ইসলামে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিধান

ইসলামি ব্যাংক সাধারণত এক্ষেত্রে শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গে ব্যবসায়িক চুক্তি করে। শেয়ারহোল্ডারদের টাকাগুলো ব্যাংক ব্যবসায়িক বিনিয়োগের জন্য নেয়। তাদের নির্দিষ্ট পার্সেন্ট অনুযায়ী লাভ দিয়ে থাকে। শরিয়তের পরিভাষায় এ ধরনের লেনদেনকে মুদারাবা বলে। সুতরাং ব্যাংকের সঙ্গে শেয়ারহোল্ডারের সম্পর্ক হলো, মুদারবার সম্পর্ক। আর ডিপোজিটারদের পরস্পরের সম্পর্ক হলো মুশারাকার সম্পর্ক।

ইসলামি শরিয়তে মুদারাবা এমন একটি অংশীদারি কারবার, যেখানে দুটি পক্ষ থাকে আমাদের সমাজের প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে ব্যাংকিং লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত। শুধু ইসলামি নাম দেখেই আস্থা নিয়ে আমরা লেনদেন করি। তবে একজন মোমিন হিসেবে আমাদের লেনদেনের বিস্তারিত রূপ ও শরয়ি বিধান জেনে নেওয়া উচিত।

ব্যাংক ডিপোজিট চারভাবে বিভক্ত
১. কারেন্ট অ্যাকাউন্ট (ঈঁৎৎবহঃ অপপড়ঁহঃ) বা চলতি হিসাব।
২. সেভিংস অ্যাকাউন্ট (ঝধারহমং অপপড়ঁহঃ) বা সঞ্চয়ী হিসাব।
৩. ফিক্সড ডিপোজিট (ঋরীবফ উবঢ়ড়ংরঃ) বা নির্ধারিত মেয়াদি সঞ্চয়।
৪. লকার (খড়পশবৎ) তথা ব্যাংক থেকে লোহার বাক্স ভাড়া নিয়ে তাতে টাকাপয়সা বা মূল্যবান সামগ্রী রেখে তা ব্যাংকের কাছে আমানত রাখা। (ফিকহি মাকালাত : ৩/১৩-১৫)।

প্রথম তিন প্রকারের ডিপোজিটাররা যেহেতু ব্যাংককে তাদের গচ্ছিত অর্থের জামিন বা জিম্মাদার বানায় এবং ব্যাংকও যথেচ্ছা তা ব্যবহার করার সুযোগ লাভ করে; তাই প্রথম তিনটি অ্যাকাউন্টে টাকা রাখা ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে করজ বা ঋণ হিসেবে গচ্ছিত থাকে।
আর চতুর্থ প্রকার তথা লকার (খড়পশবৎ) এটা বর্তমান প্রচলন ও শরয়ি দৃষ্টিকোণ উভয় বিবেচনায় আমানত হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। (ফিকহি মাকালাত : ৩/১৮)।

জেনারেল ব্যাংকের কোন অ্যাকাউন্টের কী বিধান
কারেন্ট অ্যাকাউন্টে টাকা রাখা মুফতিদের কাছে জায়েজ। কারণ জানমালের নিরাপত্তার প্রশ্নে বিপুল পরিমাণ অর্থ বাসাবাড়িতে রেখে দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। আর জানমালের হেফাজত ইসলামি শরিয়তেও কাম্য। কারেন্ট অ্যাকাউন্টে গচ্ছিত অর্থ যদিও ঋণ হিসেবে থাকে; কিন্তু যেহেতু ব্যাংক ঋণ গ্রহণ বাবদ কোনো কিছু প্রদান করে না, বরং উল্টো সার্ভিস চার্জ নামে কিছু টাকা কর্তন করে থাকে; তাই এ অ্যাকাউন্টে টাকা রাখলে সুদি লেনদেনের গোনাহ হবে না।

আর সেভিং অ্যাকাউন্ট ও ফিক্সড ডিপোজিটে টাকা রাখা মানে হলো সুদি লেনদেন করা। কারণ এ দুই প্রকার অ্যাকাউন্ট অ্যাকাউন্ট হোল্ডারদের টাকার অঙ্ক অনুপাতে মাসিক একটি অ্যামাউন্ট প্রদান করে থাকে। আর যেহেতু এ দুই প্রকারের অ্যাকাউন্টে গচ্ছিত টাকা ঋণ হিসেবে থাকে, সুতরাং এখান থেকে মাসিক একটি অ্যামাউন্ট নেওয়ার মানে হলো, ঋণ দিয়ে অতিরিক্ত গ্রহণ করা, যা স্পষ্টই হারাম।

কেউ মাসআলা জানার আগে করে থাকলে অ্যাকাউন্ট পরিবর্তন করে কারেন্টে নিয়ে যাবে। আর কোনো কারণে তা সম্ভব না হলে অনেক মুফতির কাছে সেই টাকা বাধ্য হওয়ার কারণে সেখানেই রাখবে; তবে অতিরিক্ত যে অ্যামাউন্ট পাওয়া যাবে, তা সওয়াবের নিয়ত ছাড়া গরিবদের মধ্যে বণ্টন করে দেবে। সর্বোপরি আল্লাহ তায়ালার কাছে ইস্তেগফার করবে।

ইসলামি ব্যাংকের কোন অ্যাকাউন্টের কী বিধান
ইসলামি ব্যাংকের কারেন্ট অ্যাকাউন্ট সাধারণ ব্যাংকের কারেন্ট অ্যাকাউন্টের মতো জায়েজ আছে।
ইসলামি ব্যাংক সাধারণত এক্ষেত্রে শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গে ব্যবসায়িক চুক্তি করে। শেয়ারহোল্ডারদের টাকাগুলো ব্যাংক ব্যবসায়িক বিনিয়োগের জন্য নেয়। তাদের নির্দিষ্ট পার্সেন্ট অনুযায়ী লাভ দিয়ে থাকে। শরিয়তের পরিভাষায় এ ধরনের লেনদেনকে মুদারাবা বলে। সুতরাং ব্যাংকের সঙ্গে শেয়ার হোল্ডারের সম্পর্ক হলো, মুদারবার সম্পর্ক। আর ডিপোজিটারদের পরস্পরের সম্পর্ক হলো মুশারাকার সম্পর্ক।

ইসলামি শরিয়তে মুদারাবা এমন একটি অংশীদারি কারবার, যেখানে দুটি পক্ষ থাকে। একপক্ষ মূলধন সরবরাহ করে এবং অপর পক্ষ মেধা ও শ্রম ব্যয় করে ওই মূলধন দ্বারা ব্যবসা পরিচালনা করে। ব্যবসায়ে লাভ হলে পূর্ব চুক্তি অনুসারে উভয়পক্ষের মাঝে বণ্টিত হয়। আর লোকসান হলে মূলধন সরবরাহকারী পক্ষকে তা বহন করতে হয়। এক্ষেত্রে সবটুকু লোকসান পুঁজিদাতা বহন করলেও মুদারিব তার শ্রম ও তৎপরতার কোনো পারিশ্রমিক না পাওয়াটাই তার লোকসান হিসেবে গণ্য হয়। তবে যদি মুদারিব কর্তৃক নিয়ম লঙ্ঘন, অবহেলা বা চুক্তিভঙ্গের কারণে লোকসান হয়, তাহলে মুদারিবকে লোকসানের দায় বহন করতে হবে।

উল্লেখ্য, মুদারাবা ব্যবসায় স্বাভাবিক লোকসান হয়ে পুঁজি ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রথমত পূর্বতন লভ্যাংশ দ্বারা পুঁজির সমন্বয় করা হবে। লভ্যাংশ দ্বারা পুঁজির সমন্বয় না হলে অবশিষ্ট ক্ষতি পুঁজিদাতাই বহন করবে। এক্ষেত্রে মুদারিব বা উদ্যোক্তার ওপর এর কোনো দায় আরোপিত হবে না। (শারহুল মাজাল্লাহ : ৪/৩৬৩)।
মূলধন সরবরাহকারী পক্ষকে বলা হয় সাহিবুল মাল, আর ব্যবসায় পরিচালনাকারী পক্ষকে বলা হয় মুদারিব। আর বিনিয়োগকৃত অর্থকে বলা হয় রাসুল-মাল বা পুঁজি।
বাইয়ে মুশারাকা একটি বহুল প্রচলিত ইসলামি বিনিয়োগ পদ্ধতি। এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে অংশীদার হওয়া। শরিয়তের পরিভাষায় যে কারবারে দুই বা ততোধিক ব্যক্তি লাভ-লোকসানের ঝুঁকি বহন করার শর্তে কারবার পরিচালনা করে তাকে বাইয়ে মুশারাকা বলা হয়।

সুতরাং ইসলামি শরিয়তে মুশারাকা ও মুদারবা জায়েজ হওয়ার জন্য যেসব শর্ত রয়েছে, তা মেনে চললে ইসলামি ব্যাংকের এ অ্যাকাউন্টে ব্যবসার নিয়তে টাকা রাখা ও সেখান থেকে প্রাপ্ত মুনাফা জায়েজ হবে। তবে সরেজমিন অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, ইসলামি ব্যাংকগুলো সুদি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সুদি লেনদেনের সঙ্গেই বেশি জড়িত। তারা মুখে মুখে হালাল মুনাফা প্রদানের কথা বললেও সহিহ তরিকায় ইনভেস্ট করে না তথা বেচাকেনার মধ্যে শরিয়ত যেসব শর্ত আরোপ করেছে, তা সঠিকভাবে রক্ষা করে না। খাতা-কলমে ঠিক দেখালেও বাস্তবে করে খামখেয়ালি এবং জনবল না থাকার দোহাই দিয়ে থাকে, যা অগ্রহণযোগ্য।
তাই প্রচলিত ইসলামি ব্যাংকগুলোতেও সেভিংস এবং ফিক্সড ডিপোজিট অ্যাকাউন্ট খোলা জায়েজ হবে না। যতক্ষণ না তারা তাদের কার্যক্রম বাস্তব ক্ষেত্রেও শরয়ি পন্থায় নিয়ে আসে এবং বাস্তব অভিজ্ঞতায় তাদের কার্যক্রম সম্পূর্ণ শরিয়তভিত্তিক প্রমাণ করতে না পারে। (আল মাবসূত লিস সারাখসি : ২২/১৩৩)।

প্রচলিত ইসলামি ব্যাংকগুলোর তাদের কাজকে পূর্ণ স্বচ্ছ করার জন্য আমাদের দেশের বিজ্ঞ মুফতিরা দুটি প্রস্তাব দিয়ে থাকেন।
ক. বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ মর্মে অনুমতি না নিয়ে থাকলে অনুমতি নেবে যে, ব্যাংক সরাসরি নিজে বাণিজ্যিক মাল আমদানি ও রপ্তানি করবে।
খ. প্রত্যেক শাখার কারবার প্রত্যক্ষ করার জন্য একজন বিজ্ঞ আলেমে দ্বীন থাকবে এবং সর্বময় কর্তৃত্ব ম্যানেজারের নয়, মজলিসে শূরার হাতে থাকবে। (ইসলাম আওড় জাদিদ মায়িশাত পৃ. ১২৬)।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave A Reply

Your email address will not be published.

shares