চিকিৎসার জন্য ভেলোর গেলে কী করবেন

ভারতের তামিল নাড়ু রাজ্যের ভেলোর শহরের সিএমসি (ক্রিশ্চিয়ান মেডিকেল কলেজ) ও শ্রী নারায়ণী হাসপাতালে বাংলাদেশের মানুষের আগমন বেশি। বাংলাদেশ থেকে অনেক রোগি সেখানে চিকিৎসা নিতে যান। তাই আগেই জেনে নিন ভেলোর কিভাবে যাবেন, কেমন খরচ, চিকিৎসকের সঙ্গে কিভাবে যোগাযোগ করা যায়?

যা প্রয়োজন
ভারত যেতে আগে দরকার পাসপোর্ট। এরপর ভিসা, যা ভারতীয় হাইকমিশন থেকে পাবেন। এগুলো সংগ্রহ করে ভেলোর গিয়ে আপনার কয়েক কপি ছবি, পাসপোর্টের কয়েকটি ফটোকপি ও কলম সঙ্গে রাখুন। সময় পেলে আপনার সর্বশেষ ভিসার কয়েকটি ফটোকপি করে রাখুন। কারণ সিম কিনতে এগুলো কাজে লাগবে। চাকরি করলে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে ছুটির লিখিত ডকুমেন্টের কয়েকটি ফটোকপি সঙ্গে রাখুন। যা বর্ডারে কাজে লাগতে পারে। বর্ডার পার হওয়ার সময় বাংলাদেশ সরকারকে ট্রাভেল ট্যাক্স দিতে হয়। বর্ডারেই সেটা পেয়ে যাবেন।

কিভাবে যাবেন
আকাশ বা স্থল পথে যেতে পারেন। আকাশ পথে যেতে চাইলে আগে থেকেই ভিসায় উল্লেখ থাকতে হবে। বিমানে সরাসরি ভেলোর যাওয়া যায় না। ঢাকা থেকে চেন্নাই বিমানে যাওয়া যায়। তারপর বাস বা ট্রেনে ভেলোর। বিমানের টিকিট আগে থেকে কেটে রাখলে খরচ কিছুটা কম হয়। স্থল পথে যেতে চাইলে দেখুন আপনার পাসপোর্টে ভারতে ঢোকার জন্য কোন বর্ডারের উল্লেখ আছে। যদি আপনি হিলি বর্ডার দিয়ে প্রবেশ করেন, তবে আপনি মালদা থেকে বা কলকাতা থেকে ট্রেন ধরতে পারেন। আবার বেনাপোল বর্ডার দিয়ে কলকাতা যেতে পারেন। সেজন্য ঢাকা থেকে বেনাপোলের যেকোনো বাসে বেনাপোল নেমে বর্ডার পার হতে হবে। ওপারে পেট্রাপোল গিয়ে বাস, ট্রেন বা টেক্সিতে কলকাতা যাওয়া যায়। সবচেয়ে সহজ ট্রেনে যাওয়া। খরচও কম। বনগাঁও ট্রেন স্টেশন থেকে শিয়ালদাহ স্টেশনের টিকিট কেটে ট্রেনে উঠবেন। আবার ঢাকা থেকে সরাসরি কলকাতার বাসেও যেতে পারেন। কলকাতা থেকে ভেলোরের দূরত্ব প্রায় ১ হাজার ৭৫০ কিলোমিটার। কলকাতা বা মালদা থেকে সরাসরি ট্রেন আছে। আবার মালদা থেকে কলকাতা, কলকাতা থেকে চেন্নাই, চেন্নাই থেকে ভেলোর যেতে পারেন। ভারতে দূরের ট্রেনের টিকিট পাওয়া অনেক কষ্টের। ভারতে ট্রেনের যাত্রী অনেক বেশি। তবে ট্রেন ছাড়ার আগের দিন টিকিট কাটার একটি ব্যবস্থা আছে।

কলকাতায় থাকবেন
টিকিট আগে থেকে কাটা না থাকলে কলকাতাতে দু’এক রাত থাকতে হতে পারে। কলকাতার সব হোটেলে থাকতে পারবেন না। তবে নিউ মার্কেটের আশেপাশের হোটেল বা গেস্ট হাউজগুলোতে থাকতে পারেন। ঢাকার বাসগুলো যেখানে থামে, সেখানে বেশকিছু গেস্ট হাউজ আছে। সেখানে হোটেল ছাড়ার সময় দুপুর ১২টা।

টাকা কোথায় ভাঙাবেন
টাকা বা ডলার অনেক জায়গাতেই চেঞ্জ করতে পারেন। তবে বর্ডারে চেঞ্জ রেট কম। সে ক্ষেত্রে কিছু চেঞ্জ করে নিতে পারেন। সবচেয়ে ভালো কলকাতায় চেঞ্জ করা। যেখানে ঢাকার বাসগুলো থামে, সেখানে কিছু মানি চেঞ্জার আছে। তবে যে ভালো রেট দিচ্ছে তার কাছ থেকে চেঞ্জ করে নিতে পারেন ।

বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ
বাড়ির সঙ্গে মোবাইল ফোন বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখতে পারেন। এ জন্য একটি ভারতীয় সিম কিনতে হবে। চাইলে বাংলাদেশি সিম রোমিং করে সেখানে চালাতে পারেন। বর্ডারে অনেকেই সিম কেনেন। যা কলকাতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এর বাইরে আর কাজ করে না। সিম কেনার সময় বলুন যে, আপনি বাংলাদেশে কথা বলবেন এবং কলকাতার বাইরে যেতে হলে সেটাও বলুন। এখানে সিমে প্রোমো রিচার্জ বা পাওয়ার রিচার্জ করে নেওয়া যায়। বাংলাদেশের জন্য যার মেয়াদ থাকে ৩০দিন। এটা করলে কলরেট আসে ২ রুপি প্রতিমিনিট। একরাজ্য থেকে অন্যরাজ্যে গেলে সিমে রোমিং চালু হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে কল রিসিভ করলেও চার্জ কাটা হয়। আপনি যদি ভেলোরে গিয়ে সিম কেনেন তাহলে রোমিং চার্জ থাকবে না, কলকাতার সিম হলে থাকবে। ইন্টারনেটের কোনো রোমিং চার্জ নেই। যদি ভেলোরেই বেশি দিন থাকতে হয়, তো সেখানেই একটি সিম কিনে নিতে পারেন। ভারতে ভিসার মেয়াদ শেষ হলে সিমের মেয়াদও শেষ।

ট্রেনের টিকিট
ভারতে ট্রেনের টিকিট ইন্ডিয়ান রেলওয়ের ওয়েবসাইট www.indianrail.gov.in থেকে সংগ্রহ করা যায়। তবে অনেকের ক্ষেত্রেই হয়তো সেটা কঠিন হবে। তাই এজেন্টের মাধ্যমে বা নিজে স্টেশনে গিয়ে টিকিট কাটতে পারেন। ফরেনারদের জন্য ‘ততকাল’ নামে আলাদা একটি সুবিধা দিয়ে থাকে ইন্ডিয়ান রেলওয়ে। আলাদা কিছু সিট রাখা হয় বিদেশিদের জন্য। এই টিকিট কলকাতায় ফেয়ারলি প্লেসে দেওয়া হয়। এখানে আপনার পাসপোর্ট নিয়ে হাজির হলে টিকিট পেয়ে যাবেন। তবে সকাল সকাল এলে টিকিট পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ততকালে টিকিটের দাম একটু বেশি। ক্যান্সার রোগি এবং তার এটেন্ডেন্টের জন্য টিকিটে ছাড় আছে। ট্রেনের টিকিট করার সময় আপনার কাছে ট্রেনের নম্বর জানতে চাইতে পারে। নম্বর জানতে চাইলে www.indianrail.gov.in/between_Imp_Stations ভিজিট করুন। অনেক সময় দেখা যায়, প্রথমে আপনার সিট না-ও হতে পারে, পরে আবার হয়ে যায়। ওয়েটিং লিস্ট দূরে থাকলে রিস্ক হয়ে যায় সিট কনফার্ম হতে।

যে প্লাটফর্মে দাঁড়াবে
হাওড়া স্টেশনে ২৩টি প্লাটফর্ম আছে। টিকিটেই লেখা থাকবে ট্রেনের নম্বর। প্রতিটি স্টেশনেই স্পিকারে বলা হবে কোন ট্রেন কোন প্লাটফর্মে দাঁড়াবে। আবার বড় বড় স্টেশনগুলোতে ডিসপ্লে বোর্ড আছে, সেখানেও দেখানো হয় কোন ট্রেন কোন প্লাটফর্মে দাঁড়াবে। ট্রেন ছাড়ার ৪০-৪৫ মিনিট আগে থেকে ডিসপ্লে বোর্ডে দেখাবে। যাদের চলাচলে সমস্যা, তাদের জন্য স্টেশনে হুইল চেয়ার পাওয়া যেতে পারে। ছোট স্টেশনে দেখে নিন আপনার ট্রেনটি কোন প্লাটফর্মে দাঁড়াবে এবং আপনার বগিটি কোন জায়গায় দাঁড়াবে। স্টেশন মাস্টারের রুমের আশেপাশে নোটিশ বোর্ডে বিস্তারিত দেওয়া থাকে।

ট্রেনে কী খাবেন
চাইলে খাবার নিয়ে ট্রেনে উঠতে পারেন বা ট্রেনের ভেতরেও খাবার কিনতে পারেন। আবার বড় বড় স্টেশনগুলোতে ট্রেন বেশকিছু সময় দাঁড়ায়, সে ক্ষেত্রে প্লাটফর্ম থেকেও খাবার নিতে পারেন।

মল ত্যাগ
খাবারের পর মল ত্যাগের বিষয়টি জড়িত। তবে এসি কামরাগুলোতে সুব্যবস্থা আছে টয়লেটের। সেখানে সাবান, পানি, মগ সবই পাবেন। কিন্তু নন এসি কামরার ক্ষেত্রে সাবান এবং একটি ছোট মগ সঙ্গে রাখা ভালো। রাখুন টিস্যুও।

যে স্টেশনে নামবেন
ভেলোরের স্টেশনের নাম কাটপাটি স্টেশন। টিকিট যদি ভেলোর পর্যন্ত হয়, তাহলে নামতে হবে কাটপাটি স্টেশন। অনেক সময় কলকাতা থেকে চেন্নাই পর্যন্ত টিকিট করা থাকে। কারণ সব ট্রেন কাটপাটি যায় না। সেক্ষেত্রে আপনাকে চেন্নাই সেন্ট্রাল স্টেশনে নামতে হতে পারে। আবার কোন কোন ট্রেন চেন্নাই এগমোর স্টেশনে নামিয়ে দেয়। সেখান থেকে বাসে বা ট্রেনে ভেলোর যেতে পারেন। যদি চেন্নাই এগমোর স্টেশনে নামলে সেখান থেকে আবার চেন্নাই সেন্ট্রাল স্টেশনে যান। এরপর চেন্নাই সেন্ট্রাল থেকে কাটপাটি পর্যন্ত ট্রেনে চলে যান। প্রয়োজনে কর্তব্যরত পুলিশদের সহায়তা নিন। আবার বড় স্টেশনগুলোতে হেল্প ডেস্কও আছে।

ভেলোরে থাকা
ভেলোর স্টেশনে নেমে বাসে বা অটোতে সিএমসি যেতে পারবেন। সিএমসির পাশেই বেশকিছু হোটেল আছে। সেগুলোতে থাকতে পারেন। কিংবা সাইদাপেটে থাকতে পারেন। সুবিধাভেদে দাম কমবেশি হতে পারে। পাশের লজগুলোর ভাড়া একটু বেশি তবে সাইদাপেটের পাশে ভাড়া কম।

খাবার
ভেলোরের স্থানীয়রা ইটলিতে পাগল। স্থানীয় খাবার অনেকের পক্ষেই খাওয়া সম্ভব না। এখানে অন্নপূর্ণা নামে একটি বাঙালি হোটেল আছে সেখানে বাঙালি খাবারের সাধ পাওয়া যায়। তবে হোটেল ম্যানেজারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে রান্নার সরঞ্জাম পাবেন।এতে নিজে রান্না করে খেতে পারবেন। বাঙালি হোটেলও আছে কিছু। যে হোটেল বা লজে থাকুন, এর পেমেন্ট স্লিপগুলো ঠিকমতো সঙ্গে রেখে দিন। পরবর্তী ঝামেলা এড়াতে এগুলো কাজে লাগবে।

ভাষা
কলকাতায় বাংলা, হিন্দি বা ইংরেজি চলবে। তবে তামিলরা হিন্দিতে কথা বলতে অভ্যস্ত নয় এবং বলতে বা শুনতেও আগ্রহী নয়। তবে ইদানিং হিন্দি চলে। অনেকেই এখন বাংলা কিছু কিছু বোঝে এবং কথাও বলে। চিকিৎসকরাও কিছু কিছু বাংলা বোঝেন এবং বলেন। তবে ইংরেজি বা হিন্দি ঠিকই চলবে। এখানে মোটামুটি চারটি ভাষা- তামিল, হিন্দি, বাংলা ও ইংরেজি।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *