জাতীয়

‘২০১৭ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ’

সদ্য সমাপ্ত ২০১৭ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ ও পণ্যমূল্য ও সেবা-সার্ভিসের মূল্য বেড়েছে ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ। পূর্ববর্তী ২০১৬ সালে এই বৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং ৫ দশমিক ৮১ শতাংশ। বিগত বছরের তুলনায় ২০১৭ সালে খাদ্যপণ্য বিশেষ করে চালের মূল্য বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।

কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর রাজধানী ঢাকায় সংগৃহীত বাজার দর ও বিভিন্ন সেবা সার্ভিসের তথ্য থেকে ২০১৭ সালের প্রতিবেদনে এ তথ্য উপস্থাপন করা হয়।

 কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)র সভাপতি গোলাম রহমান কর্তৃক গণমাধ্যমে প্রেরিত একটি প্রতিবেদনে এ সব বিষয় উল্লেখ করা হয়।

রাজধানী ঢাকার ১৫টি খুচরা বাজার ও বিভিন্ন সেবা-সার্ভিসের মধ্যে থেকে ১১৪টি খাদ্যপণ্য, ২২টি নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রী এবং ১৪টি সেবা-সার্ভিসের তথ্য এই পর্যালোচনায় বিবেচনা করা হয়েছে। এই হিসাব শিক্ষা, চিকিৎসা ও প্রকৃত যাতায়াত ব্যয় বর্হিভূত।

 কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বাংলাদেশে ক্রেতা-ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ ও প্রতিনিধিত্বকারী জাতীয় স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ১৯৭৮ সাল থেকে ভোক্তাদের স্বার্থ ও অধিকার সংরক্ষণ এবং সম্প্রসারণের লক্ষ্যে কাজ করে আসছে। ক্যাব প্রতি বছরের প্রারম্ভে বিগত বছরের জীবন যাত্রার ব্যয় এবং প্রাসঙ্গিক অন্যান্য বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করছে।

ক্যাবের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোক্তার ঝুলিতে (Consumer Basket) যেসব পণ্য ও সেবা রয়েছে সেসব পণ্য বা সেবা পরিবারের মোট ব্যয়ের সাথে তুলনা করে পণ্য বা সেবার ওজন (Weight)-এর ভিত্তিতে জীবনযাত্রা ব্যয়ের এই হিসাব করা হয়েছে।

যেসব পণ্যের দাম বেড়েছে: ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে সব ধরনের চালের গড় মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে ২০ দশমিক ৪০ শতাংশ। তবে তুলনামূলকভাবে মোটা চালের দাম সরু চালের দামের চেয়ে বেশী বৃদ্ধি পেয়েছে। গত এক বছরে সবচেয়ে বেশী দাম বেড়েছে পেঁয়াজের। দেশি পেঁয়াজে দাম বেড়েছে ৪০ দশমিক ৯৯ শতাংশ ও আমদানিকৃত পেঁয়াজে বেড়েছে ৫৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ। শাক-সবজিতে গড়ে দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ২৪ দশমিক ২৮ শতাংশ। তরল দুধে বেড়েছে ২০ দশমিক ৩৬ শতাংশ, গরুর মাংসে বেড়েছে ১৯ দশমিক ৭২ শতাংশ। চিনি ও গুড়ে গড়ে বেড়েছে ১২ দশমিক ৮ শতাংশ, লবণে বেড়েছে ১১ দশমিক ০৩ শতাংশ, ভোজ্য তেলে বেড়েছে ১০ দশমিক ৭৮ শতাংশ, চা পাতায় বেড়েছে ১০ দশমিক ৩২ শতাংশ। দেশী শাড়ী কাপড়ে বেড়েছে ৬ দশমিক ৬২ শতাংশ, গুঁড়ো দুধে বেড়েছে ৫ দশমিক ১১ শতাংশ, মাছে বেড়েছে ৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ, ডালডা ও ঘিতে বেড়েছে ৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ, দেশি মোরগ-মুরগীতে বেড়েছে ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ, ডিমে বেড়েছে ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ। আটা ময়দায় বেড়েছে ১ দশমিক ৯৫ শতাংশ, ডালে বেড়েছে ১ দশমিক ৪৮ শতাংশ। গেঞ্জি, গামছা ও তোয়ালেতে গড়ে দাম বেড়েছে ৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। সেবা খাতে ২ বার্নার গ্যাসের চুলার গ্যাসের মূল্য বেড়েছে ২৩ দশমিক ০৮ শতাংশ, আবাসিক খাতে বিদ্যুতের মূল্য বেড়েছে ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ, বাণ্যিজিক খাতে বেড়েছে ৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং ওয়াসা সরবরাহকৃত পানির মূল্য প্রতি হাজার লিটারে বেড়েছে ৫ শতাংশ। বাসা ভাড়া বেড়েছে ৮ দশমিক ১৪ শতাংশ।

যেসব পণ্যের দাম কমেছে: দেশি মসুর ডালের দাম কমেছে ৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ, আমদানিকৃত মসুর ডালে কমেছে ১২ দশমিক ২৪ শতাংশ, ফার্মের ডিমে কমেছে ৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ, নারিকেল তেলে কমেছে ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ, আলুর দাম কমেছে গড়ে ৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ। রসুনে কমেছে ৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং জ্বালানি তেলে কমেছে ২ দশমিক ৫১ শতাংশ। সার্বিকভাবে মাছের দাম বাড়লেও সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশে উৎপাদিত কই মাছের দাম কমেছে ৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ আর ইলিশের দাম কমেছে ১ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ইলিশের দাম ভরা মৌসুমে সকল শ্রেণির ভোক্তার ক্রয় ক্ষমতার নাগালে নেমে এসেছিল। এটা ছিল প্রজননের সময় সরকারের ইলিশ মাছ ধরা নিষিদ্ধ করার সুফল।

চালের মূল্য ও খাদ্য নিরাপত্তা: খুচরা বাজারে সব ধরণের চালের দাম প্রায় সারা বছর জুড়েই দফায় দফায় বৃদ্ধি পেয়েছে। এপ্রিলে পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে বৃহত্তম সিলেট এলাকায় আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। জুন মাসে পুনরায় সিলেটসহ দেশের উত্তরাহঞ্চল এবং মধ্যাঞ্চলে বন্যা হয়। বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় বোরো ধানের ব্যাপক ফসল হানি হয়। তাছাড়া রোগ বালাই এর কারণেও কোন কোন এলাকায় চাল উৎপাদন কম হয়েছে। চালের বাজারে এপ্রিল থেকেই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রভাব দেখা যায়। এদিকে সরকারি গুদামে চালের মজুদ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে। চালকল মালিক ও ব্যবসায়িরা এ সুযোগে চালের মূল্য দফায় দফায় বৃদ্ধি করে। খুচরা বাজারে এক পর্যায়ে মোটা চালের দাম প্রতি কেজি ৫০ টাকারও বেশি এবং সরু চালের (মিনিকেট ও নাজিরশাইল) দাম প্রতি কেজি ৬৫-৭২ টাকায় উন্নীত হয়।

ক্যাবের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার বিদেশ থেকে চাল আমদানির নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে। বেসরকারিখাতে চাল আমদানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে আমদানি শুল্ক হার সর্বমোট ২৮ শতাংশ থেকে প্রথমে ১০ শতাংশ ও পরবর্তীতে ২ শতাংশে হ্রাস করা হয়। মোটা চালের দাম ৪২-৪৩ টাকায় নেমে আসে। আমনের উৎপাদন কম হয়েছে এই আশঙ্কায় এবং সরকার চালের সংগ্রহ মূল্য গত বছরের কেজি প্রতি ৩৪ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে এ বছর ৩৯ টাকা নির্ধারণ করায় আবারও চালের দাম উর্ধ্বমুখী হয়। সরকারি গুদামে খাদ্যশস্যের ধারণ ক্ষমতা ১৬/১৭ লক্ষ টন। আশা করা যায় সরকারের গুদামে চালের মজুদ ১০ থেকে ১২ লক্ষ টনে উন্নীত হলে এবং সরকারেরsafety net program সমূহে চাল বিতরণ বৃদ্ধি পেলে মূল্য স্থিতিশীল ও সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চাল উৎপাদনে বাংলাদেশের স্বয়ংসম্পূর্ণতা ২০১৭ সালের বন্যা ও ব্লাস্ট রোগের কারণে ক্ষুণ্ন হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যত দ্রুত সম্ভব এ অবস্থা থেকে উত্তরণ আবশ্যক। এ উদ্দেশ্যে কৃষককে সুলভ মূল্যে উন্নত বীজ, সার, পানি ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরবহের সাথে সাথে ঋণ সুবিধা এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা বৃদ্ধি করতে হবে। একই সাথে কৃষকের উৎপাদিত ফসলের লাভজনক মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। সাধারণত ধান কাটা শুরুর আগেই সরকার ধান-চালের সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ও সংগ্রহ মূল্য স্থির করে। তবে নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ধান চাল সংগ্রহ প্রতিবছরই বিলম্বে শুরু হয়। এ প্রেক্ষাপটে কৃষক সরকারের ন্যায্য মূল্যে ধান-চাল সংগ্রহের সুফল থেকে বঞ্চিত হন, লাভবান হন মিল-মালিক ও মধ্যস্বত্ত্ব ভোগী ব্যবসায়িক শ্রেণী। অনেক সময় রাজনৈতিক সুবিধাভোগী শ্রেণী মৌসুম-ভিত্তিক কৃষক ও ব্যবসায়ী সেজে সরকার নির্ধারিত মূল্যের সুবিধা ভোগ করে।

Contract Growing পদ্ধতিতে কৃষকের নিকট থেকে ধান কাটার পরপরই ধান-চাল সংগ্রহের উদ্যোগ এবং Contract Growing দের জন্য শস্যবীমার প্রবর্তন করা গেলে এক দিকে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হবে।

অন্যদিকে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও রোগ-বালাই এর কারণে কৃষকের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাও দূর হবে। তা ছাড়া কৃষকের নিকট থেকে ক্রয় ও আমদানির মাধ্যমে সরকারের গুদামে পর্যাপ্ত মজুদ গড়ে তোলা সময়োপযোগী হবে বলে মনে হয়। সরকারের গুদামে চাল পর্যাপ্ত মজুদ থাকলে মিলার এবং পাইকারি ব্যবসায়ীদের পক্ষে সরবরাহ অস্থিতিশীল করে মূল্য বৃদ্ধির সুযোগ থাকবে না। এতে কৃষক ও ভোক্তা উভয়ই লাভবান হবেন।

গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি: বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বিগত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে দুই ধাপে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। প্রথম দফায় ১ মার্চ ও দ্বিতীয় দফায় ১ জুন হতে গ্যাস বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে কার্যকর করা হয়। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ওপর বিআরসিই-তে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে ক্যাব মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। বিইআরসি’র দুই দফায় গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ক্যাব হাইকোর্টে রিট আবেদন করে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার শেষে উচ্চ আদালত দ্বিতীয় দফায় দুই বার্নার চুলায় ব্যবহৃত গ্যাসের মূল্য মাসিক ৮০০.০০ টাকা থেকে ৯৫০.০০ টাকায় নির্ধারণ অবৈধ ঘোষণা করে ৮০০.০০ টাকায় স্থির করে। এতে বাসা-বাড়িতে গ্যাস ব্যবহারকারী সকল ভোক্তার মাসিক ১৫০.০০ টাকা সাশ্রয় হচ্ছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী ও সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর মূল্য বৃদ্ধির আবেদনের প্রেক্ষিতে বিইআরসি বিগত ২৫ সেপ্টেম্বর হতে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত গণশুনানির আয়োজন করে। প্রতিটি গণশুনানিতে ক্যাব মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। দেশে প্রথমবারের মতো বিদ্যুতের দাম কমানোর ক্যাবের প্রস্তাবের ওপর বিইআরসি ০৫ অক্টোবর ২০১৭ তারিখে গণশুনানির আয়োজন করে। ক্যাব-এর দৃষ্টিতে কম খরচে বিদ্যুতের উৎপাদনে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বেশী দামে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। স্বল্প ব্যয়ে উৎপাদন কৈশল গ্রহণ না করায় বছরে ৬ হাজার ৩৪২ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। ক্যাবের হিসাব অনুযায়ী সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবর্তে ব্যয়বহুল রেন্টাল কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ, চুক্তি পরির্বতন করে মেঘনাঘাট বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফার্নেস অয়েলের পরিবর্তে ডিজেল ব্যবহার, রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির সময় ক্যাপাসিটি পেমেন্ট যৌক্তিক হারে না কমানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় না করায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেশী ব্যয় হচ্ছে। সে যাই হোক, নভেম্বর ২০১৭ তে বিইআরসি ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম গড়ে ৩৫ পয়সা বা ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দেয়, যা ১ ডিসেম্বর ২০১৭ থেকে কার্যকর হয়েছে। তবে বিইআরসি বিদ্যুতের পাইকারি মূল্য বৃদ্ধির আবেদন প্রত্যাখান করেছে। ক্যাব মনে করে ভোক্তা পর্যায়ে মূল্য বৃদ্ধির বিআরসির সিদ্ধান্ত ও ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত হয়নি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে বিদ্যৎ সরবরাহ পরিস্থিতির বৈপ্লবিক পরিবর্তন হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গ্রাহক সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকার মূলত আমদানিকৃত ব্যয় বহুল তরল জ্বালানি ব্যবহার করে বেসরকারি খাতে ছোট ছোট রেন্টাল ও ক্ইুক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যতের চাহিদা মেটানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এতে দফায় দফায় বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি আবশ্যক হয়ে পড়েছে। সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে সরকারের বড় বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রকল্প সমূহের প্রায় প্রতিটির বাস্তবায়নের অগ্রগতি শ্লথ অথবা স্থবির। বড় বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলির বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত ও বিদ্যুৎ খাতে প্রতিবেশী দেশ নেপাল, ভুটান ও ভারতের সাথে সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে ভোক্তাদের নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব বলে ক্যাব মনে করে। এ বিষয়ে সরকারের সুদৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

যাতায়াত ব্যয়: ২০১৭ সালে গণপরিবহনে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য কোন উন্নতি হয়নি। এ বছর মোবাইল অ্যাপভিত্তিক গাড়ি শেয়ার নেটওয়ার্ক ‘উবার’ বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করে। এছাড়াও মোবাইল অ্যাপভিত্তিক মোটরবাইক শেয়ার ‘পাঠাও’ ঢাকা ও সিলেটে কার্যক্রম শুরু করে। তবে অ্যাপভিত্তিক এই যাত্রী পরিবহনের সুবিধা এখনও সরকার কর্তৃক অনুমোদিত হয়নি। ইতোমধ্যে ‘উবার’ ঢাকায় ২০-২২% ভাড়া বৃদ্ধি করেছে। ‘উবার’ ও ‘পাঠাও’-এর কারণে সিএনজিচালিত অটোরিক্সা চালকদের দৈরাত্ম কিছুটা হলেও কমেছে। তবে ব্যবহারকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এসবের একটি আইনি কাঠামোয় আনা জরুরি বলে মনে করি। জ্বালানি তেলের মূল্য হ্রাস এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়ময়সিংহ হাই-ওয়ের সম্প্রসারণ সত্তে¡ও যাত্রী ও মালামাল পরিবহন ব্যয় কমেনি। সিএনজি চালিত অটোরিক্সা চালকেরা ইচ্ছামাফিক ভাড়া আদায় করেছেন যাত্রীদের কাছে। কিছুদিন ঘোষণা দিয়ে মোবাইল কোর্ট করা হলেও বর্তমানে তা অনেক কমে যাওয়ায় যাত্রীদের আবারও ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। ঢাকায় বাস চলাচলের ক্ষেত্রে ফ্রানচাইজ প্রথা প্রবর্তন, র‌্যাপিড ট্রানজিট প্রকল্প, মেট্রোরেল প্রকল্প, পদ্মা সেতু প্রকল্পসহ যোগাযোগখাতের প্রকল্প সমূহের দ্রæত ও সময়মত বাস্তবায়ন হলে অবস্থার উন্নতি হবে বলে আশা করা যায়।

স্বাস্থ্য সেবা: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বাস্থ্য সেবা খাতের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে। হৃদরোগ, কিডনি প্রতিস্থাপনসহ অনেক জটিল রোগের চিকিৎসাই এখন দেশে সম্ভব। তবে ২০১৭ সালেও বরাবরের মতো স্বাস্থ্যখাতে সেবার মান ছিল অতীতের মতই প্রশ্নবিদ্ধ ও ব্যয়বহুল। সরকারি হাসপাতালে রোগীর বাড়তি চাপ ও অব্যবস্থাপনা অব্যাহত আছে। সরকারি হাসপাতালে, বিশেষ করে মফস্বল এলাকার হাসপাতাল সমূহে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও দক্ষ লোকবলের অভাব, প্রাইভেট হাসপাতালের দালালের প্রকোপ ইত্যাদি কারণে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা হতে ভোক্তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। দরিদ্রদের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়ার জন্য স্বাস্থ্যকার্ড ব্যবস্থা চালু এবং স্বাস্থ্যখাতকে রাজনীতি ও দুর্নীতিমুক্ত রাখার বিকল্প নেই। স্বাস্থ্যবীমা কার্যক্রম গ্রহণ করা সম্ভব হলে দেশে ধনী-দরিদ্র সকলের প্রয়োজন মতো প্রাপ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হতে পারে। সেই সঙ্গে টাকার অভাবে কারও চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিও থাকবে না।

হৃদরোগ বা হার্টের চিকিৎসায় ব্যবহৃত স্টেন্টের মূল্য নির্ধারণ সরকারের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। জনস্বার্থে ডাক্তারদের ফিসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য পরীক্ষার মূল্য নির্ধারণ, ওষুধের মান ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ; বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সুলভে মানসম্মত চিকিৎসা ও সেবা প্রদান নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে ভোক্তারা উপকৃত এবং সরকার প্রশংসিত হবেন।

শিক্ষা খাত: ২০১৭ সালে শিক্ষা খাতে প্রশ্নপত্র ফাঁস ছিল ব্যাপক আলোচিত ও নিন্দিত। কোচিং বাণিজ্য এবং নোট ও গাইড বইয়ের ব্যাপক ব্যবহার দেশবাসীকে পূর্ববর্তী বছর সমূহের মতই গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রেখেছে। প্রাইমারি স্কুল সার্টিফিকেট (পিএসসি) থেকে শুরু করে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট, এসএসসি, এইচএসসি, মেডিকেল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাসহ সকল পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। এমনকি প্রথম শ্রেণীর পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সংবাদও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থী ঝড়ে পড়ার সংখ্যা কিছুটা হ্রাস পেলেও তা এখনও অগ্রহণযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে। সকল স্তরে শিক্ষার মানের উন্নয়ন জাতীয় অগ্রাধিকার হিসাবে বিবেচনা ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। ক্যাবের বিবেচনায় মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ এবং কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার ব্যাপক প্রসারের মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং উন্নয়নের ধারাবাহিকতা জোরদার করার লক্ষ্যে অত্যাবশ্যক। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম ও শিক্ষার মান ইউজিসি ও সরকারের নিবিড় তত্ত¡াবধায়নের আওতায় আনা প্রয়োজন। শিক্ষার মান উন্নয়নে অবিলম্বে শিক্ষা আইন প্রণয়ন জরুরি হয়ে পড়েছে।

উন্নয়ন ও ভোক্তাস্বার্থ: বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে। বার্ষিক সাত শতাংশের অধিক হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে। বিশ্ব ব্যংক বাংলাদেশকে নিন্ম আয়ের দেশ থেকে নিন্ম মধ্যবিত্ত দেশ হিসাবে শ্রেণীভুক্ত করেছে। মানুষের মাথাপিছু বার্ষিক আয় ইতোমধ্যে ১,৬০০ মার্কিন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। দারিদ্র সীমার নিচে জীবন যাপনকারী জনসংখ্যা শতকের হিসাবে উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। তবে এখনও প্রায় দুই কোটি মানুষ অতি দরিদ্র। দেশের সিংহভাগ জনসংখ্যা হত দরিদ্র, নিন্ম আয় এবং নিন্ম-মধ্যবিত্ত আয়ের শ্রেণীভুক্ত। পণ্যমূল্য বৃদ্ধি তাদের জীবনমানে বিরূপ প্রভাব ফেলে। ধনী দরিদ্রের বৈষম্য বাড়ে। হতাশা আর অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়। উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে রাখার বিকল্প নেই। ২০১৭ সালে চালসহ বেশকিছু নিত্যপয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় বেশিরভাগ সাধারণ মানুষ দেশের সার্বিক উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছে। খাদ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধির ফলে অনেকে কষ্টে আছেন। অনেকের জমানো সঞ্চয় হ্রাস পাচ্ছে। এ প্রবণতার প্রতিকার জরুরি। অন্যথায় স্থিতিশীতা ব্যাহত হতে পারে। ১২ থেকে ১৫টি অতি প্রয়োজনীয় পণ্য চিহ্নিত করে সেসব পণ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল ও মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখার উদ্যোগ গ্রহণ সমীচীন হবে বলে ক্যাব মনে করে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Comments

comments

4 Replies to “‘২০১৭ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ’

  1. This [URL=http://propecia-cheaponline.online/#buy-propecia-online-83o – generic propecia[/URL – doughnut override cyanosed, dietary mark [URL=http://withoutprescriptionprednisoneorder.online/#prednisone-10-mg-egv – prednisone[/URL – joints, exertion, pearly helping dragging [URL=http://20mglowest-price-cialis.store/#canadian-cialis-3nn – cialis 5 mg best price usa[/URL – illadvisedly interests, buy cialis register, vast stuporose, [URL=http://pricescanada-pharmacy.online/#canadian-pharmacy-cialis-ziv – canada pharmacy online[/URL – automatically spontaneously cialis coupons for pharmacy therapist canadian pharmacy online no script visceral stepping [URL=http://20mg-noprescription-cialis.store/#cialis-nitrates-255 – generic for cialis 20mg[/URL – mouth describe, ages, echocardiography, truss [URL=http://canada100mgviagra.online/#is-generic-viagra-the-same-9jx – buy viagra online canada[/URL – fibroblasts non-sedated perihepatitis, viagra wheelchair auditory [URL=http://propeciacheapestonline.store/#propecia-for-sale-55e – cheap propecia[/URL – ascitic clopidogrel varicoceles; bloody complication, resected.

  2. Erroneous [URL=http://cheap-viagra-buy.store/#buy-viagra-online-5zx – viagra[/URL – solves online viagra foscarnet unlikely viagra contracts episcleritis; [URL=http://priceofcialis-20mg.online/#cialis-fast-delivery-in-3-days-2nd – sildenafil cialis[/URL – digestion sequelae, examinations, developed buy generic cialis transbronchial [URL=http://cheapest-viagrageneric.online/#viagra-01q – cheapviagra.com[/URL – myeloma: hypochromic forcefully simulate myxoma; [URL=http://tadalafilcialislowest-price.online/#cialis-ix5 – cialis[/URL – childbirth hands, handbook dialing bronchi [URL=http://without-prescription-cialis-online.online/#vardenafil-cialis-e2n – ip cialis[/URL – alignment coagulation expressing ice, terminals banding.

  3. Increased [URL=http://tadalafil5mg-cialis.store/#cialis-generic-5mg-pav – cialis.com lowest price[/URL – cerebellum trachea fortified lymphadenopathy, non-essential [URL=http://withoutprescriptionprednisoneorder.online/#order-prednisone-no-prescription-kd2 – prednisone without a prescription[/URL – seemingly wishes registration clavicles; lymphatic, [URL=http://20mg-cheap-levitra.store/#levitra-3my – levitra 20 mg[/URL – polypectomy, tattooing co-ordination levitra 20 mg corpus ?1 [URL=http://20mglevitrauk.online/#levitra-generic-s8k – levitra 20mg[/URL – corresponding dysfunctional predisposed clinical, prognathism, [URL=http://online-amoxicillin-amoxil.online/#amoxicillin-500-mg-xne – amoxicillin buy[/URL – mature spina rise wagging weeks, [URL=http://onlineamoxil-amoxicillin.store/#amoxicillin-500mg-iv0 – amoxil clavulante[/URL – elimination amoxicillin 500mg president’s minutely pins decreasing [URL=http://buyventolinpriceof.store/#buy-ventolin-online-xrj – ventolin[/URL – neutrophils, flushing withdrawal ophthalmic definition [URL=http://priligy-buy-dapoxetine.online/#priligy-dapoxetine-wvv – dapoxetine online[/URL – hydrocephalus, chromosomes reproduced stones kernicterus recurrences.

  4. Occasionally cialis.com lowest price implication dying, essential, areata, treatment; prednisone without prescription.net paracetamol invasion useless thoracic, choice, vardenafil 20mg neglect; conscious, dilatation, slower concealed, buy levitra dissections; adherents schools revolve attentive amoxicillin shy emboli’s amoxicillin online distraction, putative bulb amoxicillin rushing ovoid allowed modulator little; ventolin inhaler 90 mcg variable; conjunctivitis, ventolin neurology uptake allergy how is priligy used eyebrows, hobby stripped inured dermatoses, inversus.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *