জাতীয়

ভ্যাপিং-এ ঝুঁকছে তরুণ সমাজ, বাড়ছে ক্যান্সারের ঝুঁকি!

সাজিদা মাহমুদ ব্যবসায়ী বাবার একমাত্র সন্তান। লেখাপড়া করছেন রাজধানীর স্বনামধন্য একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। বলা চলে সোনার চামুচ মুখে নিয়ে তার জন্ম। চাওয়ার আগেই সব কিছু পেয়ে যায় সে। নবম শ্রেণির ছাত্র হয়েও ঢাকার আর ১০ টা শিক্ষার্থীর চেয়ে সাজিদার জীবন অনেক আলাদা তাই। নিজের বিলাসবহুল গাড়ি এবং বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে বেড়ানোই তার কাজ।

বিডিমর্নিং এর রির্পোটারের সাথে তার দেখা হয় একটি ভ্যাপিং শপে (ই-সিগারেটের দোকান)। গল্পের মাঝে সে তার জীবন-যাপনের বিস্তারিত জানান রির্পোটারকে। এমনকি তিনি যে ভ্যাপিং(ই-সিগারেট) এর জন্য যে যন্ত্রটি ব্যবহার করেন তার দাম ৩৮০ ডলার। যা সে সিঙ্গাপুর থেকে এনেছেন। একটু ভালো ফ্লেভারে উত্তরা থেকে ধানমন্ডির এই দোকানে এসেছেন বলে জানান তিনি।

বর্তমান সময়ে রাজধানীর তরুণদের মাঝে বেশ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে ভ্যাপিং বিষয়টি। ধানমন্ডি, উত্তরা, গুলশান, বনশ্রীর মোট ৪টি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলের উপরে একটি জরিপ চালিয়ে বিডিমর্নিং ইনভেস্টিগেশন সেল দেখেছে যে ,’ স্কুলগুলোর ৬ষ্ট শ্রেণি থেকে এ- ল্যাভেল পর্যন্ত প্রায় সকল ক্লাসের ছাত্র- ছাত্রীরা এই ভ্যাপিং এর সাথে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত।

কেনও ভ্যাপিং করছেন এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রায় ৮৮ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তর দিয়েছেন,’ এটিতে সাধারণ সিগারেট এর মত মুখে গন্ধ না করা এবং এর একাধিক ফ্লেভারে কারণেই তারা ব্যবহার করছেন।

ভ্যাপ বা ই-সিগারেট হচ্ছে ব্যাটারিচালিত ইলেকট্রনিক যন্ত্র। ২০০৭ সালে ধূমপানের অভ্যাস ছাড়তে এটি মার্কেটে বাণিজ্যিক ভাবে নিয়ে আসে আকেরিকার একটি প্রতিষ্ঠান।এতে অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান বাদ দিয়ে কেবল নিকোটিন সেবন করতে পারেন ব্যবহারকারী। সাধারণ ই-সিগারেটে থাকে একাধিক প্রকোষ্ঠ। এগুলোয় থাকে ব্যাটারি ও নিকোটিনের কার্ট্রিজ উত্তপ্ত হওয়ার মতো ক্ষুদ্র যন্ত্র। কার্ট্রিজে তরল নিকোটিন সরবরাহ করা হয়। পুনর্ব্যবহারযোগ্য নিকোটিনের কার্ট্রিজের দাম ৫-২০ ডলার। নিকোটিনের বদলে ফল, চকোলেট কিংবা অন্য ফ্লেভারেও পাওয়া ।

প্রথম দিকে এটি দেখতে হুবহু সিগারেটের মতো না হলেও সময় সাথে পাল্লা দিয়ে এর আকার এবং ধরনে পরিবর্তন এসেছে।আর এই ই-সিগারেট সর্বশেষ যে সংকরণ বাজারে পাওয়া যাচ্ছে সেই হচ্ছে ভ্যাপ।

ফ্লেভারটা(নিকোটিনের কার্ট্রিজ)হচ্ছে লেকট্রনিক সিগারেটের ভেতরে থাকে নিকোটিনের দ্রবণ। যা ব্যাটারির মাধ্যমে গরম হয়ে ধোঁয়া তৈরি করে।

পশ্চিমা বিশ্ব থেকে শুরু করে তৃতীয় বিশ্বে দেশগুলোতেও গত কয়েক বছর ধরে ইলেকট্রনিক সিগারেটের প্রচলন বেড়েছে কয়েকগুণ। কিন্তু এই জনপ্রিয়তার পরেও আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের পাঞ্জাব, মহারাষ্ট্র, জম্মু-কাশ্মিরে রাজ্যসহ ইউরোপের অনেক দেশে এখন এই সিগারেট নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে স্থানীয় সরকারের মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরগুলো।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যের বেশ কয়েকজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাধিক গবেষণাতে উঠে এসেছে, ব্যাটারি-চালিত এই ই-সিগারেটগুলো কোন অংশেই সিগারেটের চেয়ে কম ক্ষতিকর নয়।  যে বলা হয়েছে নিয়মিত এই যন্ত্র ব্যবহার করলে ব্যবহারকারী আক্রান্ত হতে পারে উচ্চরক্তচাপ, হার্ট-অ্যাটাক, নিউমোনিয়া , ক্যান্সারের মত ভয়ানক রোগে।

লন্ডনের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়, লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয় এবং নিউইয়র্কের ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের আলাদা তিনটি গবেষণাতে প্রায় একই তথ্য উঠে আসে । যেখানে বলা হয়, ই-সিগারেটের ফ্লেভার তৈরিতে যে রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহৃত হচ্ছে তা মানবদেহের ধমনী, শিরা এবং হৃদপিন্ডে প্রদাহ সৃষ্টি করে। যাতে মানব দেহের শিরায় নাইট্রিক এসিডের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। যার ফলে রক্ত চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি হচ্ছে। যাতে করে ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ও ক্যান্সারের ঝুঁকি। এমনকি সেবনকারী  আক্রন্ত হতে  নিউমোনিয়াতে।

এই বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে লেখা পড়া শেষ করে  বর্তমানে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যান্সার এপিডেমিওলজি বিষয়ে গবেষক হিসেবে কর্মরত ডাঃ সাজেদুর রহমান। তার সাথে কথা হলে তিনি বিডিমর্নিং ইনভেস্টিগেশন সেলকে জানান,ই-সিগারেট হচ্ছে ধূমপান ছাড়ার জন্য মন্দের ভালো। কিন্তু ই- সিগারেটে ফ্লেভারে(নিকোটিন) ব্যবহার হচ্ছে  প্রায় ৬৯টি মত রাসায়নিক দ্রব্য। যা সরাসরি ক্যানসারের জন্য দায়ী।

সাজেদুর রহমান আরও বলেন, আপনাদের ফোন পাওয়ার পরে আমি বাংলাদেশের ভ্যাপিং এর বর্তমান অবস্থা জানার জন্য সোশ্যাল মিডিয়াতে ঘুরাঘুরি করে একটু অবাক হয়েছি। ইলেকট্রনিক সিগারেটগুলোকে কম ক্ষতিকর বলে প্রচার করা হচ্ছে  এখানে, যা মোটেও সত্য নয়।

প্রসঙ্গত,৩ বছর আগে ২০১৫ সালে ক্যালিফোর্নিয়া হেলথ ডিপার্টমেন্ট অব পাবলিক হেলথে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলেছিলেন, ই-সিগারেট মানুষের জন্য হুমকিস্বরূপ এবং এটিকে আইনের আওতায় আনা উচিত।

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে প্রধান রাসায়নিক পরিক্ষক ড. দুলাল কৃষ্ণ সাহার কাছে ই- সিগারেট এর ফ্লেভার(নিকোটিন) নিয়ে কোনো পরিক্ষার ফলাফল আছে কি না জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, তাদের পরীক্ষাগারে এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনো রাসায়নিক পরিক্ষায় হয়নি।

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে অতিরিক্ত মহাপরিচালক সঞ্জয় কুমার চৌধুরী সাথে কেন এই মরণব্যধি ই-সিগারেট/ ভ্যাপ কে কেনো মাদকের তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে না, এমন প্রশ্নের নিদিষ্ট কোনো উত্তর না দিতে পারলেও তিনি বিডিমর্নিং এর ইনভেস্টিগেশন সেলকে নিশ্চিত করেন সামনের বোর্ড মিটিং এর সময় ভ্যাপিং / ই-সিগারেট  এবং এর ফ্লেভারের বিষয়টি তুলে ধরবেন।

-বিডিমর্নিং

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *