সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবনের অনেক কিছুই বদলে যায় : আরফিন রুমি

দেশের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক আরফিন রুমি। কোনো এক অভিমান থেকে হঠাৎ করেই ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে সঙ্গীত থেকে বিদায় নেন। সেই অভিমান কাটিয়ে দীর্ঘ ১৮ মাস পর আবারও গানে ফিরেছেন তিনি।

এরই মধ্যে হাতে নিয়েছেন একটি চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব। আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর এই শিল্পীর জন্মদিন। দীর্ঘদিন পর গানে ফেরা, জন্মদিন ও অন্যান্য প্রসঙ্গ নিয়ে তারাঝিলমিলের মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। তার সঙ্গে কথা বলেছেন এইচ সাইদুল

যুগান্তর: দীর্ঘদিন একেবারেই যোগাযোগের বাইরে ছিলেন, কারণ কী?

আরফিন রুমি: আসলে সঙ্গীতাঙ্গনের কারও সঙ্গে এখন আর যোগাযোগ নেই বললেই চলে। সেলফোন ব্যবহার করি না। ফেসবুকেও খুব একটা আসি না। কারণ, কারও সঙ্গে কথা বললে বা কথা দিলে তা রাখতে হয়। তাই অনেকটা যোগাযোগের বাইরে নিজেকে রেখেছিলাম।

যুগান্তর: ‘গানে আর আমাকে পাওয়া যাবে না’- এমন ঘোষণা দেয়ার দিন ঠিক কী হয়েছিল যে, ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলেন?

আরফিন রুমি: আসলে অনেক বিষয় এক হয়ে গিয়েছিল। কাজ করার মানসিকতা আমার এখনও আছে। গান ছাড়া তো আর কিছু শিখিনি। এ ছাড়া অন্য কিছু করার ইচ্ছাও ছিল না। এখনও নেই। কিন্তু দুটি বিষয় আমাকে প্রায়ই কাঁদায়।

এক. শিল্পী বউ পেটায়। এ কালিমা আমার জীবনে মাখিয়ে দেয়া হয়েছে। অথচ আমি এমন জঘন্য কাজটি করিনি। আবার শ্রোতাদের মাঝে এমন এক বিরক্তিকর বিষয় এটি, যা আমাকে প্রায়ই কাঁদায়।

দুই. আমি যখন হাদিস-কোরআনের দিকে ঝুঁকলাম, তখন আমার কিছু ভক্ত দেখলাম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিচ্ছে, ‘লোকটা ভালো হওয়ার চেষ্টা করছে…সহ বিভিন্ন রকম পোস্ট। আমি কি খারাপ ছিলাম?

তাই তারা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিচ্ছে যে, আমি ভালো হতে চাচ্ছি। এমন ভাবতে ভাবতে নিজের সঙ্গে পেরে উঠতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছে কিছু একটা বাধা সামনে। তাই ওই দিন গান ছেড়ে দেয়ার ঘোষণা দিই।

যুগান্তর: গান আপনি ছাড়তে চাইলেও গান তো আপনাকে ছাড়ল না…

আরফিন রুমি: শিখেছি তো গান। গানের সঙ্গে অভিমান করে থাকা যায় না। আড়ালে ছিলাম। ব্যস্তও ছিলাম। এর মাঝেই অনেক গানের কথা ও সুর মাথায় এসেছিল। ভক্তরা এখনও আমাকে ভালোবাসেন। আপনারাও আসছেন আমার খবর নিতে। তাই অভিমান বুকে চাপা দিতে হয়। সব কষ্ট সহ্য করে, সামনে আরও ভালো গান করব ইনশাআল্লাহ।

যুগান্তর: হাতে এখন কী কী কাজ আছে?

আরফিন রুমি: ‘নন্দিনী’ নামে একটি ছবির সঙ্গীত পরিচালনা করব। কথা প্রায়ই চূড়ান্ত। গানও গাইতে পারি।

যুগান্তর: বর্তমানের সঙ্গীতাঙ্গনের অবস্থা কেমন বলে মনে করেন?

আরফিন রুমি: অবশ্যই ভালো। সবাই ব্যস্ত সময় পার করছেন। দর্শক-শ্রোতারা নতুন নতুন গান পাচ্ছেন। তবে সবাইকে আরও যত্নবান হওয়া দরকার। একটা গানে দু-চার দিনে অনেক ভিউ হলেই তো গানটি জনপ্রিয় হয় না। তাই গানের কথা, সুর ও সঙ্গীতের বিষয় যত্নবান হতে হবে।

যুগান্তর: সঙ্গীতে এখন ভিউ একটা বিষয়। এখন অনেকে ভিউয়ার্সের সংখ্যা গণনা করে তারকা হয়। বিষয়টি কীভাবে দেখেন?

আরফিন রুমি: এটা বিশেষ কোনো বিষয় নয়। আমি একটা উদাহরণ দিতে চাই। শাফিন আহমেদ ভাইয়ার লিজেন্ড গানটির ভিউ কত? ভিউ কম বলে কি তিনি তারকা নন? তিনিই তো প্রকৃত লিজেন্ড। আবার দেখা গেছে, খারাপ একটা ভিডিওতে অনেক ভিউ। কথা হল, গানে ভিউ কোনো বিষয় নয়, এটা মানসিক একটা প্রশান্তি ছাড়া আর কিছুই নয়।

যুগান্তর: প্রায় ১৮ মাস আগে সঙ্গীতাঙ্গনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারবেন?

আরফিন রুমি: আসলে সময়ের সঙ্গে জীবনের অনেক কিছু বদলে যায়। আবার নতুন কিছুর আবির্ভাব ঘটে। দীর্ঘ বিরতিতে ধর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকার পাশাপাশি আমি সঙ্গীতের বিভিন্ন বিষয়ে চর্চা করেছি। অনেক অজানা বিষয় সম্পর্কে ধারণা নিয়েছি। বিগত ১৮ মাস ধরে নতুন অনেক গান এসেছে, আমি শুনেছি। বর্তমানে সঙ্গীতে ফিরে কেমন গান করা উচিত- এ বিষয়ে অনেক ধারণার জন্ম হয়েছে আমার। আশা করি দর্শকদের চাহিদা অনুযায়ী ভালো গান উপহার দিতে পারব।

যুগান্তর: সঙ্গীত জীবনের এই অবস্থানে এসে, কোনো ভুল করেছেন বলে মনে হয় কি?

আরফিন রুমি: আমি এটাকে ভুল বলব নাকি অন্য কিছু বলব জানি না। চারদিকে যখন আমার গান নিয়ে একটা উল্লাস শুরু হল, তখনই অনেক প্রযোজনা কোম্পানি আমাকে ফোন দিতে লাগল।

আমি আসলে সবার কথা রাখতে পারিনি, সম্ভবও ছিল না। এ জন্য অনেকের সঙ্গে আমার যোগাযোগে হেরফের হল। আমি তো মানুষ, যেখানে আমি ১০টি গানের কাজ করতে পারব সেখানে আমাকে ৩০-৫০টা দিলে তো হবে না। কাজও ভালো হবে না।

সে জন্য অনেক কাজ আমি ইচ্ছা থাকলেও করতে পারিনি ব্যস্ততার কারণে। আমার মনে হচ্ছে সেটাই আমার ভুল ছিল।

যুগান্তর: গানে নকলের প্রবণতা দেখা দিয়েছে, এটা আগেও ছিল। জনপ্রিয় শিল্পীরাও এমন করছেন। শ্রোতারা সহজেই তা ধরতে পেরেছেন। এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী?

আরফিন রুমি: একটি গানের শুধু সুরের বিষয় দর্শক-শ্রোতারা সহজেই ধরতে পারেন। এ সুরটা ওই গান থেকে নকল করা হয়েছে বা এমন কিছু। তার বাইরেও গানে অনেক কিছু নকল বা চুরি হয় বা চুরি করা যায়।

যারা অডিও নিয়ে কাজ করেন তারা অবশ্যই বিষয়টি জানবেন। প্রথম কথা হচ্ছে, নকল যদি বলে করা হয় তাতে দোষের কিছু নয়। এর বাইরে দর্শক-শ্রোতাদের সঙ্গে প্রতারণা করা ঠিক নয়। গানের রিমিক হয়। ছায়া অবলম্বন করা হয়। এটি বড় কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা হল, শ্রোতারা তো একজন শিল্পীকে ভালোবাসেন। তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা ঠিক নয়।

যুগান্তর: গান ছাড়ার কিছুদিন আগেও আপনাকে বাউল আবদুল করিমের গানে কিছুটা প্রভাবিত হতে দেখা গেছে…

আরফিন রুমি: ঠিক বলেছেন। কিছুটা নয়, পুরোপুরি প্রভাবিত হয়েছি। আমি কোনো একটা পত্রিকা বা ম্যাগাজিনে তার একটি সাক্ষাৎকার পড়েছিলাম। তারপর তাকে নিয়ে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করেছি। তার জীবনী পড়েছি, তিনিও অনেক অভিমানি ছিলেন।

সঙ্গীত জীবনের বেশিরভাগ সময় নির্জনে কাটিয়েছেন। তার অভিমানের কথা এখন হয়তো সবাই জানেন। তাকে অনেকেই এখন মূল্যায়ন করছেন। তার গান, গানের কথাগুলো সাধারণ মানুষের হৃদয়ে পুরোপুরি গেঁথে গেছে। আর তিনিও আমার মনে গেঁথে আছেন।

যুগান্তর: গানে দীর্ঘদিন না থাকায় আপনার ভক্ত-শ্রোতা কিছুটা কমেছে, এমনটি কি মনে হয়?

আরফিন রুমি: নিয়মিত যে কোনো কাজে যদি হঠাৎ কেউ অনিয়মতি হয় তবে মানুষ তাকে মোটামুটি ভুলবে বা ভুলে যাবে এটাই স্বাভাবিক। তবে একটি বিষয় আমাকে আনন্দ দেয়, ছোটবেলায় জেমস ভাইয়ের গান শুনতাম, অনুভূতি ছিল অন্যরকম।

এখন কিন্তু তার নতুন কোনো গান প্রকাশিত হয়নি। তার গাওয়া আগের গানগুলো আমার এখনও ভালো লাগে। আমি শুনিও তার গান। ঠিক একইভাবে বলতে চাই, আমাকে, আমার গান যারা ভালোবাসেন তারা এখনও আমার গান শুনবেন এবং নতুন গানের অপেক্ষায় থাকবেন আমি আশা করি।

যুগান্তর: ২৩ সেপ্টেম্বর আপনার জন্মদিন। দিনটি আপনার কাছে আসলে কী?

আরফিন রুমি: আমার কাছে জন্মদিনের মানে হচ্ছে, মায়ের সঙ্গে দেখা করা। মায়ের জন্যই এ পৃথিবী দেখলাম, আমি আজ এ অবস্থানে আসছি। আমার মা পৃথিবীতে না এলে তো আমি আসতে পারতাম না। তাই জন্মদিন এলে মনে হয়, মায়ের সঙ্গে দেখা করার দিন।

যুগান্তর: জীবনের কোন বিষয়টি আপনার কাছে খুব খারাপ লাগে?

আরফিন রুমি: ব্ল্যাকমেইল সহ্য করতে পারি না। সহ্যশক্তি বৃদ্ধি করতেই এতদিন আড়ালে ছিলাম। আমি আগেও প্রতারণা পছন্দ করতাম না। এখনও করি না।

যুগান্তর: ভক্ত-শ্রোতাদের জন্য আপনার বক্তব্য কী?

আরফিন রুমি: ভক্ত-শ্রোতাদের একটা কথাই বলতে চাই, মনের কথা শুনুন। নিজেই নিজেকে শাসন করুন। যারা গান করতে চায় তারা অবশ্যই গানকে ভালোবাসতে হবে। গান শিখে আসতে হবে। সঙ্গীতাঙ্গনে তাড়াহুড়া বলে কিছু নেই। বাংলা গানকে ভালোবাসুন।

সুত্রঃ যুগান্তর

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Comments

comments