গল্প: ব্যাচেলর্স!

ঢাকা শহর থেকে সময়ের দিক দিয়ে অনেক বাইরে, সোজা কথায় নবীনগরের একটু দুরে চারতলা ভবনের চারতলায় আমাদের মেস। পুরো বিল্ডিংটাই ব্যাচেলরদের জন্য! ইংরেজি অক্ষর L এর মত কাঠামো! সামনে ছোট একটা ফাকা জায়গা যার চারপাশে আম গাছ দিয়ে ঘেরা! অতিরিক্ত গরম হলে নিচে নেমে মেসমেট আর বড় ভাইয়েরা মিলে গাছগুলোর নিচে বসে আড্ডা দিই আর বেশি বাতাস হলে ছাদে গিয়ে পাটি বিছিয়ে ডন নিয়ে বসে পড়ি! সবাই ব্যাচেলর, অতএব বাধা ধরা নিয়ম নেই! ছোট বড় মিলে মোট ৬০টি ফ্লাট! নিঃসন্দেহে বিশাল বড় মেস! যিনি ব্যাচেলরদের কথা মনে করে এই মনোরম পরিবেশের বিল্ডিং বানিয়েছেন তার জন্য মনে মনে এবং প্রতি ওয়াক্তের নামাজে দোয়া করি! আমরা চারজন থাকতাম একরুমে! প্রত্যেকটা ফ্লাটে তিনটা রুম সাথে রান্নাঘর আর বাথরুম তো আছেই! ব্যাচেলরদের জন্য এই মেসটা কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আনন্দ আড্ডার চেয়ে কম না। আমার রুমমেটরা হল সোহেল, আসাদ, রাফি। আমার রুমমেটদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই। প্রথমে সোহেল, গ্রাম রংপুরে। বাবা একজন শিক্ষিত কৃষক। অনেকেই ভাবে কৃষক আবার শিক্ষিত হয় নাকি? অবশ্যই হয়, কৃষি সম্পর্কে উনি কোন কৃষিবিদের চেয়ে কম জানেন না! নিজেদের অঘাত জমি আছে! একই জমিতে তিনি এবং অন্যান্য নিম্নবিত্ত কৃষক একসাথে কাজ করেন! স্যালো মেশিনের কোনো টাকা তিনি নেন না। অমায়িক লোক একজন! মনে কোন অহংকার, হিংসা, ভেদাভেদ নেই! সোহেল সেই রকম। প্রথমে ভালো বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতো কিন্তু আমাদের কথা চিন্তা করে এই মেসে থাকা শুরু করেছে! আমাদের মধ্যে সোহেল সবচেয়ে লম্বা! এবার পরিচয় করিয়ে দেই আসাদের সাথে। আসাদ ঢাকার স্থানীয়। বাসা কাচঁপুর ব্রিজের পাশে। মধ্যবিত্ত এবং বাস্তববাদী ছেলে। আবেগের কোন জায়গা তার মনে নেই। মায়াবী চেহারার ছেলেটা একদম সোজা সাপটা কথা বলে। ভাবার সময় নেই তার! রাফি হল মেসের সবচেয়ে স্মার্ট ছেলে! গ্রামের বাড়ি যশোর সদরে! চারিত্রিক গুনাবলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি যে কাজ করে সেটা হল রুপচর্চা! মেয়েরাও ওর কাছে হার মানবে! ক্লাসে যাক আর টিউশনিতে যাক অক্সি ফেস ওয়াস আর মেঞ্জ অ্যাক্টিভ ওর ব্যাগে থাকবেই! কিন্তু দুঃখের বিষয় হল এপর্যন্ত কোনো মেয়েকে রাফি পটাতে পারে নি! এবার আমার পরিচয়, আমি তাহসিন। গ্রামের বাড়ি শেরপুর,বগুড়া। মা বাবার বড় ছেলে। মধ্যবিত্ত পরিবার। হাসি কান্না, সুখ-দুঃখের এক জারণ বিজারণ বলয় দ্বারা বেষ্টিত পরিবার। আম্মুর কাছে ছেলে হিসাবে অতি ভদ্র আর শান্ত শিষ্ট আর আব্বুর কাছে প্রথম শ্রেণীর ফাঁকিবাজ! ফ্রেন্ডদের মধ্যে আমি একদমই ইউনিক! এটা আমার কথা না, আমার ফ্রেন্ডরা বলে। কারণ সিগারেট টানা, গাঁজা খাওয়া, টিজ করা ইত্যাদি আমাকে আজও ছুতে পারে নি! মেসে প্রথমে আমার দিন কাটতো না। আর ক্লাসেও ভাল বন্ধু ছিল না! একপ্রকার একাকীত্বে আমার দিন কাটতে থাকে! রসকসহীন জীবন। তারপর পরিচয় হল আসাদের সাথে। আসাদ ছিল ক্লাসের সবচেয়ে চুপচাপ ছেলে। স্যাররা তাকে খুব ভাল চোখে দেখতো। আসাদের সবচেয়ে ভাল গুণ হল সাহায্য করার জন্য সবার আগে দারিয়ে যেত। অপকার করে নি আজ পর্যন্ত। আমার সাথে বন্ধুত্ব হয়েছিল এই সাহায্য করা নিয়েই! পরীক্ষার তিনদিন বাকি ছিল! অথচ আমার বইটা পড়ার মত অবস্থায় ছিল না। বৃষ্টির পানিতে ভিজে একাকার হয়ে ভাজ খুলে বিভিন্ন স্থানে ছিড়ে গিয়েছিল! ছোট বেলা থেকেই প্রত্যেক শ্রেণীর ১ম বা ২য় সাময়িক পরীক্ষায় কমপক্ষে একটি সাবজেক্ট হলেও ফেল করেছি! তাই মনে মনে ভাবলাম হয়তো আমার রেকর্ডটা আমি ভাঙতে পারবো না! অনেকের কাছেই বই ধার চাইলাম কিন্তু কেউ দেয় নি। আর দিবেই বা কেন? অনেক লাইব্রেরীতে খোজ করলাম কিন্তু পাই নি। ঠিক তখনই আসাদ আমাকে একটা পুরানো বই ম্যানেজ করে দিল! নতুন বইয়ের চেয়ে পুরোনো বইগুলোই আমার পড়তে সুবিধা হয়। এতে অনেক ইম্পরট্যান্ট প্রশ্ন গুলো দাগানো থাকে! কিন্তু আমি তো বিদ্যাসাগর বা একে ফজলুল হক না যে একবার পড়লেই বই মুখস্থ হবে! এবারের টেনশন ছিল কোনটা ছেড়ে কোনটা পড়ব! আমি প্রায় অধৈর্য হয়ে যাচ্ছি। শেষমেশ পাঁচটা প্রশ্ন ভালভাবে পরে গেলাম পরীক্ষা দিতে!
পরীক্ষার প্রশ্নের দিকে তাকিয়ে আমি হতাশ! মাত্র একটা কমন পরছে! একটা লিখে আমার কলম আর চলে না! স্যাররা পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কলম চালানোর অভিনয় করি বা প্রশ্ন পড়ার অভিনয় করি! সকলের খাতায় কলম জেট বিমানের গতিতে চলছে আমার আমার কলম চালুই হচ্ছে না! “বাসায় পড়া লাগে, কলম চালানোর ভাব ধরলেই নাম্বার আসবে না!!!” বলেই স্যার আবার চলা শুরু করলেন! আসাদ আমার সামনেই ছিল কিন্তু স্যারদের কঠোর গার্ডের ফলে আমি টু শব্দও করতে পারি নি! পরীক্ষা চার ঘন্টার, তিন ঘন্টা অতিবাহিত হয়েছে। এই তিন ঘন্টার মধ্যে পাঁচজন স্যার এক সেকেন্ডের জন্য দরজার বাইরে যান নি! এদিকে আমার জানের পানি শুকিয়ে যাচ্ছে! এরমধ্যে দুইজন স্যার এসে অন্য দুইজনকে রেস্ট নিতে বললেন। এরপর আরও দুইজন এসে দায়িত্ব পরিবর্তন করে নিলেন। এখন এটাই সুযোগ! আমি আসাদের উপর চড়াও হলাম। তিনটা বড় প্রশ্ন আর তেরটা ছোট প্রশ্ন লিখে নিলাম! কঠোর গার্ডের পর সহজ গার্ড হয়, আমি এই সুত্রে বিশ্বাসী। আর পরীক্ষার হলেও সেটাই হল। ব্যস, স্যাররা শেষের দিকে আর কড়া ডিউটি দেন নি! কোনো রকম পাশ করে গেলাম। তারপর থেকে আসাদের সাথে ভাল বন্ধুত্ব। আমি ওকে আমার মেসে আসতে বললাম। মেস দেখে ওর দারুণ পছন্দ হল! পরের মাসে আসাদ আমার সাথে শিফট হয়ে গেল! এখন কোন সমস্যা হয় না। দুই বন্ধু খুব ভালমতো মেসে রাজত্ব করে যাচ্ছি। ক্লাসে নতুন একটা ছেলের সাথে পরিচয় হয়। নাম রাফি। আগেও কথা হয়েছে কিন্তু অতটা আন্তরিকতার সাথে বলা হয় নি। রাফি জানালো ওর থাকা খাওয়া নিয়ে খুব সমস্যা হচ্ছে। মেস মালিক যখন ইচ্ছা তখন ভাড়া বাড়ায়। বুয়া থাকে না আরও নানান ঝামেলা! আমরা ওকে আমাদের মেসে শিফট হওয়ার জন্য বললাম। আমরা তিনজন একসাথেই থাকা শুরু করলাম। হাসি, আড্ডা সবই চলছিল ভালভাবে। রাতের খাবার খাওয়ার পর আসাদ বললো, “আচ্ছা হাউজফুল মানে আমরা একই ডিপের তিনজন আছি, খুঁজে শুজে আরেকজন জোগার করা যায় না?” আমরা ব্যাপারটা ভেবে প্রস্তাবে রাজি হয়ে যাই! পরেরদিন ক্লাসে গিয়ে আমরা যে বন্ধুর সাথে বেশি ঘনিষ্ঠ তাকে গিয়ে বলি। ছেলেটা সোহেল। ব্যাস, আমরা চারজন হয়ে গেলাম! এরপর থেকে প্রত্যেক শুক্রবারে আমরা একসাথে ঘুরতে বের হতাম। এক শুক্রবারে রাফি আমাদের বললো, “চল নতুন কিছু উপভোগ করে আসি?” আমাদের মনে খুব কৌতুহল জন্মালো কি হতে পারে আজ! আমরা সবাই বাইরে দারিয়ে আছি কিন্তু রাফিকে দেখছি না! বুঝে নিলাম নবাব চেহারার উপর ঘষামাজা করায় ব্যস্ত আছেন! পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট তারপর বিষ মিনিট কিন্তু নবাবের আসার খবর নেই! সোহেল গিয়ে উত্তম মাধ্যম দিয়ে নিয়ে আসলো। আমরা রাস্তার পাশে দারিয়ে আছি। রাফির চোখ শুধু পিক-আপ খুঁজছিল। আমাদের বললো, “যেকোনো খালি পিক-আপ দেখলেই সিগনাল দিবি। চারজন একসাথে দিলে অবশ্যই থামবে!” এরপর একের পর এক পিক-আপ যাওয়া শুরু করলো কিন্তু কেউ থামলো না! রাফির অক্লান্ত সাহসী সংকেতে অবশেষে একটা পিক-আপ দারালো! রাফি বললো, “ঘাটে?”
ড্রাইভার বললো, “হুম, ৮০টাকা এক পিস!”

Sharing is caring!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *