কোকাকোলার জন্ম: এক হাতুড়ে ডাক্তারের আলাদিনের প্রদীপ

নায়াগ্রা জলপ্রপাত সম্পর্কে আমাদের সকলেরই কম বেশি পড়াশোনা রয়েছে। এই নায়াগ্রা জলপ্রপাত দিয়ে যে যতটা পানি ২০ ঘণ্টায় নিচের দিকে গড়িয়ে পড়ে, সেই পরিমাণ কোকাকোলা আজ পর্যন্ত বিশ্ববাসী পান করেছেন। বুঝতেই পারছেন, পানীয়টির জনপ্রিয়তা কতখানি। পানীয়টির আবিষ্কার থেকে শুরু করে আবিষ্কারক-রহস্য ও রোমাঞ্চে মোড়া এর প্রতিটা অধ্যায় হার মানাবে জেমস বন্ডের সিনেমাকেও।

আবিষ্কারকের পুরানো সেই দিনের কথা: শুরুতেই আসা যাক জনপ্রিয় এই পানীয়টির আবিষ্কারকের কথায়। জন স্মিথ পেমবার্টন কোকাকোলার আবিষ্কারক। তিনি ছিলেন একজন হাতুড়ে ডাক্তার বা ছোটখাটো রসায়নবিদ।

কোকাকোলা আবিষ্কারের গল্প
দিনটি ছিল ১৮৮৬ সালের ৮ মে। প্রথম চেষ্টায় পেমবার্টন এক ধরনের ওষুধ বা সিরাপ তৈরি করেন, যেটি কিনা প্রতি গ্লাস ৫ সেন্ট করে বিক্রি করা হতো। মাথাব্যাথা ও ক্লান্তি থেকে মুক্তি পেতে আমেরিকার মানুষ এই সিরাপ খেত৷ পরে নতুন আরও অনেক রাসায়নিক যুক্ত হয়ে তৈরি হয়েছে আজকের কোকাকোলা। দ্বিতীয় ধাপে এসে পেমবার্টন সেই সিরাপ এর সঙ্গে কোকো গাছের পাতার নির্যাস মিশিয়ে নতুন এক ধরনের পানীয় তৈরি করেন। যার নাম দেন ‘ভিন মারিয়ানি’। এটি ওষুধের দোকানে নার্ভ সতেজ রাখার টনিক হিসেবে বিক্রি করা হতো। কিন্তু পেমবার্টন চেয়েছিলেন এমন কোনও পানীয় তৈরি করতে যেটি পান করলে একই সঙ্গে তৃষ্ণা নিবারণ ও শরীর-মনে চনমনে ভাব চলে আসবে।

পেমবার্টন আগে থেকেই জানতেন যে, আফ্রিকার মানুষ তৃষ্ণা নিবারণ ও শরীর চনমনে রাখতে কোলাগাছের বাদাম চিবিয়ে খায়। তাই তিনি এবার তার সেই যুগান্তকারী পানীয় আবিষ্কারের জন্য সেই কোলাগাছের বাদামের দিকে মনোযোগ দেন। পেমবার্টন তার ল্যাবরেটরিতে কোলা গাছের বাদাম পরীক্ষা করে দেখেন তাতে রয়েছে ক্যাফিন ও থিওব্রোমিন। এই দুটির মিশ্রণে তৈরি পানীয়টি স্টিমুল্যান্ট বা উত্তেজক ওষুধের মতো কাজ করে। পেমবার্টন তার আগে তৈরি সিরাপের সঙ্গে কোলা গাছের বাদামের গুড়া, চিনি এবং কিছু সুগন্ধি দ্রব্য মেশান। তারপর সেই মিশ্রণ থেকে বুদবুদ উঠতে থাকে এবং এক ধরনের গাঢ় পানীয় তৈরি হয়। উচ্ছ্বসিত পেমবার্টন একদিন তার আবিষ্কৃত নতুন পানীয়টি একটি তিন চাকাযুক্ত একটি বড় পিতলের পাত্রে করে ঠেলে নিয়ে যান পার্টনার ফ্র্যাংক রবিনসনের কাছে। পেমবার্টন এর আবিষ্কৃত নতুন পানীয় পান করেই রবিনসন উল্লসিত হয়ে সেই মুহূর্তেই পানীয়টির নাম দেন ‘কোকাকোলা’।  উল্লেখ্য, প্রথমদিকে কোকাকোলার সাথে কোকেন মেশানোর বিষয়টি কিন্তু যথেষ্ট প্রচলিত ছিল।

প্রথমদিকের বিক্রি
প্রথম দিকে প্রতিদিন ৯ গ্লাস কোকাকোলা বিক্রি হত। প্রথম বছরে তিনি ৫০ ডলার আয় করেন কিন্তু ব্যয় হয় ৭০ ডলার। ব্যবসা সম্পর্কে পেমবার্টন খুব বেশি কৌশলী ছিলেন না। তাই তিনি তার ব্যবসায়ের সমস্ত শেয়ার একে একে বিভিন্ন জনের কাছে বিক্রি করে দিতে থাকেন। ১৮৮৯ সালে এ.জি ক্যান্ডলার নামে এক ব্যবসায়ীর কাছে তার আবিষ্কৃত পানীয়টির তৈরির ফর্মুলা-সহ সমস্ত শেয়ার বিক্রি করে দেন।

পেমবার্টন এর গল্পের ইতি
ক্যান্ডলারের কাছে ফর্মূলা ও শেয়ার বিক্রি করার পর ‘কোকাকোলা’র সঙ্গে পেমবার্টনের আর কোনো সম্পর্ক নেই। পেমবার্টন এর কাছ থেকে শেয়ার কেনার তিন বছর পর ক্যান্ডেলার পেমবার্টন এর অভিজ্ঞ পার্টনার রবিনসন ও আরও দুজন ব্যক্তিকে ‘কোকাকোলা কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় তাদের মূলধন ছিল ১ লাখ ডলার। ক্যান্ডেলার পেমবার্টন এর আবিষ্কৃত পানীয়তে কিছুটা পরিবর্তন আনেন। তিনি এর সাথে কার্বনেটেড ওয়াটার বা কার্বন ডাই অক্সাইড মিশ্রিত পানি মিশিয়ে এক রসনাতৃপ্তিদায়ক পানীয় উপহার দিলেন। ক্যাণ্ডলারই প্রথম ব্যক্তি যিনি কোকাকোলাকে এতটা জনপ্রিয় করে তোলেন। ফলে নতুন স্বাদের এই ‘কোক’ বাজারে হু হু করে বিকোতে লাগল। প্রথমে গ্লাসে গ্লাসে শরবত হিসাবে বিক্রি হলেও বোতলভর্তি কোকাকোলা বিক্রি শুরু হয় ১৮৯৪ সালে। কিন্তু তার আগে তাদেরকে নতুন এই পানীয়টিতে মানুষকে অভ্যস্ত করতে বহু চড়াই-উৎরাই পেরোতে হয়েছে।


প্রথমে ফ্রি-তে খাওয়ানো হতো ‘কোক’
যারা এই পানীয়টি সম্পর্কে জানতেন না, তাদেরকে জানানোর জন্য ক্যান্ডেলার ১৮৯১ সালে ক্যালেন্ডারে, পেপারে এবং নোটবুকে বিজ্ঞাপন দিয়ে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেন। এতেও যখন খুব বেশি লাভ না হয় তখন ক্যান্ডেলার বিপণন কর্মী নিয়োগ করেন। যাদের কাজ ছিল সাধারণ মানুষের কাছে ফ্রি কুপন বিলি করা। এই ফ্রি কুপন দিয়ে দোকান থেকে বিনামূল্যে কোক পাওয়া যেত। এটি ছিল ক্যান্ডেলারের ব্যবসায়িক কৌশল। যারা প্রথমবার ফ্রি-তে এই কোকাকোলা পান করেন, তারা পরবর্তীতে টাকা দিয়ে কিনে কোকাকোলা পান করতে বাধ্য হয়েছেন। এভাবেই আস্তে আস্তে আমেরিকাবাসীদের কাছে কোকাকোলা জনপ্রিয় একটি পানীয়তে পরিণত হয়।

বিজ্ঞাপনেই বাজিমাৎ
শুরুর দিকে গরমের সময়ে এই সফট ড্রিংকটি ভালো বিক্রি হলেও শীতের সময়ে তা একেবারেই কমে যায়। বেশ কয়েকবছর এভাবেই চলতে থাকে। ক্যান্ডেলারের মাথায় তখন ভর করে নতুন এক কৌশল। ১৯২২-এর ডিসেম্বরে সংবাদপত্রের পুরো পাতা জুড়ে বিজ্ঞাপন দিলেন ‘থার্স্ট নোওজ নো সিজন’! চারটি শব্দের ওই বিজ্ঞাপন কয়েকবার ছাপানোর পর ম্যাজিকের মতো কাজ হল। শীতেও বিক্রি এত বাড়তে শুরু করল যে, প্রস্তুতকারকরা হিমশিম খেয়ে গেলেন।

নামকরণ ও লোগো
‘কোকাকোলা’ নামকরণটি করেন পেমবার্টন-এর রবিনসন। cocain এবং cola nut থেকে তৈরি বলে এর নাম দেওয়া হয় কোকাকোলা। সে সময় তিনি একটু হেলানো, বাঁকা অক্ষরে একটি লোগোও তৈরি করে দেন। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত কোকাকোলার অনেক কিছু পরিবর্তন হলেও নামের কোনো পরিবর্তন করা হয় নি।

সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল যে দিন
আমেরিকায় জনপ্রিয়  হওয়ার পর কোকাকোলা কর্তৃপক্ষ  বুঝতে পারে তাদের এখন ইউরোপের বাজারে প্রবেশ করা উচিৎ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সেই সুযোগ এনেও দেয়। আমেরিকান সৈন্যদের হাত ধরে কোকাকোলা পৌঁছে যায় ইউরোপ এবং এশিয়ায়। তারা বিভিন্ন দেশের স্থানীয় বিজ্ঞাপনী সংস্থাকে ব্যাবহার শুরু করে। বিশ্বে মায়ানমার ও সিরিয়া বাদে বাকি সব দেশেই কোকাকোলা পাওয়া যায়। পাকিস্তান, কম্বোডিয়া, জিম্বাবোয়ের মতো অর্থনৈতিক সংকটপূর্ণ দেশেও কোকাকোলার দারুন বিক্রি। তাদের রয়েছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেল। যার ফলে আপনি যেখানেই থাকুন না কেন পায়ে হাঁটা দূরত্বের মধ্যই কোকাকোলা পেয়ে যাবেন। জানলে অবাক হবেন যে এই পানীয়ের ব্র্যান্ডভ্যালু এতই দৃঢ় যে ইংরেজি শব্দ ‘Kola’ পরিবর্তন হয়ে ‘Cola’ হয়ে গিয়েছে।

পৃথিবীর সবচেয়ে গোপন রেসিপি
পৃথিবীতে গোপন যত বিষয় আছে তার মধ্যে অন্যতম হলো কোকাকোলার রেসিপি। কোকাকোলার রেসিপিটি তৈরি করেন পেমবার্টন। ক্যান্ডেলার, পেমবার্টন এর কাছ থেকে রেসিপি-সহ সম্পূর্ণ স্বত্ব কিনে নেন। যুগ যুগ ধরে অতি বিশ্বস্ত লোক ছাড়া কোকাকোলার এই রেসিপিটি সম্পর্কে কেউ জানতো না। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে ৬.৬ ফুট মোটা ধাতব একটি ভল্ট বানানো হয় যেখানে কোকাকোলার রেসিপি নিয়ে কাজ করা হয়। এখানে রেসিপি সংশ্লিষ্ট বিশ্বস্ত লোক ছাড়া অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারে না। আমেরিকার ট্রাস্ট কোম্পানি অফ জর্জিয়া নামের ব্যাঙ্কের সেফ ডিপোজিট ভল্টে ‘7x’ চিহ্নিত কোকের ‘রিয়েল থিং’টি সযত্নে রাখা হয়েছে। যে দশ জন অফিসারের হাতে ফর্মুলার চাবিকাঠি রয়েছে, তাদের একসঙ্গে বসবাস এবং চলাফেরা নিষিদ্ধ।

আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে কোকাকোলার গোপন রেসিপি
সারা বিশ্ব জুড়ে হইচই ফেলে দেওয়া একটি পানীয়র গোপন রেসিপি সম্পর্কে টনক নড়ে আমেরিকার ফেডেরাল সরকারের। ১৯০৯ সালে আমেরিকার ফেডেরাল সরকার কোকাকোলার গোপন রেসিপি জানার জন্য আদালতের শরণাপন্ন হন। এই মামলাটি ৯ বছর ধরে চলে। অবশেষে আদালতের রায় কোকাকোলা কোম্পানির পক্ষেই যায়।

মানবদেহের ক্ষতিকর উপাদান
বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় এই পানীয় কোম্পানিটিকে আদালতের কাঠগড়ায়ও দাঁড়াতে হয়েছিল। ভারতের ‘সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যাণ্ড এনভায়রনমেন্ট’ (CSE) কোকাকোলার ১২টি পণ্যের নমুনা পরীক্ষা করে মানবদেহ ও উদ্ভিদ দেহের জন্য ক্ষতিকর কীটনাশক, পোকামাকড় ধ্বংসকারী রসায়নিক দ্রব্যাদির মিশ্রণ এমন মাত্রায় রয়েছে যার কারণে পাকস্থলির বিভিন্ন অসুখ, দেহে খনিজ পদার্থের ঘনত্ব কমানো, স্নায়ুতন্ত্রে সমস্যা, জন্মকালীন বিভিন্ন সমস্যা হতে পারে। কোক-বটলিং প্ল্যান্টের বর্জ্যেও পাওয়া পাওয়া গেছে বিষাক্ত ক্যাডমিয়াম ও সিসা। ক্যাডমিয়াম বিকল করতে পারে কিডনি। সিসার প্রভাবে শিশুদের মধ্যে দেখা দিতে পারে মানসিক জড়তা ও ভয়াবহ রক্তাল্পতা!

জানেন কি?
•    এখন পর্যন্ত উৎপাদিত কোকাকোলার সবকটি বোতল যদি পাশাপাশি এক প্রান্তের সাথে আর এক প্রান্তে শেকলের মতো করে রাখা হয় তাহলে অন্তত ১০০০ বার চাঁদে আসা-যাওয়ার সমান লম্বা হবে। একই ভাবে আজ পর্যন্ত উৎপাদিত হওয়া সব কোকাকোলার বোতলের চেন বানালে পুরো পৃথিবী ৪০০০ বারের বেশি ঘুরে আসা যাবে।

•    এখন পর্যন্ত উৎপাদিত কোকাকোলার সব বোতল যদি মানুষের মধ্যে বিলি করা হয় তাহলে প্রত্যেকে ১০০০ টির বেশি বোতল পাবে।

•    বিশ্বে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৮০০০ গ্লাসেরও বেশি কোকাকোলা খাওয়া হয়ে থাকে।

•    কোকাকোলা ব্র্যান্ড কোক ছাড়াও আরো প্রায় ৩৫০০ রকমের বেভারেজ তৈরি করে। প্রতিদিন অন্তত ৩টা করে বেভারেজ খেলেও সবকটির স্বাদ নিতে আপনার ৩ বছরেরও বেশি সময় লাগবে।

•    পৃথিবীর ৯০% মানুষই কোকাকোলার লাল লোগোটি চেনেন।

•    আটলান্টা, লাস ভেগাসে শুধু কোকাকোলার জন্যই একটি করে বরাদ্দ মিউজিয়াম রয়েছে।

•    মহাকাশে স্পেস স্টেশনেও মেলে কোকের ভেন্ডিং মেশিন। সৌজন্যে নাসা!

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *