,

মনোনয়নপত্র বাতিল হলো যাঁদের

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাছাই শেষে আজ রোববার সারা দেশে বিভিন্ন দলের প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। ঋণখেলাপি, কারাদণ্ডাদেশ পাওয়াসহ নানা কারণে তাঁদের প্রার্থিতা বাতিল করেছেন সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তারা। মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, জাতীয় পার্টির (জাপা) মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার, বিএনপির নেতা মীর মো. নাছির উদ্দিন ও তাঁর ছেলে মীর মো. হেলাল উদ্দিনসহ অনেক নেতার।

নির্বাচন কমিশন সূত্র জানিয়েছে সারা দেশে ৭৮৬ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। তবে মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া প্রার্থীরা ৩, ৪ ও ৫ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশনে আপিল করতে পারবেন। আপিলের ওপর শুনানি হবে ৬, ৭ ও ৮ ডিসেম্বর।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ রোববার এক প্রেস কনফারেন্সে বলেন, রিটার্নিং অফিসাররা মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন। কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ কেন। আপিলের সুযোগ তো আছে। আপিল করা যাবে।

প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী যাঁদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে—

খালেদার তিনটি মনোনয়নপত্রই বাতিল: খালেদা জিয়া ফেনী-১, বগুড়া-৬ ও বগুড়া-৭ আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। দুটি মামলায় খালেদা জিয়ার সাজার কথা উল্লেখ করে ফেনীর রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদ উজ জামান তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল করেন। খালেদা জিয়া ছাড়াও ওই আসনে বিএনপির আরেক প্রার্থী ছাগলনাইয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি নূর আহম্মদ মজুমদার এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মিজানুর রহমান ও আবুল বাশার চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।

মামলায় সাজার বিষয়টি উল্লেখ করে বগুড়া-৬ ও ৭ আসনে খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল করেন বগুড়ার রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক ফয়েজ আহাম্মদ। বগুড়া-৬ আসনে বগুড়া পৌরসভার মেয়রের পদ থেকে পদত্যাগ না করায় খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা এ কে এম মাহবুবুর রহমানের মনোনয়নপত্রও বাতিল হয়েছে। রিটার্নিং কর্মকর্তা ফয়েজ আহাম্মদ বলেন, বগুড়া-৬ ও ৭ আসনে মনোনয়ন দাখিল করেছিলেন খালেদা জিয়া। দুর্নীতি মামলায় তাঁর দণ্ড হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে কারাগারে সাজা ভোগ করছেন। এ কারণে খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।

বিএনপি বগুড়া-৭ আসনে খালেদা জিয়ার বিকল্প প্রার্থী করেছিল গাবতলী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোরশেদ মিলটনকে। তবে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদ থেকে তিনি পদত্যাগ করেননি উল্লেখ করে তাঁর মনোনয়নপত্রও বাতিল করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।

এদিকে বগুড়া-৬ আসনে জাকের পার্টির ফয়সাল বিন শফিক এবং বগুড়া-৭ আসনে জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ও চিকিৎসকদের সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) জেলা সভাপতি মোস্তফা আলমের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। মোস্তফা আলম আওয়ামী লীগের হয়ে মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও তাঁর দলীয় মনোনয়ন না থাকায় তা বাতিল করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।

ঢাকা মহানগরে বাতিল ৫২ : ঢাকা মহানগরের মোট ১৫টি আসনে (ঢাকা-৪ থেকে ঢাকা-১৮) বিভিন্ন দলের ২১৩ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। এর মধ্যে ১৬১টি মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। বাতিল করা হয়েছে ৫২টি।

এর মধ্যে বিএনপির নেতা মির্জা আব্বাসের স্ত্রী ও ঢাকা-৯ আসনে বিএনপির প্রার্থী আফরোজা আব্বাসের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। ঢাকা-১৭ আসনে সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। ঢাকা-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী সেলিম ভূঁইয়ার মনোনয়নপত্রও বাতিল হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, সেলিম ভূঁইয়া ঋণখেলাপি। রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র বলছে, ঢাকা-৬ আসনে ১৩ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। এর মধ্যে তিনজনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। ঢাকা-৫ আসনে প্রার্থী হওয়ার জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ১৩ জন। ৯ জনের মনোনয়নপত্র গ্রহণ করা হয়েছে। ঢাকা-৪ আসনে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন ১৫ জন। বাতিল করা হয়েছে ৬ জনের। ঢাকা-৪ আসনে বিকল্প ধারার কবির হোসেনের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে।

মীর নাছির ও তাঁর ছেলের মনোনয়নপত্র বাতিল: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৫ আসনে বিএনপির নেতা ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর মো. নাছির উদ্দিন ও তাঁর ছেলে মীর মো. হেলাল উদ্দিনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। মামলা রয়েছে উল্লেখ করে ওই দুজনের মনোনয়নপত্র বাতিল করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল মান্নান।

সাকা চৌধুরীর ভাই-ভাতিজার মনোনয়নপত্র বাতিল: মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসি কার্যকর হওয়া সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর ভাই ও ভাতিজার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) ও চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসন থেকে সাকা চৌধুরীর ভাই গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং তাঁর ছেলে সামির কাদের চৌধুরী চট্টগ্রাম–৬ (রাউজান) আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। ঋণ খেলাপের কারণে তাঁদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়।

কাদের সিদ্দিকীর মনোনয়নপত্র বাতিল: খেলাপি ঋণের কারণে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি আবদুল কাদের সিদ্দিকীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। তিনি টাঙ্গাইল-৮ (সখীপুর-বাসাইল) এবং টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসন থেকে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। এ ছাড়া টাঙ্গাইল-১ ও টাঙ্গাইল-৬ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীসহ আরও অন্তত ১২ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। টাঙ্গাইলের জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. শহীদুল ইসলাম আজ রোববার দুপুরে যাচাই-বাছাইয়ের পর ঋণখেলাপিসহ বিভিন্ন ত্রুটির কারণে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এসব মনোনয়নপত্র বাতিল করেন।

জাপা মহাসচিব ও বিএনপির রনির মনোনয়নপত্র বাতিল: ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে পটুয়াখালী-১ আসনে জাতীয় পার্টির মহাসচিব (জাপা) এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদারের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। এ ছাড়া হলফনামায় স্বাক্ষর না থাকায় পটুয়াখালী-৩ আসনের বিএনপির প্রার্থী গোলাম মামলা রনির মনোনয়নপত্রও বাতিল করা হয়েছে। রোববার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. মতিউল ইসলাম চৌধুরী তাঁদের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেন।

রেজা কিবরিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল:হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনে গণফোরামের প্রার্থী অর্থনীতিবিদ রেজা কিবরিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। ঋণখেলাপির কথা উল্লেখ করে তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয় বলে জানিয়েছেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মাহমুদুল কবীর মুরাদ। রেজা কিবরিয়া সাবেক অর্থমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ছেলে। এ ছাড়াও সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরীসহ তিনজনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়ে ব্যর্থ হয়ে কেয়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন।

বিএনপির আসলামের মনোনয়নপত্র বাতিল: ঋণ খেলাপের কারণে বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। তিনি চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। বিএনপির আরেক প্রার্থী এ কে এম আবু তাহেরের মনোনয়নপত্রও বাতিল করা হয়েছে। তিনি দলীয় মনোনয়নের চিঠি জমা না দিয়ে দলটির প্রার্থী হতে চেয়েছেন।
এ আসনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল বাকের ভুঁইয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী সামছুল আলম হাসেমের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।

ইমরান এইচ সরকারের মনোনয়নপত্র বাতিল: ইমরান প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরসহ কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। তালিকায় দেওয়া তাঁদের সমর্থক ভোটারের সংখ্যায় কোনো ঘাটতি নেই। হয়তো ক্রমিক সংখ্যায় ভুল থাকতে পারে, যা সংশোধন করা যায়। তিনি আপিল করবেন। তথ্যগত ভুল থাকায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী মো. জাকির হোসেনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। তিনি রৌমারী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং সাবেক সাংসদ।

দুলুসহ ৬ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল:নাটোর-২ (সদর ও নলডাঙ্গা) আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। দুটি মামলায় তাঁর দণ্ডাদেশ থাকায় মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। জাতীয় পার্টির প্রার্থী আলাউদ্দিন মৃধার মনোনয়নপত্রও বাতিল হয়েছে। আজ রোববার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জেলার চারটি সংসদীয় আসনের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই বাছাই করা হয়। জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, দুটি মামলায় রুহুল কুদ্দুস তালুকদারকে নিম্ন আদালত দুই বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেন। ওই আদেশের বিরুদ্ধে তিনি হাইকোর্টে আপিল করলেও আদালত সাজা বহাল রাখেন। এ কারণে রিটার্নিং কর্মকর্তা তাঁর মনোনয়নপত্র গ্রহণ করেননি।

হিরো আলম টিকলেন না : বগুড়ার আশরাফুল ইসলাম আলম ওরফে হিরো আলমের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন।

প্রথম আলো থেকে নেওয়া।


     More News Of This Category