পবিত্র ঈদুল আজহা : ত্যাগেই খুশি ত্যাগেই মুক্তি

‘ঈদুজ্জোহার চাঁদ হাসে ওই/এলো আবার দুসরা ঈদ!/কোরবানি দে, কোরবানি দে,/শোন খোদার ফরমান তাকিদ…’—জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই কাব্যসুর যেন বাজতে শুরু করেছে মুসলমানদের প্রাণে। বছর ঘুরে আবারও ফিরে এসেছে পবিত্র ঈদুল আজহা। ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর মুসলিম উম্মাহর অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা। সারা বিশ্বের মুসলমানরা হিজরি বর্ষের দ্বাদশ মাস জিলহজের ১০ তারিখে ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ উদযাপন করে। বাংলাদেশে এই ঈদ বুধবার। মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে ঈদের আমেজ।

মানবমনে নৈতিকতা ও ত্যাগের মহিমাকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠার প্রবল প্রেরণা ও তাগিদে উদযাপিত হয় এ উৎসব। এই উদযাপনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আনুষ্ঠানিকতা। মহান আল্লাহতায়ালার আদেশে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর নিজ পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে আল্লাহর জন্য ত্যাগ তথা কোরবানি করার প্রস্তুতির কারণে সারা বিশ্বের মুসলমানরা আল্লাহর কাছে নিজেদের সোপর্দ করে দেওয়ার লক্ষ্যে পবিত্র হজের পরদিন ঈদুল আজহা উদ্যাপন ও পশু কোরবানি করে থাকে। 

দেশবাসীকে পবিত্র ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা জানিয়ে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। ঈদুল আজহার দিন রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনে ও প্রধানমন্ত্রী গণভবনে আমন্ত্রিত অতিথি ও সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন। কেন্দ্রীয়ভাবে জাতীয় ঈদগাহে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে।

ঈদের দিন রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সড়ক দ্বীপ জাতীয় ও ‘ঈদ মোবারক’ খচিত পতাকায় সুশোভিত হবে। সব সরকারি-বেসরকারি ভবনেও জাতীয় পতাকা ও ‘ঈদ মোবারক’ খচিত পতাকা উত্তোলন করা হবে। ঈদুল আজহা উপলক্ষে কেন্দ্রীয় কারাগারসহ দেশের সব কারাগার, সরকারি হাসপাতাল, ভবঘুরে কেন্দ্র, বৃদ্ধাশ্রম এবং শিশু ও মাতৃসদনে উন্নত খাবার পরিবেশন করা হবে।

কোরবানির মধ্য দিয়ে নিজের ভেতরের পশুত্বকে পরিহার করা এবং হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর মহান ত্যাগের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ঈদের দিন সকালেই মুসল্লিরা ঈদগাহ বা মসজিদে দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করবেন। নামাজের খুতবায় তুলে ধরা হবে কোরবানির তাৎপর্য। নামাজ শেষে অনেকেই যাবেন কবরস্থানে স্বজনের কবর জিয়ারত করতে। আনন্দের দিনে অশ্রুসিক্ত হয়ে চিরকালের জন্য চলে যাওয়া স্বজনের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করবেন।

ঈদের দিন দেওয়া হয় কোরবানি। যদিও ঈদের দিন থেকে তিন দিন কোরবানি দেওয়া যায়। সামর্থ্যবানরা গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া প্রাণী দ্বারা কোরবানি আদায় করবেন। নিয়ম অনুসারে কোরবানি করা পশুর মাংসের তিন ভাগের এক ভাগ গরিব-মিসকিন ও পাড়া-প্রতিবেশী, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে বিলিয়ে দিতে হয়। আবার পুরোটাই বিলিয়ে দেওয়া যায়। ইসলামের পরিভাষায় কোরবানি হলো—নির্দিষ্ট পশুকে একমাত্র আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট সময়ে তাঁরই নামে জবাই করা। মহান সৃষ্টিকর্তার দরবারে জবাই করা পশুর মাংস বা রক্ত কিছুই পৌঁছায় না, কেবল নিয়ত ছাড়া। আরবি ‘আজহা’ এবং ‘কোরবান’ উভয় শব্দের অর্থ হচ্ছে উৎসর্গ। কোরবানি শব্দের উৎপত্তিগত অর্থ হচ্ছে আত্মত্যাগ, আত্মোৎসর্গ, নিজেকে বিসর্জন। তাই ঈদুল আজহার অন্যতম শিক্ষা হচ্ছে মনের পশু অর্থাৎ কুপ্রবৃত্তিকে পরিত্যাগ করা। জাতীয় কবির ভাষায় ‘মনের পশুরে কর জবাই/পশুরাও বাঁচে, বাঁচে সবাই…’। এবার বাংলাদেশে ঈদুল আজহা এসেছে এমন এক সময়ে যখন বন্যা, পাহাড়ধসসহ বিপর্যস্ত হয়েছে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী। অভাবগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষাও দেয় ঈদুল আজহা।

ঈদুল আজহা উপলক্ষে আজ মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়েছে তিন দিনের সরকারি ছুটি। তবে এ সপ্তাহের শেষ দু’দিন শুক্র ও শনিবার হওয়ায় ছুটি দাঁড়িয়েছে ৫ দিনে। টিভি চ্যানেলগুলো ঈদ উপলক্ষে কয়েক দিনব্যাপী বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করছে। প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদ উপলক্ষে রাজধানী ছেড়েছে লাখো মানুষ। ফলে রাজধানী অনেকটা ফাঁকা হয়ে এসেছে।

রাজধানীর দুই সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে ৪০৯টি স্থানে ঈদ জামাতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় জাতীয় ঈদগাহের প্রধান জামাতসহ ঈদুল আজহার ২৩০টি এবং উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ১৭৯টি জামাত অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। দেশের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত হবে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *