জাতীয় 

ছিনতাইকারীদের দেখেও দেখে না পুলিশ

রাজধানীর টিকাটুলী এলাকায় প্রায় দিনই ছিনতাই এমনকি গণছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। কখনো কখনো কাছাকাছি পুলিশের গাড়ি থাকলেও ছিনতাই ঠেকাতে পুলিশি তত্পরতা দেখা যায় না। এমনকি সাধারণ মানুষ ছিনতাইকারী ধরিয়ে দিলে তাকেও ছেড়ে দেয় পুলিশ। টিকাটুলীতে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্র আবু তালহা নিহত হওয়ার পর এলাকায় খোঁজ নিতে গিয়ে এসব তথ্য জানা গেছে।

অন্যদিকে পুলিশ সূত্রে জানা যায়, তালহাকে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাত করা এবং ছিনতাইয়ের ঘটনা ধরা পড়েছে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরায়। সেই ভিডিও ফুটেজে দুই ছিনতাইকারীর ছবি রয়েছে। তাদের গ্রেপ্তার করতে পুলিশের কয়েকটি টিম মাঠে নেমেছে।

টিকাটুলীর আরকে মিশন রোডে তালহাদের নিজস্ব ছয়তলা বাড়ি। এলাকার লোকজন তালহা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের চেনে। গতকাল সোমবার দুপুরে

গিয়ে দেখা গেছে, পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তালহাদের বাসায় তাঁর ব্যবসায়ী বাবা খন্দকার নুর উদ্দিন ড্রয়িং রুমে বসে কান্না সংবরণ করার চেষ্টা করছিলেন।

প্রতিবেশী কয়েকজন মুরব্বি তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তালহার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তালহাকে যখন বাসার নিচে নিয়ে আসা হয় তখন সে ‘আব্বু, আব্বু’ বলে চিৎকার করতে থাকে। আমরা দ্রুত দোতলা থেকে নিচে নেমে যাই। তালহার উরু থেকে তখন অঝোর ধারায় রক্ত ঝরছে। আমরা কাপড় দিয়ে বাঁধি, কিন্তু রক্ত বন্ধ হয় না। একসময় বাঁধন খুলেও যায়। কোথায় তাকে নিয়ে যাব—হতবিহ্বল হয়ে পড়ি। পরে চিন্তা করি কাছের হাসপাতালে নিয়ে যাই। রাজধানী মার্কেটের পাশে সালাউদ্দিন হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি সবাই ঘুমাচ্ছে। ডেকে ডেকে তুলি। তাঁরা পরামর্শ দেন তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য। পরে তাকে ঢাকা মেডিক্যালে নেওয়ার সময় রাস্তায় মারা যায়। ’

খন্দকার নুর উদ্দিন কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘তালহা প্রতি বৃহস্পতিবার ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুলিয়া ক্যাম্পাস থেকে বাসায় আসে, শনিবার চলে যায়। এবার শনিবার তার শরীরটা একটু খারাপ লাগায় পরদিন রবিবার যাওয়ার জন্য রওনা হয়েছিল। আমার আগে সে ঘুম থেকে উঠে গোসল করে রেডি হয়। যাওয়ার আগে আমাকে জড়িয়ে ধরে আদর করে। বারবার আমাকে সাবধানে থাকার জন্য বলে। যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই ফিরে আসে রক্তাক্ত অবস্থায়। ’ তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে আরো বলেন, ‘এ এলাকায় ছিনতাই হয়। পুলিশ যদি ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে ভালোভাবে ব্যবস্থা নিত তাহলে আজ আমার ছেলেকে হারাতে হতো না। ’ ওই সময় সেখানে উপস্থিত প্রতিবেশীদের একজন অভিযোগ করেন, ছিনতাইয়ের বিষয়ে পুলিশকে বললেও কোনো কাজ হয় না।

পরে এলাকায় খোঁজ নিতে গেলে বেশির ভাগ লোকই জানায়, ভোরের দিকে টিকাটুলী এলাকায় ছিনতাই ও গণছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। পাশে পুলিশের গাড়ি থাকলেও তারা দেখেও দেখে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়ারী থানার ওসি রফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ছিনতাই হয় না বলব না। তবে যেভাবে বলা হচ্ছে সেটা ঠিক নয়। আমরা গত এক মাসে ২২ জন ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছি। ’

তালহার পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত রবিবার সকাল ৬টার দিকে কে এম দাস লেনের একটি বাড়ির পাঁচতলার বাসিন্দা বারিধারার সাউথ পয়েন্ট স্কুলের শিক্ষিকা সাদিয়া ও তাঁর ভাই সানী একটি রিকশাযোগে মতিঝিলের দিকে যাচ্ছিলেন। ৪৮/১২ আর কে মিশন রোডে ‘মায়ের দোয়া’ নামের ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের পাশে যেতেই তাঁদের রিকশার গতি রোধ করে ছিনতাই করতে থাকে ছিনতাইকারীরা। ওই সময়ই আরেকটি রিকশায় ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু তালহা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। ছিনতাইকারীরা তাঁর কাছ থেকেও টাকা ছিনিয়ে নেয়। একপর্যায়ে রিকশা থেকে নেমে এক ছিনতাইকারীকে ধরে ফেলেন তালহা। ওই সময় অন্য ছিনতাইকারীরা তাঁর উরু ও হাতে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়।

তালহার কাছ থেকে ছিনতাইকারীরা ছিনতাই করেছিল কি না এ বিষয়ে দুই ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। তালহার পরিবারের দাবি, তালহার কাছ থেকে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নিয়েছে ছিনতাইকারীরা। তবে ওয়ারী থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা জেনেছি স্কুলশিক্ষিকা ও তাঁর ভাইয়ের কাছ থেকে ছিনতাইকারীরা ছিনতাইয়ের সময় তালহা এক ছিনতাইকারীকে ধরে বলে আমাদের এলাকায় তোরা ছিনতাই করছিস, তোদের রেহাই নেই। কিন্তু তাঁর পরিবার বলছে, তালহার কাছ থেকেও টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নিয়েছিল। আমরা সব বিষয় খতিয়ে দেখছি। ’

পুলিশের একটি সূত্রে জানা যায়, যেখানে ছিনতাই ও ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটেছে, তার পাশেই একটি ভবনে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা রয়েছে। তাতে ধরা পড়েছে ওই ঘটনা। ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা থেকে ছবি নিয়ে ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

অন্যদিকে গতকাল দুপুরে সাদিয়া ও তাঁর ভাই সানীর সঙ্গে কথা বলতে তাঁদের বাড়িতে গেলে তাঁরা বাসায় নেই বলে জানান বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী নজরুল।

Sharing is caring!

Comments

comments

Related posts

Leave a Comment