উন্নয়নে বৃক্ষ বলি!

প্রথমে খবরটা পড়ে বিশ্বাস হয়নি আমার। যশোর-বেনাপোল ৩৮ কিলোমিটার রাস্তা সম্প্রসারণের নামে দুই হাজারের বেশি গাছ কাটার সিদ্ধান্ত হয়েছে। যেখানে উপস্থিত ছিলেন যশোরের কয়েকজন সংসদ সদস্য, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানসহ সরকারের পদস্থ কর্মকর্তারা। অবিশ্বাসের কারণ এই, যেসব জনপ্রতিনিধি জেলা প্রশাসকের দপ্তরে অনুষ্ঠিত এই সভায় উপস্থিত ছিলেন, তাদের সবাইকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি। আমার সংশয়ের কারণ ছিল এসব বিশিষ্টজনের উপস্থিতিতে এমন আত্মবিনাশী সিদ্ধান্ত হতেই পারে না।

উন্নয়নের নামে বহু আত্মবিনাশী পরিকল্পনা বিদেশি প্রভুরা আমাদের ওপর দীর্ঘকাল ধরে চাপিয়ে দিয়ে সোনার বাংলাকে শ্মশান বানিয়েছে। শুধু বাংলাদেশই নয়, তথাকথিত উন্নয়ন সহযোগীরা সারা দুনিয়ায় এই অপকর্ম করে বেড়ায়। সবই তারা করে বা করিয়ে নেয় উন্নয়নের লোভ দেখিয়ে। এসব পরিকল্পনায় একদিকে পৃথিবী মনুষ্য বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ; কিন্তু দুর্নীতির বিস্তার ঘটিয়ে তারা আপন স্বার্থ উদ্ধার করে। দেশে অর্থনৈতিক অন্তর্ঘাত লাগিয়ে দিয়ে এসব অপকর্ম করে।

এরশাদের শাসনামলের শেষ দিকে বিশ্বব্যাংক পরামর্শ দেয় বাংলাদেশ রেলওয়েকে ‘ডাউন সাইজ’ করার। তথাকথিত লোকসানের নামে ১৯টি রেলপথ বন্ধ করে তার সব সম্পদ বেচে দিতে। সে প্রস্তাব পেয়ে আমাদের সড়ক যোগাযোগের নাতিপুতিরা নেচে উঠল। একমাত্র যশোরের মানুষ এই উদ্যোগের বিরোধিতা করে এবং যশোর-বেনাপোল রেললাইন রক্ষা ও পুনরায় চালুর আন্দোলন শুরু করে। রেল যোগাযোগ বন্ধ করার পরিণতি সম্পর্কেও সেদিন যশোরের মানুষ সরকারকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছিল। যশোর উন্নয়ন পরিষদের নেতৃত্বে সে আন্দোলনে শামিল হয় সব রাজনৈতিক দলও। সে সময় যশোর উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ছিলেন অধ্যাপক মুহম্মদ শরীফ হোসেন, আমি সাধারণ সম্পাদক। আমরা রেলওয়ের বড় কর্তা, মন্ত্রীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে সেদিন এই আত্মবিনাশী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের সে সতর্কবাণী কেউ কানে তোলেনি। তবে যশোর-বেনাপোল রেললাইন তোলার টেন্ডার হওয়ার পরও আমরা তা বাতিলে সরকারকে বাধ্য করতে পেরেছিলাম। এখন আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি, ১৮টি রেললাইন তুলে আমরা কী সর্বনাশই করেছি।

জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশ হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বিপন্ন ছয়টি দেশের একটি। সুতরাং এখানে যে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের আগে তার পরিবেশগত প্রভাব বিচার করা জরুরি। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি, উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি বারবার উপেক্ষিত হচ্ছে।

যশোর-বেনাপোল সড়কটি প্রায় দুইশ’ বছর আগে নির্মিত যশোর থেকে কলকাতা পর্যন্ত (যশোর রোড) সড়কের অংশ। বেনাপোল পেরিয়ে পেট্রাপোলে গেলেই ছায়া সুনিবিড় সে রাস্তা সবাইকে মোহিত করে। কারণ ভারতীয় অংশে গাছগুলো তারা তো কাটেইনি, বরং তারা তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ ও বাণিজ্য ক্রমশ বেড়ে যাওয়ায় যশোর-বেনাপোল ৩৮ কিলোমিটার সড়কের সম্প্রসারণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে বহুকাল ধরে অশুভ চক্রটা বৃক্ষ নিধন করে লুটপাটে লিপ্ত। যশোর-বেনাপোল সড়কের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা অশুভ চক্রের জন্য বৃক্ষ নিধন এবং লুটের জন্য হয়ে উঠেছে এক বিরাট মওকা। দুই লাখ টাকার গাছ বেচাকেনা হবে মাত্র ১০-১৫ হাজার টাকায়। বাকি সব ভাগাভাগি হবে ঠিকাদার, ইঞ্জিনিয়ার, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসকদের মধ্যে।

১৮২৩-২৫ সালে যশোর-কলকাতা রাস্তাটি নির্মাণ করেন যশোরের জমিদার কালীপদ পোদ্দার। গল্প আছে, তার মাতার গঙ্গাস্নানে যাওয়ার পথে পাটনি তার কাছে পারানির কড়ি চাইলে তিনি অপমানিত বোধ করে গঙ্গাস্নানে না গিয়ে ফিরে আসেন। পুত্র কালীপদকে বলেন যশোর থেকে গঙ্গা পর্যন্ত যাওয়ার ভালো ব্যবস্থা করতে।

মায়ের ইচ্ছা পূরণে কালীপদ পোদ্দার যশোর থেকে গঙ্গা পর্যন্ত (একটি যশোর-বনগাঁ-কলকাতা, আরেক শাখা যশোর-বনগাঁ-চাকদহ পর্যন্ত) এই রাস্তা নির্মাণ করেন। রাস্তার দু’পাশে তিনি রোপণ করেন ছায়াদানকারী মহাশিরীষ (রেইন ট্রি)। রাস্তাটি কালীবাবুর রাস্তা নামেই পরিচিত। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মুক্তিযুদ্ধে রাস্তা নিয়ে এলেন গিন্সবার্গ রচনা করেন সেই বিখ্যাত কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’।

দেশভাগের পর সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্তরা চুরি করে গাছ কাটা শুরু করে। এ জন্য তারা অদ্ভুত কৌশলের আশ্রয় নেয়। প্রথমে গাছের বাকল তুলে নিত, তারপর কিছু ডাল কেটে নিত রাতে। এরপর পুরো গাছটিই কেটে বিক্রি করত অথবা সড়ক ও জনপথ বিভাগ আর বন বিভাগের সঙ্গে যোগসাজশে নামমাত্র দামে নিলামে কিনে নিত। এর সঙ্গে যোগ দিত পুলিশও। পেছন থেকে মদদ দিতেন রাজনৈতিক ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা। অর্থাৎ সড়ক, বন, পুলিশ, প্রশাসক, রাজনীতিক সবাই মিলে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট এই চুরির কাজ করে আসছে বছরের পর বছর ধরে।

যশোর-বেনাপোল অংশে এভাবে ৭০ ভাগের বেশি গাছ লুট করেছে এই চক্র। যেটুকু অবশিষ্ট আছে এবার চার লেন রাস্তা বানানোর অছিলায় সেটুকু সাবাড় করতে চায় সেই একই চক্র। সারাদেশে সড়ক ও জনপথ, রেলপথের সম্পত্তির ওপর এ দেশে এক শ্রেণির মানুষের যেন জন্ম অধিকার। তারা তা দখল করে লক্ষকোটি টাকা কামাচ্ছে। যশোর-বেনাপোল ৩৮ কিলোমিটার রাস্তার দু’পাশেই অন্তত ৫০ ফুট করে জমি আছে সরকারের। এই জমি জবরদখল করে রেখেছে এক শ্রেণির মানুষ। কাজেই সদিচ্ছা থাকলে এই জমি উদ্ধার করে কোনো গাছ না কেটেও চার-ছয় লেনের রাস্তা বানানো সম্ভব। বিদ্যমান রাস্তার উত্তর বা দক্ষিণ কিংবা উভয় পাশ দিয়ে নতুন রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা করা যেতে পারে।

একপাশ দিয়ে থাকবে সাধারণ, কম গতির যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা। সেটি দুই লেনের হলেই চলবে। মাঝখানে থাকবে গাছের সারি। এই লেনের জন্য মাটির কাজও বেশি করা দরকার হবে না। বন্যামুক্ত এলাকা বিধায় তা উঁচু করার দরকার হবে না। আবার নিচু থাকার ফলে ইচ্ছা করলেও এসব শ্লথগতির গাড়ি মূল সড়কে উঠতে পারবে না। পাবনা, সিরাজগঞ্জে এ ধরনের রাস্তা নির্মাণ করে ভালো ফল পাওয়া গেছে। অন্য পাশ দিয়ে নির্মাণ করা যাবে ভারী গাড়ি চলাচলের উপযুক্ত শক্ত-মজবুত সড়ক, যেখান দিয়ে ৪০-৫০ টনের গাড়ি চলতে পারবে।

দৃষ্টান্ত : যশোর-কলকাতা রোডের পেট্রাপোল-বনগাঁও অংশে ভারত তাই করেছে। আমরা কি দেখেও কিছু শিখব না?

তাতে লাভ বহু- ১. জবরদখল থেকে সরকারের বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি উদ্ধার করা যাবে; ২. একটি গাছও কাটা দরকার হবে না; ৩. নতুন রাস্তার পাশ দিয়ে নতুন করে গাছ লাগানো যাবে; ৪. পরিবেশ রক্ষা হবে; ৫. গাছের দু’পাশ দিয়ে এক পথের একমুখী ডাবল লেন থাকবে বলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা কম থাকবে; ৬. ফলে জানমালের নিরাপত্তা অনেকটা নিশ্চিত করা যাবে; ৬. যেসব জায়গায় পুরনো গাছ কেটে ফেলা হয়েছে বা মরে গেছে, সেখানে ও নতুন তৈরি রাস্তার ধারে পরিকল্পনা করে মহাশিরীষ, নিম, কাঞ্চন, পলাশ, টক আম, মহুয়া, আমলকী, শিমুল, জারুল, সোনালু, অশোক, আফ্রিকান টিউলিপ, নাগেশ্বর, বোতল ব্রাশ, ছাতিম ইত্যাদি গাছ লাগিয়ে বাংলাদেশের এই প্রবেশপথকে আমরা অপরূপ সৌন্দর্যময় করে তুলে পারি। পাখিদের জন্য গড়ে তুলতে পারি নিরাপদ খাবার ও আবাসের ব্যবস্থা।

আমি যশোর-বেনাপোল রাস্তার গাছ কাটার এই ঘৃণ্য চক্রান্তের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাই এবং যশোরের সচেতন মানুষের কাছে আবেদন জানাই, এই অসৎ পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে। স্মরণ করা যেতে পারে, যশোর-বেনাপোল রেললাইন উঠিয়ে দেওয়ার জন্য টেন্ডার আহ্বানের পরও ‘যশোর উন্নয়ন পরিষদে’র নেতৃত্বে যশোরবাসী ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করে সে চক্রান্ত রুখে দিয়েছিল। দরকার হলে যশোরবাসী প্রাণ দিয়েও যশোর-বেনাপোল রাস্তার গাছ রক্ষা করবে।

সাবেক চেয়ারম্যান যশোর শিক্ষা বোর্ড
amirulkhan7@gmail.com

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *