজের কল্যাণকর চিন্তার মধ্যে যদি গোড়াতেই গলদ থাকে, সবকিছুকে ছাপিয়ে যদি সেখানে শুধু ভোগ আর সুখ প্রাধান্য পায়, তাহলে সেই ভোগের উচ্ছিষ্টস্বরূপ আবর্জনা জমতে থাকবে। আর সেই আবর্জনায় ইটের পরে ইট স্তূপীকৃত হয়ে তার মধ্যে চাপা পড়ে যাবে মানুষরূপী কীট।

আজকের পৃথিবীর আসল বিপদ শুধু প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়, বরং মানুষের নিজের হাতে তৈরি করা বিশ্বজোড়া পণ্য সর্বস্বতার জাল, যা তাকেই একদিন ধ্বংস করে দেবে। আধুনিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তি যেমন ক্রমাগত উৎপাদনক্ষম করে তুলেছে সমাজকে, তেমনই মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে তার আত্মসত্তা থেকে, প্রকৃতি ও পারিপার্শ্ব থেকে।
বর্তমানে পৃথিবীর কণ্টকাকীর্ণ বাস্তবতায় ক্লান্ত ও বিদীর্ণ মানুষের জীবন। বিশ্বায়নের সংস্কৃতি, নগরায়ণের সভ্যতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা এ সময়ের এক জ্বলন্ত সমস্যা। ক্রমাগত বিপর্যস্ত হতে হতে সেই আদিম ও পরিচ্ছন্ন নিস্তব্ধ প্রকৃতি এখন বিপন্ন।

পার্থিব জগতের সবকিছুর মধ্যে বাতাসের সঙ্গেই আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। বাস্তবিকভাবে পানি আর বাতাস এ দুটো জড়বস্তুর ওপরই মানুষের অস্তিত্ব নির্ভর করে বেশি। অথচ রাজধানী ঢাকার রাজপথ দিয়ে চলাচলের সময় হঠাৎ যানবাহন থেকে এমন ভয়াবহ কালো ধোঁয়া বের হয়, যা শহরের বাতাস বিষিয়ে দিচ্ছে। যদিও এর বিরুদ্ধে আইন আছে; তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এ আইন কেউ মানে না। এটা এক ধরনের মানুষ খুন করার মতো ব্যাপার। রাজধানী ঢাকা দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। পথঘাটও বাড়ছে প্রচুর। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যানবাহনের সংখ্যা। ডিজেল আর পেট্রলের ধোঁয়ায় চোখ জ্বালাসহ অনেকেরই শ্বাস-প্রশ্বাসের কষ্ট বেড়ে যায়। এ দূষণের ফলে শিশুরাও নানা রোগে আক্রান্ত হয়।

পানির অপর নাম জীবন। কোথাকার পানি খাব, কীভাবে নিরাপদ পানি পাব, এ বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। আমাদের প্রচলিত ধারণা টিউবওয়েলের পানি সবচেয়ে নিরাপদ। এ ধারণা এখন থেকে পাল্টাতে হবে। সময় লাগতে পারে; কিন্তু সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে চাইলে অভ্যাসও বদলাতে হবে। বৃষ্টির পানি, কুয়ার পানি, পুকুরের পানি ফুটিয়ে বিশুদ্ধ করে পান করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। প্রসঙ্গত, পানির অপব্যবহার যেমন কমাতে হবে, তেমনি ব্যক্তিগত ও সামষ্টিকভাবে আর্সেনিক দূষণ প্রতিরোধে উদ্যোগ নিতে হবে। মনে রাখা দরকারÑ সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন মহার্ঘ্য জ্বালানি তেলের চেয়ে পানীয় জলের দাম বেশি হবে। শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দেশ নয়, সর্বত্র এখন পানযোগ্য পানির জন্য হাহাকার। শুধু পানীয় জলের জন্য তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কাও অমূলক নয়। পরিবেশ, প্রকৃতি ও মানবসমাজ একই সূত্রে গাথা। পৃথিবীর সামগ্রিক ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য আমাদের সবাইকে সচেতন ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। দেশের সব নাগরিক সচেতনতার সঙ্গে জীবনযাপন করলে পরে আমরা ফিরে পাব একটি স্বাস্থ্যকর ও বাসযোগ্য পৃথিবী।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave A Reply

Your email address will not be published.

shares