তোতলামির সমস্যা! জানুন প্রতিকার

তোতলামি বা স্ট্যামারিং (Stammering) হল এমন একটি সমস্যা যার ফলে কথা বলার সময় স্বাভাবিকভাবে বেঁধে যেতে পারে। অনেক সময় একটি শব্দ বলতে গিয়ে বারবার বলায় শব্দটি অনেকটা লম্বা হয়ে যায়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে শব্দটি উচ্চারণে অসমর্থ হয়ে পড়ে। স্বাভাবিকভাবে যখন ১০০-১২০টি শব্দ উচ্চারণে ৫ শতাংশ বা তার বেশি শব্দ আটকে যায়, তখন তাকে স্ট্যামারিং বলা হয়। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ মানুষ এই সমস্যায় ভোগেন। মূলত চার প্রকারের স্ট্যামারিং হয়। মাইল্ড স্ট্যামারিং, মোডারেট স্ট্যামারিং, সিভিয়ার স্ট্যামারিং এবং ভেরি সিভিয়ার স্ট্যামারিং।

জার্মানির গ্যোটিংগেন বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের চিকিৎসক ডাঃ মার্টিন সমার তোতলানোকে রেডিও শোনার সঙ্গে তুলনা করেন৷ তিনি বলেন, ‘আবহাওয়া, দূরত্ব বা অন্য কোনো কারণে রেডিও শোনার সময় কথা পরিষ্কারভাবে শোনা না গেলেও বিষয়টা বোঝা যায়৷ তাই আমি তোতলানোকে রেডিও শোনার সাথে তুলনা করি৷’ গাড়ি যখন… ‘গাড়িতে যখন রেডিও শুনি তখন গাড়ি মোড় নেওয়ার সময় বা ব্রীজের ওপর চলার সময় বা খুবই সরু রাস্তায় চলার সময় মাঝে মাঝে রেডিওর আওয়াজে বাড়তি শব্দ আসায় আসল কথা ঠিকমতো শোনা যায়না৷ তোতলানো আমার কাছে সেরকই,’

১৫ বছর আগে এমআরটি-র সহায়তায় করা এক গবেষণায় তোতলাদের মস্তিস্কের সামনের বাঁ দিকে খানিকটা পরিবর্তন বা মস্তিস্ক অন্যরকম দেখা যায়৷ কথা না, গান গাওয়া! তোতলাদের মস্তিস্কের সামনের বাঁদিকে খানিকটা ঘাটতি রয়েছে৷ তবে গান গওয়ার সময় সাধারণত বেশিরভাগই মস্তিস্কের ডানদিকের অর্ধেক সচল হয়৷ সোজা কথায় বলা যায়, কথা বলতে মানুষের মস্তিস্কের বাঁদিক আর গান গাইতে ডান দিকের প্রয়োজন৷ অর্থাৎ তোতলাদের গান গাইতে তেমন কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়৷ তাই গানের মধ্য দিয়ে তোতলাদের মস্তিস্কের দুদিকের মধ্যে একটা সমন্বয় আনার চেষ্টা করা হয়৷ জেনেটিকও হতে পারে তোতলামির কারণ স্নায়বিক বা মানসিক হতে পারে, যা বিভিন্ন চাপের কারণে আরো বেড়ে যায়৷

তোতলামি সমস্যা সৃষ্টির কারণ
তোতলামি জন্মগত সমস্যা নয়। তোতলামির একাধিক কারণ রয়েছে। জেনেটিক কারণে তোতলামি সমস্যা দেখা দিতে পারে। বাবা-মায়ের যদি তোতলামি সমস্যা থেকে থাকে সে ক্ষেত্রে সন্তানেরও হতে পারে। অনেক সময় সন্তানের হাতের ডিরেকশন উলটা হয়। অনেকে ডান হাত ব্যবহার না করে বাঁ হাতে কাজ করে। সে ক্ষেত্রে যদি ছোটবেলা থেকে জোর করে হাতের ডিরেকশন চেঞ্জ করার চেষ্টা হয় তবে তোতলামি সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ছোটবেলায় বেশিরভাগ শিশুরই কথায় তোতলামো ভাব থাকে। যা পরবর্তীতে ঠিক হয়ে যায়। যদি ছোট থেকে সঠিক উচ্চারণের জন্য তাকে চাপ দেওয়া হয় তাহলে তার ফলাফল উলটা হতে পারে। শিশুটি তোতলা হয়ে যেতে পারে। যদি একইসঙ্গে দুটি বাচ্চা বড় হয় এবং তোতলা কোনও বাচ্চাকে অনুকরণ করতে থাকে তাহলে এক সময় তা অভ্যাসে পরিণত হয়। এ ক্ষেত্রে সে তোতলামি সমস্যায় পড়তে পারে।

তোতলামি নিউরোজেনিক কারণেও হতে পারে। ছোটবেলায় যদি কেউ মাথায় গুরুতর আঘাত পায়, তা থেকেও কথা বলার সমস্যা দেখা দিতে পারে। বেশি বয়সেও এই সমস্যা হতে পারে। শিশুকে ছোটবেলায় যদি কথা বলার জন্য বেশি চাপ সৃষ্টি করা হয়, সেক্ষেত্রে শিশুটির মধ্যে তোতলামো ভাব আসতে পারে। তাই শিশু তার স্বাভাবিক নিয়মেই কথাবার্তা শিখবে। তার উপর চাপসৃষ্টি করা উচিত নয়। যাদের তোতলামি বেশি দেখা যায়

মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের মধ্যে বেশি তোতলামি দেখা যায়। অনুপাতের দিক থেকে ৫ বছর বয়সি ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রে ২:১ এবং বড়দের ক্ষেত্রে ৪:১ অনুপাত।

তোতলামির চিকিৎসা
সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতি মেনে প্রথম থেকেই চিকিৎসা শুরু করলে তোতলামি ১০০ শতাংশ সারানো সম্ভব। তবে চিকিৎসা দেরিতে শুরু হলেও তোতলামো কমানো সম্ভব। এক্ষেত্রে রোগের লক্ষণগুলি প্রকট হওয়ার ৩-৬ মাসের মধ্যে যদি চিকিৎসা শুরু হয়, তাহলে অনূর্ধ্ব ৫ বছরের শিশুর তোতলামি ১০০ শতাংশ সারিয়ে তোলা যায়। পাশাপাশি বড়দের ক্ষেত্রেও তোতলামো ৬০-৮০ শতাংশ কমানো সম্ভব। বড়দের অবশ্যই বাড়িতে প্র্যাকটিস করতে হবে। প্রতিদিন এক-দেড় ঘণ্টা অভ্যাস প্রয়োজন।

তোতলামি সারানোর একমাত্র চিকিৎসা “থেরাপি”। সঠিক সময়ে থেরাপির মাধ্যমে একজন অভিজ্ঞ থেরাপিস্ট সম্পূর্ণভাবে তোতলামো সারিয়ে তুলতে পারেন। থেরাপির তিনটি ভাগ রয়েছে— ইন্ডিভিজুয়াল থেরাপি, গ্রুপ থেরাপি এবং কাউন্সেলিং থেরাপি । প্রথম দুটি স্পিচ থেরাপির অংশ।

স্পিচ থেরাপি ও এর খরচ
স্পিচ থেরাপি এমন একটা সিস্টেম যার দ্বারা রেট অব স্পিচ কমানো হয়। এর দ্বারা ব্রিদিং প্যাটার্ন ঠিক করা হয়, মাসুল টেনশন কমানো হয় এবং মনোবল বাড়ানো হয়। পুরো কাজটা মিডভ্যাস (MIDVAS) পদ্ধতিতে কাজ করে (মিডভ্যাস—মোটিভেশন, আইডেন্টিফিকেশন, ডিসেনসিটাইজেশন, ভেরিয়েশন, অ্যাপরক্সমেশন, স্টেবিলাইজেশন)।স্পিচ থেরাপি ৬-৯ মাসের চিকিৎসা। প্রতি মাসে প্রায় দু হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে।

তোতলামি দূর করার প্রচলিত ভুল পদ্ধতি ও এ সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
তোতলামি দূর করতে অনেকে মুখে পয়সা দেয়, যা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। মুখে পয়সা দিলে নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। যার ফলে কথা বলার সমস্যা হতে পারে। স্বাভাবিক স্বাস্থ্যকর খাবার শরীরে পুষ্টিতে সাহায্য করে। তোতলামির জন্য খাদ্যে কোনও পরিবর্তন আনার দরকার নেই। মডার্ন মেডিসিন, হোমিওপ্যাথি বা আয়ুর্বেদ, কোনও ওষুধেই স্ট্যামারিং বা তোতলামি কমানো সম্ভব নয়। যোগব্যায়াম শরীর গঠনে ও সুস্থ রাখতে সাহায্য করে ঠিকই। কিন্তু তোতলামি কমাতে এর কোনও ভূমিকা নেই। কোনও প্রকার অপারেশনেই তোতলামো সারানো সম্ভব নয়। গ্রামাঞ্চলে এমনকী শহরেও কোনও কোনও হাতুড়ে ডাক্তার তোতলামি সারানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে নানা ওষুধ দিয়ে থাকেন। এমনকী নানাপ্রকার পরীক্ষাও করান। এসব কোনও কিছুতেই তোতলামো সারে না।

মনে রাখবেন তোতলামো একমাত্র থেরাপির মাধ্যমেই সারানো সম্ভব। অভিজ্ঞ স্পিচ থেরাপিস্ট চিকিৎসার মাধ্যমে এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করুন।

বাবা-মার করণীয়
সন্তানের যে কোনও সমস্যা সমাধানে মা-বাবার পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ ভূমিকা থাকে। তোতলামোর উপসর্গ দেখা দিলে আগে বাবা-মা বুঝতে পারেন। সে ক্ষেত্রে তখনই তাদের নিজেদের দ্বারা কাউন্সেলিং করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ স্পিচ থেরাপিস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। ছোটবেলা থেকে যদি নজর না দেওয়া হয় সে ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় কোনও সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। যে কোনও মানসিক চাপই তোতলামি বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই বাবা-মাকে সব সময় সতর্ক থাকা উচিত।

বাবা-মায়ের তোতলামি থাকলে সন্তানেরও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বাবা মাকে অবশ্যই সজাগ থাকতে হবে। যদি বাবার তোতলামি থাকে তাহলে ২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে সন্তানেরও একই সমস্যা হয়। বাবা-মা দু’জনেরই যদি এই সমস্যা থাকে, সে ক্ষেত্রে ৫০-৭৫ শতাংশ ক্ষেত্রে সন্তানেরও একই সমস্যা দেখা দেয়।

সন্তানের বয়স যখন দুই থেকে আড়াই বছর তখন থেকেই তার বাবা-মাকে এ বিষয়ে সজাগ হতে হবে। কারণ এই বয়সে চিকিৎসা শুরু হলে ভালো ফল পাওয়া যায়। ১০০ শতাংশ সমস্যা সমাধানের সুযোগ থাকে এই বয়সে।

সূত্র: মেডিকেল নিউজ টুডে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Comments

comments