বিশ্বজুড়ে পতিতা ও পতিতাবৃত্তির আদ্যোপ্রান্ত!

বিশ্বজুড়ে পতিতা ও পতিতাবৃত্তির আদ্যোপ্রান্ত!

পতিতা,বেশ্যা,গণিকা শব্দটি শুনলেই শরীর ঘিনঘিন করে।সমাজের এধরনের কারো সাথে পরিচিত হলে সাধারণত আমরা লোক দেখানো ঘৃনার চোখে দেখি।হয়ত লোকচক্ষুর অন্তরালে আমরাই তাদের খরিদ্দার।বড় আশ্চর্য,বড় কষ্টের। তাদেরকে সমাজে মেনে নেওয়া একটি মারাত্মক অপরাধ বলে মনে করে ক্যানসারে আক্রান্ত সমাজের বিচার বিভাগের সমাজপতিরাও।কেও ভাবে না একটু সহযোগীতা,সাহস,ভালবাসা,পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তারাও সুন্দর সমাজের বাসিন্দা হয়ে বাচতে পারে।

অর্থের বিনিময়ে যৌনতা বিক্রির ইতিহাস সুপ্রাচীন। ওয়েবস্টার অভিধান মতে, সুমেরিয়ানদের মধ্যেই প্রথম পবিত্র পতিতার দেখা মেলে। প্রাচীন গ্রন্থাদিসূত্রে, যেমন ইতিহাসের জনক হিসেবে খ্যাত হিরোডেটাস (খ্রিষ্টপূর্ব ৪৮৪-খ্রিষ্টপূর্ব) এর লেখায় এই পবিত্র পতিতাবৃত্তির বহু নমুনা পাওয়া যায়। যেটি প্রথম শুরু হয়েছিল ব্যাবিলনে। সেখানে প্রত্যেক নারীকে বছরে অন্তত একবার করে যৌনতা, উর্বরতা ও সৌন্দর্যের দেবী আফ্রোদিতির মন্দিরে যেতে হতো এবং সেবাশুশ্রূষার নমুনা হিসেবে একজন বিদেশীর সাথে নামমাত্র মূল্যে যৌনসঙ্গম করতে হতো। একই ধরনের পতিতাবৃত্তির চর্চা হতো সাইপ্রাস এবং করিন্থেও। এটি বিস্তৃত হয়েছিল সার্দিনিয়া এবং কিছু ফিনিশীয় সংস্কৃতিতে।বিশেষ করে ইস্টার দেবতার সম্মানে। ফিনিশীয়দের মাধ্যমে ক্রমশ এটি ভূমধ্যসাগরের অন্যান্য বন্দর -শহরগুলোতেও সংক্রমিত হয়।যেমন সিসিলি, ক্রটন, রোসানো ভাগলিও, সিক্কা ভেনেরিয়া এবং অন্যান্য শহরে। এক্ষেত্রে অনুমান করা হয় এশিয়া মাইনর, লাইদিয়া, সিরিয়া ও এট্রাকসনের নামও। ইসরায়েলে এটি একটি সাধারণ ব্যাপার ছিল, যদিও অনেকেই তখন এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সমাজে পতিতারা ছিল স্বাধীন এবং তারা বিশেষ ধরনের পোশাক পরিধান করা ও কর দেবার ব্যাপারে আদিষ্ট ছিল। গ্রিক হেটায়েরার মতো জাপানে ছিল জেইসার।

কৌটিল্যের “অর্থশাস্ত্র” থেকে পতিতা ও পতিতাবৃত্তি সংক্রান্ত ভারতবর্ষীয় চিত্র পাওয়া যায়। কী বলছে অর্থশাস্ত্র ? অর্থশাস্ত্র বলছে দেহব্যাবসা একটি প্রতিষ্ঠিত প্রথা। পুরোপুরি ঘৃণিত বা গোপনীয় নয়। কৌটিল্যের সময় দেহব্যাবসা শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত হয় বলে জানা যায়, যে শিল্পের নাম ছিল বৈশিক কলা। বিশেষজ্ঞরা এ শিল্পের চর্চা করতেন এবং শিক্ষা দিতেন। অর্থশাস্ত্রে, এমনকি গণিকাধ্যক্ষেরও উল্লেখ আছে। তাঁর কাজ ছিল রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে গণিকাদের সংগঠিত ও দেখভাল করা।
পাশ্চাত্য সভ্যতার জতুগৃহ প্রাচীন গ্রিকের এথেনাইয়ের একজন কবি সোলোন। যিনি তৎকালীন গ্রিকের সাতজন জ্ঞানী লোকের একজন হিসেবে গণ্য হতেন।খ্রিষ্টপূর্ব ছয় শতকে এথেন্সে প্রথম পতিতালয় স্থাপন করেন। এই পতিতালয়ের উপার্জন দিয়ে আফ্রোদিতিকে নিবেদন করে একটি মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল। মধ্যযুগে ইউরোপে ব্যাপকভাবে পতিতাবৃত্তি ছড়িয়ে পড়ে এবং পৌরসভার মাধ্যমে পতিতালয়সমূহ পরিচালিত হতে থাকে।প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ ও কূটনীতিক মেগান্থিনিস এক ধরনের পরিদর্শকের কথা বলেছেন, যারা রাজ্যের সকল কার্যক্রমের ওপর গণিকাদের সহায়তায় নজর রাখতেন এবং রাজার কাছে গোপন রিপোর্ট দিতেন।

অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ হাইজিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ-এর এক সমীক্ষা থেকে জানা যায়, ৪৯.১০ শতাংশ যৌনকর্মী এ পেশায় এসেছেন সীমাহীন দারিদ্র্যের নিষ্পেষণের কারণে।২১.৫৬ শতাংশ এসেছেন পারিবারিক ডামাডোলের শিকার হয়ে, ১৫.৫৬ শতাংশ অন্য জীবিকার মিথ্যা আশার হাতছানিতে, ৮.৬৭ শতাংশ জেনেশুনে স্বেচ্ছায় এসেছেন এবং বলপূর্বক ধরে এনে এ ব্যাবসায় লাগানো হয়েছে ০.৪৪ শতাংশকে। যারা মনে করেন যৌনকর্মীরা কেবল বংশপরম্পরায়ই এ পেশায় আসে, তাদের জন্য এই তথ্যটি দেওয়া যায় যে কলকাতার মোট যৌনকর্মীর মধ্যে সে হার মাত্র ৪.৬৭ শতাংশ।

পাশাপাশি কৌতূহলী পাঠকদের জন্য এখানে আরেকটি চিত্র তুলে ধরা যায়, যে-চিত্রটি ধারণা দেবে যে এদের এ পেশায় আসার মাধ্যম কারা। এসব যৌনকর্মীর ৬০.৬৭ শতাংশই এ পেশায় এসেছেন বন্ধু ও প্রেমিকের প্রতারণার শিকার হওয়ার মাধ্যমে, ৭.১১ শতাংশ দালালদের মাধ্যমে, ৭.৩৩ শতাংশ দালালদের দ্বারা বিক্রিত হয়ে, ৪ শতাংশ আত্মীয়দের মাধ্যমে, ২.২২ শতাংশ আত্মীয়দের দ্বারা বিক্রিত হয়ে এবং নিরুপায় হয়ে নিজেরাই এ পেশায় আত্মসমর্পণ করেছে ১৮.৬৭ শতাংশ। এইসব যৌনকর্মীদের ক্রেতা কারা ? সবাই, সমাজের সর্বস্তরের মানুষ। এক আলাপে জানা গেছে, রাজনীতিক-নেতা, অভিনেতা, সাংবাদিক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিশেষ বাহিনী, কোনো টক শোয়ে যৌনকর্মের বিরুদ্ধে লম্বা লম্বা লেকচার মারা ব্যক্তিত্ব, উর্দি-পরিহিত পুলিশসহ সমাজের কথিত অভিজাত থেকে নিচুতলার সব শ্রেণির মানুষই এখানকার নিত্য অতিথি, খরিদ্দার, বাঁধা-বাবু।যৌন-ব্যাবসায় জড়িত এমন অনেক মেয়েও পতিতা প্রথার পক্ষে কথা বলছেন। তারা বলছেন, ‘অন্য যে-কোনো শ্রমের মতো বেশ্যাবৃত্তিও শ্রম’। আরও এক ধাপ এগিয়ে কেউ কেউ বলছেন, এই শ্রম নাকি সমাজে মেয়েদের ক্ষমতায়নে সাহায্য করছে।

বর্তমানের নিউ অফিসিয়াল ডাটা মতে, ব্রিটেনের ইকোনোমিতে পতিতা বৃদ্ধি ও এসকর্ট সার্ভিসের মাধ্যমে বছরে ৫বিলিয়নের উপরে রাজস্ব সংগৃহীত হয়ে থাকে বা যোগান দিয়ে চলে। এ হিসেব খোদ ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিক ব্যুরো এবং একজন প্রোস্টিটিউট ব্যবসায়ের সাবেক কর্তা ব্যক্তি নিজে বর্তমানে একজন ডক্টরেট ডিগ্রীধারী-সেই ডঃ ব্রোক ম্যাগন্যান্টির তথ্য মতেই প্রকাশিত হয়েছে আনুষ্ঠানিক ডাটা।

ডঃ ব্রোক(মিস) এর মতে এই খাতে অর্থাৎ প্রোষ্টিটিউশন এর খাত থেকে ব্রিটেনের ইকোনোমি ৫বিলিয়ন নয় বরং ১০বিলিয়ন পর্যন্ত আয় করে থাকে। কারণ তিনি বলেছেন, ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিক ব্যুরো যাদের ইন্টারভিউ নিয়েছে, ডঃ ব্রোক এর মতে প্রচলিত পতিতা ছাড়াও এসকর্ট সার্ভিস এবং নেদারল্যান্ডস কেন্দ্রিক বা ভিত্তিক পতিতা ব্যবসা এবং বর্ডার কেন্দ্রিক পতিতা ব্যবসাও রয়ে গেছে এই হিসেবের বাইরে। যা থেকে তিনি মনে করেন ১০ বিলিয়ন পর্যন্ত আয় হয়ে থাকে, যা রয়ে গেছে ন্যাশনাল ব্যুরোর হিসেবের ডাটার বাইরে।

পতিতাপ্রথাকে বৈধ করা মানে নারী নির্যাতনকে বৈধ করা। যে রাষ্ট্রে পতিতা প্রথা বৈধ সেই রাষ্ট্র সত্যিকার কোনও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়। গণতন্ত্র মানবাধিকার নিশ্চিত করে, নারী-পুরুষের সমানাধিকার নিশ্চিত করে। কোনও সভ্যতা বা কোনও গণতন্ত্র মানুষের উপর নির্যাতনকে ছল-ছুতোয় মেনে নেওয়ার চেষ্টা করে না। করতে পারে না। যদি করে, সেই গণতন্ত্রের নাম নিতান্তই পুরুষতন্ত্র, আর সেই সভ্যতার নাম বর্বরতা ছাড়া অন্য কিছু নয়”।

পতিতাবৃত্তি বা বেশ্যাবৃত্তিকে রোধ করতে হলে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি সরকারকেও এর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। সামাজিকভাবে সকলে মিলে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুললে আশা করা যায় বেশ্যাবৃত্তি বা বেশ্যালয়কে সমাজ থেকে ধ্বংস করা যাবে। লাস ভেগাস, ম্যাকাউয়ের বিখ্যাত বেশ্যালয়গুলি অতীত হয়ে যাক।

তবে জেনে রাখুন ৯২% যৌনজীবী কোন না কোন যৌন রোগে আক্রান্ত। যার মধ্যে বেশীরভাই মারাত্নক ও দীর্ঘমেয়াদি। বিভিন্ন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ফাংগাস ইত্যাদি একজন পেশাদার যৌনজীবীর শরীরকে নিরাপদ পোষক হিসেবে ব্যবহার করে। ক্ষতযুক্ত প্রশস্ত যৌনাঙ্গ যৌনজীবীদের একটা সাধারন বৈশিষ্ট্য। যতই কনডম বা অন্যান্য ব্যবস্থা নেয়া হোক না কেন এই সকল জীবাণুগুলো অতি উচ্চমাত্রার সংক্রামক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। কোন লাভ হয় না।

Sharing is caring!

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *