আত্মহত্যা প্রতিরোধের উপায়

আত্মহত্যা বা নিজেকে নিজে হত্যা করা বর্তমান সমাজের জন্য একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো দৈনিক পত্রিকায় আত্মহত্যার খবর পেয়ে আমরা বেদনায় কেঁপে উঠি। এসব আত্মহত্যার পেছনের অনেক কারণের কথা কাগজে লেখা হয়। কিন্তু এ থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছি না। বিগত বছরগুলোর আত্মহত্যার পরিসংখ্যান থেকে আমাদের এ কথা প্রমাণিত হয়। শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বের অবস্থা একই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী বছরে প্রায় ৮ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে। তবে ১৯ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীরা বেশি আত্মহত্যা করে বলে জানা গেছে। আত্মহত্যার পরিসংখ্যানের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় দশম।

বাংলাদেশ পুলিশ হেড কোয়ার্টারের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল ১১,০৯৫টি। আর ২০১৬ সালে সে সংখ্যা ছিল ১০,৬০০, ২০১৫ সালে ১০,৫০০ এবং ২০১৪ সালে তা ছিল ১০,২০০টি। এ তথ্য থেকে বোঝা যায়, প্রতি বছরই আত্মহত্যার ঘটনা বাড়ছে এবং গড়ে প্রতিদিন ৩০ জন করে আত্মহত্যা করছে। বড়দের সঙ্গে শিশু ও কিশোররাও আত্মহত্যা করছে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের মতে, শুধু ২০১৭ সালেই ৭৬ শিশু আত্মহত্যা করে, ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত যার সমষ্টি ছিল সর্বমোট ৫৩৪। আরও শঙ্কার বিষয় হলো, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের এক রিপোর্ট মতে, বাংলাদেশে প্রায় ৬৫ লাখ মানুষ আত্মহত্যার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এমন অবস্থা কারোরই কাম্য নয়। এটি মনে রাখা জরুরি যে, একটি আত্মহত্যা শুধু একটি জীবনকে শেষ করে দেয় না বরং একটি পরিবার, সমাজ রাষ্ট্রÑ এমনকি গোটা মানব জাতিকে হুমকির মধ্যে ফেলে দেয়। এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া জরুরি। কিন্তু কীভাবে? সে নিয়ে চিন্তা ও গবেষণার কোনো অন্ত নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি আত্মহত্যার পেছনে অনেকগুলো কারণ থাকে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, ডিপ্রেশন, দাম্পত্য কিংবা যে কোনো সম্পর্কের মধ্যে দ্বন্দ্ব, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে অসচেতনতা এবং পারিপার্শ্বিক অসহযোগিতা। তাদের মতে, এগুলো থেকে নিজেদের উত্তরণ ঘটাতে পারলে আত্মহত্যা এবং তার প্রবণতা কমিয়ে আনা কিংবা বন্ধ করা সম্ভব। কিন্তু ভাববার বিষয় হলো, কখনও কি ওইসব বিষয় থেকে সমাজকে পুরোপুরি মুক্ত করা আদৌ সম্ভব? অবশ্যই না। পৃথিবীর শুরু থেকেই মানুষ দারিদ্র্যকে জয় করার চেষ্টায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছে; কিন্তু সেই দারিদ্র্য কমার পরিবর্তে ভিন্ন ভিন্নরূপে বেড়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষটিও অনেক কিছুরই অভাব বোধ করে। পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে দ্বন্দ্ব-কলহও ঠিক ওইরূপ। সম্পর্ক যতদিন থাকবে, দ্বন্দ্ব-কলহও ততদিন থাকবে। এটিই নিয়ম। সুতরাং উল্লেখিত ওই সমস্যাগুলো নিরসন করতে না পারলে আত্মহত্যা এবং এর প্রবণতা বন্ধ করা যাবে নাÑ এমন কথা যুক্তিহীন ও অনর্থক। আমরা বলতে চাই, আত্মহত্যা নিরসনের উপায় অবশ্যই আছে। আর তা হলো নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং এতদসংক্রান্ত শিক্ষা। ব্যক্তিজীবনে যতদিন নৈতিকতা ও মূল্যবোধের বাস্তবায়ন না হবে ততদিন কোনো উপায়েই এসব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হবে না। আর নৈতিকতা ও মূল্যবোধের জোগান দিতে পারে একমাত্র ধর্ম। সে ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ ও আল্লাহর কাছে মনোনীত ধর্ম হিসেবে ইসলামই একমাত্র সমাধান।

এখন আমরা দেখি ইসলাম আত্মহত্যা ও তার পরিণতি সম্পর্কে কী বলছে। ইসলামি আইন ও বিধানে আত্মহত্যাকে হারাম করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে এ ব্যাপারে নির্দেশ হলো, ‘তোমরা তোমাদের নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি করুণাময়।’… (সূরা নিসা : ২৯-৩০)।

অন্যদিকে অনেকগুলো হাদিস আত্মহত্যা এবং এর শাস্তি সম্পর্কে আমাদের অবহিত করে। এ প্রসঙ্গে আমরা আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত হাদিসের কথা উল্লেখ করতে পারি। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করবে, জাহান্নামেও তার সেই যন্ত্রণাকে অব্যাহত রাখা হবে। আর যে ব্যক্তি ধারালো কোনো কিছু দিয়ে আত্মহত্যা করবে তার সেই যন্ত্রণাকেও জাহান্নামে অব্যাহত রাখা হবে।’ (বোখারি : ৪৪৬)। এখন যারা ইসলামি অনুশাসনে বিশ্বাসী এবং সে আলোকে নিজেদের জীবন পরিচালনা করেন, তারা কখনও আত্মহত্যা করে নিজেদের পরকালীন জীবনকে জাহান্নামের ইন্ধন বানাতে চাইবে না এবং এটিই স্বাভাবিক।

এছাড়াও আমরা উল্লেখ করতে পারি যে, পৃথিবীর কোনো ধর্মই আত্মহত্যাকে সমর্থন করে না। সুতরাং অন্যান্য গ্রহণযোগ্য পদক্ষেপের পাশাপাশি প্রত্যেক ধর্মের অনুসারীদের জন্যও যদি ধর্মীয় শিক্ষার বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা যায় এবং ব্যবহারিক জীবনে মানবীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার সমন্বয় ঘটানো যায় তাহলে আত্মহত্যার অতিশয় ঘৃণ্য পাপ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। নৈতিকতা ও মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় শিক্ষা প্রসারের জন্য একাডেমিক কার্যক্রমই একমাত্র উপায় ভাবা উচিত নয়। বরং অন্যান্য মাধ্যমকেও কাজে লাগাতে হবে। যেমন, প্রত্যেক মসজিদের জুমার খুতবায় কিংবা ওয়াজ মাহফিলে এসব সামাজিক সমস্যা ও তা উত্তরণে ইসলামের শিক্ষাগুলোকে সুস্পষ্ট এবং বোধগম্যভাবে তুলে ধরা জরুরি। সামাজিক ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ এ ব্যাপারে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারেন। পাশাপাশি সরকারি এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোও যদি নিজ নিজ সামর্থ্যরে আওতায় পদক্ষেপ গ্রহণ করে তাহলে বিষয়টি আরও সহজ হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

পরিশেষে বলব, এইচআইভির বিরুদ্ধে আমরা যেমন কার্যকরী ভূমিকা সর্বস্তরে গ্রহণ করেছি, তেমনি আত্মহত্যার ব্যাপারেও আমাদের যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। সামাজিক এ মহাব্যাধি থেকে মানবতাকে মুক্ত করা আমাদের সবারই দায়িত্ব।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave A Reply

Your email address will not be published.

shares